কুবির ৯২ শতাংশ গাড়ির ফিটনেস মেয়াদোত্তীর্ণ


কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫টি গাড়ির মধ্যে ২৩টিরই বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ফিটনেসের মেয়াদ শেষ হয়েছে। এসব গাড়ির মধ্যে শিক্ষার্থীদের পরিবহনে ব্যবহৃত ১২টি বাসও রয়েছে, ফলে ফিটনেস মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় গাড়ি চলাচল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন পুলের তথ্য অনুযায়ী, ফিটনেসের মেয়াদ শেষ হওয়া ২৩টি গাড়ির মধ্যে ১২টি শিক্ষার্থীদের পরিবহনে ব্যবহৃত বাস। বাকি ১১টি গাড়ি শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও প্রশাসনিকসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ২৫টি গাড়ির ৯২ শতাংশই ফিটনেসের মেয়াদোত্তীর্ণ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১-০১০০ নম্বর গাড়িটির ফিটনেসের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৫ সালের ২ নভেম্বর। এরপর ৭১-০০৮৭ নম্বর গাড়িটির ফিটনেসের মেয়াদ শেষ হয় ২০২৬ সালের ২ জানুয়ারি। ১১-০০০৩, ৭১-০০৫৯, ১১-০০১৪, ১১-০০০৫ ও ১১-০০১১ নম্বর এসি বাসের ফিটনেসের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৬ সালের ২৭ মে।

এছাড়া, ১১-০০৩১, ১১-০০২০, ১৪-২৯৫৮, ১৪-২৯৫৯, ১৪-২৯৬০, ১৪-২৯৬১, ১১-০০০৬ ও ১১-০০১১ নম্বর শিক্ষার্থী বাসের ফিটনেসের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২৮ মে। ১১-০০৩২ নম্বর গাড়িটির ফিটনেসের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২ জুন, ১১-০১৪০ নম্বর গাড়িটির ২৪ জুন এবং ১১-০০৩৩ ও ১১-০০০৮ নম্বর গাড়ির ৩০ জুন। ১১-০০০৪, ৫১-০০৪৫ ও ১১-০১২৩ নম্বর গাড়ির ফিটনেসের মেয়াদ শেষ হয়েছে ১০ জুলাই এবং ৫১-০০৬২ নম্বর গাড়িটির ৯ জুলাই ২০২৬।

মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৬ সালের মে মাসে সবচেয়ে বেশি ১২টি গাড়ির ফিটনেসের মেয়াদ শেষ হয়েছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট গাড়ির ৪৮ শতাংশ। জুনে পাঁচটি বা ২০ শতাংশ এবং জুলাইয়ে চারটি বা ১৬ শতাংশ গাড়ির মেয়াদ শেষ হয়েছে। এছাড়া, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে একটি এবং ২০২৫ সালের নভেম্বরে একটি গাড়ির ফিটনেসের মেয়াদ শেষ হয়েছে।

অর্থাৎ, ২৩টি মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ির মধ্যে ২২টির ফিটনেসের মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হয়েছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট গাড়ির ৮৮ শতাংশ। অন্যদিকে, মেয়াদোত্তীর্ণ ২৩টি গাড়ির মধ্যে শিক্ষার্থী পরিবহনে ব্যবহৃত বাসের সংখ্যা ১২টি, যা এর প্রায় ৫২ দশমিক ২ শতাংশ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন পুলের এসব গাড়ি শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিবহনসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের পরিবহনে ব্যবহৃত বাসগুলো নিয়মিত চলাচল করলেও ফিটনেস নবায়ন না হওয়ায় সেগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এসব বাসে অনেক সময় ধারণক্ষমতার তুলনায় বেশি শিক্ষার্থী পরিবহন করা হয়। এতে বাসের ভেতরে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয় এবং দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে নিরাপত্তাঝুঁকি আরো বেড়ে যেতে পারে।

ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষার্থী মো. শাহনেওয়াজ বলেন, “আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেক বাসের ফিটনেস ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। একইসঙ্গে, নির্ধারিত ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি শিক্ষার্থী বাসে ওঠার কারণে প্রতিদিনই ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।”

তিনি বলেন, “একটি বাসে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা শুধু অস্বস্তিকর নয়, এটি যাত্রীদের নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বাস নিয়মিত পরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে, ফিটনেস নিশ্চিত করতে হবে এবং কোনোভাবেই নির্ধারিত ধারণক্ষমতার বেশি যাত্রী বহন করা যাবে না। প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত বাসের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষার্থীদের যাতায়াত কোনোভাবেই অবহেলার বিষয় নয়।”

প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী সৈয়দা নাজিফা নাফিল বলেন, “আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকগুলো বাস ফিটনেসবিহীন। এর ফলে বিভিন্ন সময় নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয়। গাড়ির কাচ খুলে আসা, অতিরিক্ত মানুষের কারণে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা এবং অগ্নিকাণ্ডের মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে। কিছুদিন আগে একজন আহতও হয়েছেন। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। তাই প্রশাসনের কাছে আবেদন, দ্রুত উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”

এ বিষয়ে কুমিল্লা বিআরটিএর সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা লিটন কুমার দে বলেন, “ফিটনেসের মেয়াদ চলে গেলে তা নবায়ন না করে গাড়ি চালানো আইনগতভাবে অবৈধ। পরে ফিটনেস করতে হলে জরিমানা দিয়ে ফিটনেস নিশ্চিত করতে হবে।”

কুবি পরিবহন পুলের সহকারী রেজিস্ট্রার মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, “আমরা টাকা উত্তোলন করে সিস্টেম অনুযায়ী কাজ করাব। আমাদের প্রতিটি গাড়ির ফিটনেস একই সময়ে শেষ হয় না। আগে ফিটনেসের সময়ের মধ্যে আরও বেশি গ্যাপ ছিল, আমি আসার পর সেটি কমিয়েছি। তাছাড়া আমাদের এখানে লোকবল কম থাকায় সবদিকে একসঙ্গে দৌড়ানো সম্ভব হয় না। মূলত বিভিন্ন জটিলতা ও লোকসংকটের কারণে যেগুলোর মেয়াদ শেষ হয়েছে, সেগুলোর কাজ করতে পারিনি।”

তিনি আরো বলেন, “চালকরা অনেক সময় আমাদের সঠিক সময়ে ফিটনেসের বিষয়টি অবগত করেন না। এ কারণেও আমরা সময়মতো পদক্ষেপ নিতে পারি না। এছাড়া বিআরটিএর ওয়েবসাইটে সমস্যা থাকে এবং আমাদের গাড়িগুলো সেখানে সরাসরি নিয়ে যেতে হয়। কিন্তু আমাদের বাসগুলো সাত দিনই চলাচল করে। তবে আমরা খুব দ্রুতই এগুলোর ফিটনেসের কাজ সম্পন্ন করব।”

পরিবহন ব্যবস্থাপনা কমিটির আহ্বায়ক সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ মাকসুদুল করিম বলেন, “ফিটনেসের বিষয়ে আমাদের কাছে যথাযথ তথ্য আসেনি। এখন আমরা বিষয়টি নিয়ে বসেছি। এরই মধ্যে কিছু গাড়ি আমরা পাঠিয়ে দিয়েছি। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এখন থেকে ট্যাক্স টোকেন, মেয়াদোত্তীর্ণসহ এসব বিষয় আরো সতর্কতার সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকি করা হবে।”





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *