কেন ভারতীয় আইন শিক্ষার্থীরা তাদের সমাবর্তনে প্রধান বিচারপতিকে চান না
ভারতের শীর্ষ বিচারপতিরা প্রায়শই আইনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের রায় বা মতামতের জন্য সংবাদ শিরোনামে আসেন। কিন্তু ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত সম্প্রতি এমন কিছু মন্তব্যের জন্য শিরোনামে এসেছেন যা তরুণদের ক্ষুব্ধ করেছে এবং সাম্প্রতিক দিনগুলিতে দুটি প্রধান আইন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দাবি করেছেন, তাদের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তাকে যেন প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো না হয়।
এই বিতর্কটি শুরু হয় ২৩ জুলাই, যখন দক্ষিণের শহর হায়দারাবাদের নালসার আইন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক ডজন বিদায়ী শিক্ষার্থী কলেজ কর্তৃপক্ষকে একটি ইমেল লিখে দাবি জানায় যে, তাদের পাসিং-আউট অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করার জন্য প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তকে যেন আমন্ত্রণ জানানো না হয়। এরপর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ হাজার ৪০০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৪৫০ জন এই দাবিকে সমর্থন করেছেন, যাদের মধ্যে অনেকেই জুনিয়র।
প্রধান বিচারপতিকে আমন্ত্রণ জানানোটা ঐতিহ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ এবং আইনজীবী হতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের জন্য তদের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে দেশের শীর্ষ বিচারপতির উপস্থিতি সাধারণত গর্বের বিষয় হিসেবে দেখা হয়।
কিন্তু নালসারের ছাত্ররা এই খবরে ক্ষুব্ধ ছিল যে, আগের দিন প্রধান বিচারপতি দিল্লিতে তেলাপোকা জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে ২০ জুলাইয়ের সংসদ মিছিল চলাকালীন পুলিশের বর্বরতার বিষয়ে জরুরি শুনানির অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এরপর কান্ত জানিয়েছিলেন, তার বক্তব্য বিকৃতভাবে উদ্ধৃত করা হয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে, সিজেপি-র জন্মেরও মূলে ছিল প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্য। তিনি কিছু যুবককে বর্ণনা করতে পরজীবী এবং তেলাপোকার মতো শব্দ ব্যবহার করেছেন। কান্ত তখনও বলেছিলেন, তার বক্তব্য বিকৃতভাবে উদ্ধৃত করা হয়েছে।
রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে সিজেপি বিক্ষোভকারীদের উপর দমন-পীড়ন, যেখানে পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীকে শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত নিরস্ত্র ছাত্রদের উপর লাঠি এবং কাঁদানে গ্যাস দিয়ে আক্রমণ ও মারধর করতে দেখা যায়, তা ভারতীয়দের হতবাক করেছিল এবং বিশ্বজুড়ে শিরোনাম হয়েছিল। অন্তত চারজন যুবক পেলেট গানের গুলিতে আহতও হয়েছিলেন।
অনেক বিক্ষোভকারী বিবিসিকে জানিয়েছেন, পুলিশের দমন অভিযানে নারীরাও রেহাই পাননি।
গত মাসে দিল্লিতে পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যদের নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও মারধর করতে দেখা গেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, ২২ জুলাই একজন আইনজীবী যখন কান্তের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করেন, তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমাদের সময় নষ্ট করবেন না’ এবং যখন তাকে পুলিশের বাড়াবাড়ির ভিডিও দেখতে বলা হয়, তখন তিনি বলেন, ‘আমাদের সময় নেই।’
এই বিবৃতির কারণে বিরোধী দল, সিনিয়র আইনজীবী এবং কর্মীদের কাছ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া আসে – এবং এর একদিন পরেই নালসারের শিক্ষার্থীদের ইমেইলটি আসে।
শিক্ষার্থীরা লিখেছেন, “আমরা মনে করি, এমন একজন বিশিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে আমাদের ডিগ্রি গ্রহণ করা, যিনি প্রতিবাদী নাগরিকদের ওপর পুলিশের বর্বরতার গুরুতর অভিযোগকে অগ্রাহ্য করছেন, তা নালসারে থাকাকালীন আমাদের যা কিছুকে মূল্য দিতে শেখানো হয়েছে তার সঙ্গে বেমানান। অতএব, আমরা বিশ্ববিদ্যালয়কে এই সমাবর্তনের প্রধান অতিথি নির্বাচনের বিষয়টি কঠোরভাবে পুনর্বিবেচনা করার জন্য অনুরোধ করব।”
পরে প্রধান বিচারপতি কান্ত জানান, তিনি আবেদনটি শুনতে অস্বীকার করেননি, কেবল যথাযথভাবে তা দাখিল করতে বলেছিলেন। তারপর থেকে, সুপ্রিম কোর্ট সহিংসতার অভিযোগ এবং পুলিশ বিক্ষোভকারীদের হয়রানি করতে মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে এমন আশঙ্কা সংক্রান্ত মামলাগুলির শুনানি শুরু করেছে।
কিন্তু প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রশমিত হচ্ছে না। বরং গত বৃহস্পতিবার বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান মনন কুমার মিশ্র নালসারের স্নাতক শিক্ষার্থীদের বার কাউন্সিলের পরীক্ষা দিতে বাধা দেওয়ার হুমকি দেওয়ার পর এই ক্ষোভ আরো তীব্র হয়।
তিনি ঘোষণা করেন, “বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়ার পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত নালসার থেকে স্নাতক হওয়া কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হতে পারবে না।”
মিশ্রের এই মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে প্রধান বিচারপতি বলেছেন, শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ করার অধিকার আছে এবং যা ছিল ‘আইন শিক্ষার্থীদের সাথে আমার একটি সংলাপ’, তাতে বার কাউন্সিলের হস্তক্ষেপ করার কোনো অধিকার নেই।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মিশ্র তার হুমকি থেকে সরে আসেন এবং শিক্ষার্থীদের কাছে ক্ষমা চান।
