নেপাল-তিব্বতে ভয়াবহ বন্যায় নিহত বেড়ে ১৬০, নিখোঁজ চার শতাধিক
নেপাল-চীন সীমান্ত এলাকায় কোশি নদীর আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৬০ জনে পৌঁছেছে। এছাড়া আরো শতাধিক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। হিমালয়ের উপত্যকাগুলো দিয়ে নেমে আসা কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল প্রবল স্রোতে গ্রাম, রাস্তাঘাট ও সেতু ধ্বংস হয়ে গেছে।
নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, নেপাল সীমান্তে ১৫৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, আর চীনা রাষ্ট্রীয় মাধ্যম তিব্বতে ৩ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। ফলে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে অন্তত ১৬০ জনে। নেপালি কর্তৃপক্ষের মতে, নিখোঁজ ৪০৩ জনের মধ্যে ৩৪১ জনই বিদেশি নাগরিক।
নিখোঁজদের মধ্যে ১৩৩ জন ভারতীয়, ৪৭ জন মার্কিন, ৩৩ জন ব্রিটিশ, ৩৪ জন অস্ট্রেলীয় এবং ২৪ জন কানাডীয় নাগরিক রয়েছেন। একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত আটজন দক্ষিণ কোরীয় শ্রমিকেরও কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
বুধবার (২৬ আগস্ট) সকাল আনুমানিক ৮:৪০ মিনিটে তিব্বত সীমান্তবর্তী নেপালের রাসুয়া জেলায় এই বিপর্যয় ঘটে। বরফ ও পাথরের বিশাল ধস নদী ব্যবস্থায় আছড়ে পড়ার পর এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এর ফলে সৃষ্ট প্রবল ঢল ভোটে কোশী ও ত্রিশূলী নদী বেয়ে নিচের দিকে ধেয়ে আসে এবং প্রায় কোনো সতর্কতা ছাড়াই লোকালয় ও পরিকাঠামো ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
সীমান্ত গ্রাস করেছে পানি
উদ্বেগজনক নজরদারি ভিডিওতে (সিসিটিভি ফুটেজ) দেখা গেছে, কাদা পানি ও বর্জ্যের বিশাল স্রোত চীনা অংশের কাইরংসীমান্ত এলাকা এবং নেপালের নিচু এলাকাগুলোতে আছড়ে পড়ার সময় মানুষ দিশেহারা হয়ে ছুটছে।
অন্যান্য ফুটেজে দেখা যায়, ঢলের তীব্র স্রোত পথিমধ্যে থাকা সেতু ও ঘরবাড়ি নিমেষেই ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
রাসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিং জেলায় ধ্বংসযজ্ঞ সবচেয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। সেখানকার রাস্তাঘাট, সেতু, ঘরবাড়ি ও জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যাতায়াত ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এবং হিমালয়ের দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণে উদ্ধার কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
এটি ভূমিকম্প ছিল না
এই ঘটনার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তথ্যটি দিয়েছে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)। সংস্থাটি প্রাথমিকভাবে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ৪.৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প রেকর্ড করেছিল।
তবে পরবর্তীতে ইউএসজিএস তাদের তথ্য সংশোধন করে জানায়- সেখানে প্রকৃতপক্ষে কোনো ভূমিকম্প হয়নি।
বিশাল ভূমিধসের তীব্রতার কারণেই কম্পনটি সৃষ্টি হয়েছিল। ঘটনাটি প্রায় ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমপরিমাণ কম্পন তৈরি করায় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাগুলো প্রাথমিক ভুলবশত এটিকে ভূমিকম্প হিসেবে ধরে নিয়েছিল।
এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি নিশ্চিত করে যে, বিপর্যয়টি ভূটেকটোনিক নাড়াচাড়ার কারণে নয়, বরং বিশাল বরফ ও পাথরের ধস বা তুষারধসের কারণে শুরু হয়েছিল।
যেভাবে বন্যাটির সৃষ্টি হয়
প্রাথমিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, সীমান্ত ঘেরা তিব্বতি অংশের উচ্চভূমি থেকে বরফ ও পাথরের একটি বিশাল অংশ খসে পড়ে লেন্দে নদীতে গিয়ে পড়ে (যা নেপালের নিম্নাঞ্চলে ভোটে কোশী নদী নামে পরিচিত)।
হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পানির স্থানচ্যুতি এবং বিশাল মাত্রার পাথর-কাদার ধস একটি ভয়াবহ স্রোতের সৃষ্টি করে। নদী ছাপিয়ে ধেয়ে আসা এই ঢল বিশাল পাথর, কাদা, গাছপালা ও ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
ঠিক কী পরিমাণ পানি এতে যুক্ত ছিল এবং এটি কোনো হিমবাহের হ্রদ, হিমবাহ ধস নাকি অন্য কোনো বরফ-পাথরের মিশ্র বিপর্যয় ছিল, তা বিজ্ঞানীরা এখনও খতিয়ে দেখছেন।
বিপর্যয়টি কেন এত প্রাণঘাতী হলো
এই অঞ্চলটি বিশ্বের অন্যতম ভূতাত্ত্বিকভাবে অস্থির এলাকা। অত্যন্ত খাড়া হিমালয় পর্বতমালা, হিমবাহ, সংকীর্ণ উপত্যকায় আবদ্ধ নদী এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল তাপমাত্রা মিলে এক অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করে।
জলবায়ু বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে, হিমবাহ গলে যাওয়া ও অস্থিতিশীলতার কারণে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে। উষ্ণ তাপমাত্রা বরফ ও পাথরের গঠন দুর্বল করে দেয় এবং নতুন হিমবাহ হ্রদ তৈরি বা বিদ্যমান হ্রদগুলোর আয়তন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। ফলে হঠাৎ করে বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষ নেমে আসার পরিবেশ তৈরি হয়।
এই সাম্প্রতিক বিপর্যয়টি আরও একটি বিপদকে সামনে এনেছে- উচ্চ কোনো স্থানে ধস নামলে নিম্নাঞ্চলের জনপদগুলোর প্রাণ বাঁচানোর জন্য পর্যাপ্ত সময় থাকে না।
নিখোঁজদের মধ্যে বিদেশি পর্যটক
নেপাল ও তিব্বতের মধ্যবর্তী যে অঞ্চলে এই দুর্যোগ ঘটেছে, সেটি পর্যটক, ট্রেকার ও তীর্থযাত্রীদের বহুল ব্যবহৃত একটি পথ।
নেপালি কর্মকর্তারা জানান, নিখোঁজ ৪০৩ জনের মধ্যে ৩৪১ জনই বিদেশী নাগরিক। এই তালিকায় ভারতীয় তীর্থযাত্রীদের একটি বড় দলের পাশাপাশি আমেরিকান, ব্রিটিশ, অস্ট্রেলিয়ান এবং কানাডিয়ান নাগরিকরা রয়েছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে বহু প্রধান হিন্দু ও বৌদ্ধ তীর্থযাত্রার পথ রয়েছে। তাই দুর্যোগে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া যাত্রী ও শ্রমিকদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন না করা পর্যন্ত নিহতের চূড়ান্ত সংখ্যা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।
উদ্ধার অভিযান জোরদার
উদ্ধার ও অনুসন্ধানের জন্য নেপাল সেনা, পুলিশ ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করেছে। উদ্ধারকাজে হেলিকপ্টার পাঠানো হলেও ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা, ভাঙা সেতু, ধসে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা পাহাড় এবং অব্যাহত বন্যার কারণে বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
চীনও তিব্বত অংশে ব্যাপক উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিখোঁজদের অনুসন্ধান, স্থানান্তর ও চিকিৎসাসেবা অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
ভারতসহ অন্যান্য দেশগুলোও তাদের নাগরিকদের উদ্ধারে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে।
পরিস্থিতি এখনও সংকটময়
নিশ্চিত হওয়া ১৬০ জনের মৃত্যুর সংখ্যাটি চূড়ান্ত নাও হতে পারে।
এখনও শত শত মানুষ নিখোঁজ এবং সীমান্ত এলাকার একটি বড় অংশে এখনও পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। নিখোঁজদের অনেকে হয়তো যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন কোনো নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন, আবার অনেকে কাদা ও পাথরের নিচে আটকে পড়ে থাকতে পারেন।
তাই বর্তমান প্রধান চ্যালেঞ্জ শুধু মরদেহ উদ্ধার করা নয়, বরং কে বেঁচে আছেন, কে কোথায় আটকে আছেন এবং কতজন মানুষ এই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা।
হিমালয়ের চূড়ায় হঠাৎ নেমে আসা একটি ধস কীভাবে আন্তঃসীমান্ত মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে এবং কীভাবে পাহাড়ি নদী মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংসের দেওয়ালে পরিণত হতে পারে- এই দুর্যোগ তার এক নির্মম বার্তা দিয়ে গেল।
তথ্যসূত্র: গালফ নিউজ
