গ্রামবাসী ঐতিহ্য ফেরাতে নির্মাণ করছেন ৮২ হাত বাইচের নৌকা
গ্রামবাংলার মানুষের কাছে নৌকাবাইচ কেবল একটি খেলা নয়, এটি ইতিহাস, ঐতিহ্য, আবেগ এবং গৌরবের প্রতীক। বিল, নদীবেষ্টিত পাবনা জেলার মানুষের কাছেও নৌকাবাইচ ঐতিহ্য ও উৎসবের নাম।
সেই ঐতিহ্য সমৃদ্ধ করতে একটি গ্রামের প্রতিটি পরিবারের স্বেচ্ছায় আর্থিক সহযোগিতায় নির্মাণ করা হচ্ছে ৮২ হাত দৈর্ঘ্যের নতুন বাইচের নৌকা। এর নাম ‘চাঁন্দাই জনতা এক্সপ্রেস’। মূলত বাইচ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতেই এই নৌকা বানাচ্ছেন গ্রামবাসী।
পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার চাঁন্দাই গ্রামে নির্মিত হচ্ছে নৌকাটি। প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন নৌকাটির কাজ আগামী এক মাসের মধ্যে শেষ হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিনে চাঁন্দাই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের খোলা একটি স্থানে বিশাল কাঠামো নিয়ে এগিয়ে চলছে নৌকা তৈরির কাজ। রোদ বৃষ্টি থেকে বাঁচতে মাথার উপরে টানানো হয়েছে সামিয়ানা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একদল দক্ষ কারিগর শাল, গর্জন, সেগুন ও চাপালিশ কাঠ কাটা, আগুনের তাপে বাঁকানো, কাঠের অংশগুলো নিখুঁতভাবে জোড়া লাগানো এবং নৌকার কাঠামো তৈরিতে ব্যস্ত রয়েছেন। প্রতিটি ধাপেই রাখা হচ্ছে বিশেষ যত্ন, যাতে নৌকাটি একইসঙ্গে গতিশীল, ভারসাম্যপূর্ণ ও দীর্ঘস্থায়ী হয়।
নৌকা নির্মাণে ব্যবহৃত কাঠ গাজীপুর থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। নৌকার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে লোহার পেরেক, বোল্ট, বিশেষ আঠা ও জলরোধী প্রলেপ ব্যবহার করা হচ্ছে। কারিগরদের মতে, বড় আকারের বাইচের নৌকা তৈরিতে কাঠের মান, ভারসাম্য এবং কারিগরি দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামান্য ত্রুটিও প্রতিযোগিতায় নৌকার গতি ও নিয়ন্ত্রণে প্রভাব ফেলতে পারে।
নৌকা নির্মাণে নিয়োজিত প্রধান কারিগর সুকুমার চন্দ্র সূত্রধর বলেন, আমার বাবা প্রায় ৮০ বছর ধরে এই পেশায় ছিলেন। তার কাছ থেকেই আমি নৌকা তৈরির কাজ শিখেছি। গত ৫৫ বছর ধরে এ কাজ করছি। এ পর্যন্ত প্রায় ১৫০টি বাইচের নৌকা বানিয়েছি। চলতি বছর ছয়টি নৌকার কাজ শেষ করে এখন চান্দাই গ্রামের ‘চান্দ্রাই জনতা এক্সপ্রেস’ তৈরি করছি। নৌকাটি ৮২ হাত লম্বা হবে। দুই প্রান্তে ১৫ হাত করে গোলা এবং মাঝের অংশ হবে ৬৭ হাত। প্রতিটি কাঠ অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে বসানো হচ্ছে। শ্রমিকদের এক মাসের মজুরি প্রায় আড়াই লাখ টাকা।
তিনি আরও বলেন, বাইচের নৌকা তৈরির কাজ শুধু পেশা নয়, এটি একটি শিল্প। একটি ভালো নৌকা তৈরিতে অভিজ্ঞতা, ধৈর্য ও নিখুঁত কারিগরি দক্ষতার প্রয়োজন হয়। আমরা সেই অভিজ্ঞতাকেই কাজে লাগাচ্ছি।
নৌকার প্রধান মাঝি আবু সাঈদ মোল্লা বলেন, ১৯৮০ সাল থেকে আমি বাইচের নৌকার মাঝি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। বর্তমানে আমার বয়স ৬০ বছর। দীর্ঘ এই সময়ে হাদল, হাটগ্রাম, গোরোরী, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছি। আল্লাহর রহমতে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন ও রানারআপ হওয়ার গৌরবও রয়েছে।
তিনি বলেন, নতুন চাঁন্দাই জনতা এক্সপ্রেস নিয়েও আমরা বড় বড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চাই। আমাদের লক্ষ্য শুধু বিজয় অর্জন নয়, চাঁন্দাই গ্রামের ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করা এবং পাবনার আটঘরিয়ার নাম দেশজুড়ে ছড়িয়ে দেয়া।
নৌকার বাইচেল রশিদ মুন্সি বলেন, বাপ-দাদার আমল থেকেই আমাদের গ্রামে নৌকাবাইচের ঐতিহ্য চলে আসছে। সেই ঐতিহ্য ধরে রাখতেই আজও গ্রামের মানুষ একসঙ্গে কাজ করছে। নতুন নৌকাটি নির্মাণে গ্রামের প্রতিটি পরিবারের আর্থিক সহযোগিতা রয়েছে। আমরা চাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এই ঐতিহ্য ধরে রাখুক।
নৌকা পরিচালনা কমিটির অন্যতম সদস্য আব্দুল মান্নান বলেন, চাঁন্দাই গ্রামের নৌকাবাইচের ইতিহাস অনেক পুরোনো। এই নৌকা শুধু একটি প্রতিযোগিতার বাহন নয়, এটি আমাদের গ্রামের ঐক্য, সংস্কৃতি ও গৌরবের প্রতীক। গ্রামের প্রতিটি পরিবারের স্বেচ্ছা অনুদানে চাঁন্দাই জনতা এক্সপ্রেস নির্মাণ করা হচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করি, নতুন এই নৌকাটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সাফল্য অর্জন করবে এবং আটঘরিয়ার সুনাম আরও বাড়াবে।
নৌকা পরিচালনা কমিটির আরেক সদস্য আসাদুল মেম্বার জানান, এই নৌকা নির্মাণের পেছনে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের একক অর্থায়ন নেই। গ্রামের প্রতিটি পরিবার তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ দিয়েছে। এ কারণেই নৌকার নামের সঙ্গে জনতা শব্দটি যুক্ত করা হয়েছে। এটি চাঁন্দাই গ্রামের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগের প্রতীক।
নির্মাণ শেষ হলে চাঁন্দাই জনতা এক্সপ্রেস পানিতে নামিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পরীক্ষামূলক বাইচ অনুষ্ঠিত হবে। এরপর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে নৌকাটি। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, অতীতের সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে নতুন এই নৌকা আবারও বিজয়ের পাল তুলে আটঘরিয়ার নাম দেশব্যাপী উজ্জ্বল করবে।
