পরিচয় ছাড়াই বাসা ভাড়া, অপরাধীদের আশ্রয় নিয়ে শঙ্কা সাভার-আশুলিয়ায়
ঢাকার সাভার ও আশুলিয়ায় পরিচয় যাচাই ছাড়াই বাসা ভাড়া দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। অনেক বাড়িওয়ালা জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি তো নেনই না, সংরক্ষণ করেন না ভাড়াটিয়ার পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা কিংবা মুঠোফোন নম্বরও। ফলে, কোন বাসায় কে উঠছেন, কোথা থেকে এসেছেন কিংবা সেখানে কারা থাকছেন— এসব তথ্য অনেক ক্ষেত্রেই অজানা থেকে যাচ্ছে। জনবহুল এই শিল্পাঞ্চলে ভাড়াটিয়ার তথ্য সংরক্ষণে এমন দুর্বলতা অপরাধীদের আত্মগোপনে থাকার সুযোগ করে দিচ্ছে বলে আশঙ্কা স্থানীয় বাসিন্দা ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সাভার ও আশুলিয়ার প্রায় ৯০ শতাংশ ভাড়াটিয়ার সঠিক ও হালনাগাদ তথ্য প্রশাসনের কাছে নেই। অথচ, ঢাকা জেলার এই শিল্পাঞ্চলে বাস করেন প্রায় ৪০ লাখ মানুষ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লাখ লাখ শ্রমজীবী মানুষের বসবাসের কারণে প্রতিনিয়তই বাড়ছে বাসিন্দাদের সংখ্যা। এর সুযোগ নিয়ে পরিচয় গোপন করে থাকা সহজ হচ্ছে অপরাধীদের জন্য।
এর প্রভাব পড়ছে নিরাপত্তা ও অপরাধের ক্ষেত্রে। গত এক বছরে সাভার ও আশুলিয়ায় ১৫টির বেশি অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। এসব মরদেহের বেশিরভাগের পরিচয় শনাক্ত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জটিলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
ফোন নম্বরের অভাবে তদন্তে বিলম্ব
সম্প্রতি আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় অজ্ঞাত এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এমন সমস্যা সামনে আসে। মরদেহ উদ্ধারের পর তার পরিচয় নিশ্চিত করতে পুলিশের সময় লাগে। তদন্তে গিয়ে পুলিশ জানতে পারে, ওই নারী ও তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা মাত্র দুই দিন আগে বাসাটি ভাড়া নিয়েছিলেন। কিন্তু, বাড়িওয়ালার কাছে তাদের কোনো পরিচয়পত্র তো ছিলই না, মোবাইল নম্বরও ছিল না।
ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালন করা আশুলিয়া থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রাশেদুজ্জামান বলেন, “আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করি। কিন্তু, নিহতের পরিচয় নিশ্চিত করতে কষ্ট হয়েছে। দুই দিন আগে তারা বাসা ভাড়া নিয়েছে, অথচ বাড়িওয়ালা তাদের একটি মোবাইল নম্বরও রাখেননি। একটি ফোন নম্বর অন্তত সংগ্রহে থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে আইডেন্টিফাই করা সম্ভব হতো। তথ্য না থাকায় তদন্তে যেমন বিলম্ব হয়, তেমনই অপরাধীরাও পালিয়ে যাওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে।”
পরে ওই মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) খবর দেওয়া হয়।
এর আগে ও পরে সাভার-আশুলিয়ার পৃথক জায়গায় অজ্ঞাতপরিচয় এক গৃহবধূ ও এক যুবকের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাতেও পরিচয় শনাক্তের ক্ষেত্রে একই ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে।
২০২৫ সালে আশুলিয়ায় রোকসানা আক্তার নামের এক গৃহবধূকে শ্বাসরোধ ও আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে স্বামী বাবুল আক্তারের উধাও হওয়ার ঘটনাতেও তাদের পরিচয় শনাক্ত নিয়ে ভোগান্তি পোহাতে হয়।
গত ১৬ আগস্ট রাতে আশুলিয়ার বাসাইদ এলাকায় ভাড়া বাসার একটি কক্ষ থেকে অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা সেই উদ্বেগ আরো বাড়িয়েছে। মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত করতেই পুলিশের সাত ঘণ্টার বেশি সময় পার হয়ে যায়। ওই বাসার মালিক বলতে পারেননি, কার কাছে তিনি বাসা ভাড়া দিয়েছিলেন, নিহত ব্যক্তি কে ছিলেন কিংবা তার সঙ্গে থাকা অন্য ব্যক্তির কোনো ফোন নম্বরও দিতে পারেননি।
বাসায় তথ্য নেই, কারখানায় আছে
সাভার-আশুলিয়া মূলত পোশাকশিল্পকেন্দ্রিক এলাকা। এখানে কর্মরত শ্রমিকদের তথ্য তাদের কর্মস্থলে সংরক্ষিত থাকলেও বসবাসের জায়গায় এ ধরনের তথ্যভাণ্ডার নেই।
বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, বিশেষ করে ব্যাচেলরদের জন্য ভাড়া দেওয়া বাসাগুলোতে ভাড়াটিয়ার তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা খুবই সীমিত। কোথাও শুধু নাম ও একটি ফোন নম্বর রাখা হয়, আবার কোথাও পরিচিত ব্যক্তির দেওয়া মৌখিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করেই বাসা ভাড়া দেওয়া হচ্ছে।
বেশি ভাড়া পাওয়ার আশায় এবং ঘনঘন ভাড়াটিয়া বদলের ঝামেলা এড়াতে অনেক বাড়িওয়ালা জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি বা ভাড়াটিয়া তথ্য ফরম রাখছেন না। ফলে, বাসাগুলোতে কারা থাকছেন, সে বিষয়ে প্রশাসনের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার তৈরি হচ্ছে না।
ডেন্ডাবর এলাকার দীর্ঘ সাত বছরের স্থায়ী ভাড়াটিয়া আমিনুল ইসলাম বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকায় বাস করছি। আজ পর্যন্ত কোনো বাড়িওয়ালা আমার কাছে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি কিংবা ভাড়াটিয়া তথ্য ফরম চাননি। বাসা ভাড়া নেওয়ার সময় শুধু অগ্রিম টাকা আর মৌখিক পরিচয়েই রুম পাওয়া যায়। আশপাশের প্রায় সব বাসাতেই একই নিয়ম চলছে।”
স্থানীয় বাড়িওয়ালা শিরীন আক্তার বলেন, “পোশাক শিল্পাঞ্চল হওয়ায় আমাদের এখানে ঘনঘন ভাড়াটিয়া পরিবর্তন হয়। ঝামেলা এড়াতে জাতীয় পরিচয়পত্র বা ফরম পূরণ ছাড়াই ভাড়া দেওয়া হয়। এখন থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য ফরম নেওয়া ছাড়া কোনো ভাড়াটিয়াকে বাসায় উঠতে দেওয়া হবে না।”
পলাতক আসামিদেরও পাওয়া গেছে আশুলিয়ায়
সাভার-আশুলিয়ায় বিভিন্ন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামিসহ অপরাধীদের আশ্রয় নেওয়ার নজির রয়েছে। মানিকগঞ্জের আলোচিত টুটুল হত্যা মামলার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি সুরুজ মিয়া ওরফে সৌরভ ২০২৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আশুলিয়ার পলাশবাড়ী কামাল গেট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন। ফরিদপুরের আলোচিত অটোরিকশাচালক হত্যা মামলার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত এক আসামিকেও ঢাকার আশুলিয়া এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। শেরপুর জেলার একটি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি মো. বারেক আলীকেও (৫০) আশুলিয়া থেকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। এছাড়া ভুয়া পরিচয়ে সাভারের শ্যামপুরে ‘জঙ্গি আরিফ’ বাসা ভাড়া নিয়ে আস্তানা তৈরি করে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ভাড়াটিয়ার পরিচয় যাচাই ও তথ্য সংরক্ষণে দুর্বলতা থাকলে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মানুষের ভিড়ে অপরাধীদের সহজে মিশে যাওয়ার সুযোগ থাকায় সাভার-আশুলিয়াকে কুখ্যাত ডাকাত ও সন্ত্রাসী চক্র নিরাপদ আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করছে। একইসঙ্গে উগ্রবাদীরা ছদ্মবেশে নাশকতার পরিকল্পনা করার সুযোগ পাচ্ছে। কোনো অপরাধের পর তথ্যের ঘাটতির কারণে আসামিরা সহজেই এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগও পাচ্ছে। ফলে, অপরাধী শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অতিরিক্ত সময়, শ্রম ও সম্পদ ব্যয় করতে হচ্ছে।
হোল্ডিং নম্বর ধরে তথ্য সংরক্ষণের দাবি
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, “সাভার-আশুলিয়ায় ৯০ শতাংশের বেশি ভাড়াটিয়ার সঠিক তথ্য কারো কাছে নেই। ট্রেড লাইসেন্সধারী অন্য ব্যবসায়ীদের মতো বাড়িওয়ালাদের তথ্যও ইউনিয়ন পরিষদ বা থানায় থাকা বাধ্যতামূলক করা উচিত। হোল্ডিং নম্বর ধরে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংগ্রহ করা গেলে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড অনেকাংশে কমে আসবে।”
পুলিশও চায় তথ্যভাণ্ডার
পুলিশ বলছে, ভাড়াটিয়া ও বাড়িওয়ালার তথ্য সংরক্ষণের একটি কাঠামো প্রয়োজন। ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) রাকিবুল হাসান ইশান বলেন, “সাভার ও আশুলিয়া এলাকা অত্যন্ত জনবহুল ও শিল্পকেন্দ্রিক। আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে, ঢাকা জেলাজুড়েই ভাড়াটিয়া ও বাড়িওয়ালাদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করার। একটি সেলফ-রেজিস্ট্রেশন ভিত্তিক অনলাইন ডাটাবেজ তৈরির কাজ দ্রুত বাস্তবায়নের চেষ্টা করছি।”
তিনি বলেন, “সরাসরি ভাড়াটিয়া বা বাড়িওয়ালার তথ্য সংগ্রহ করা মূলত পুলিশিং কাজের আওতাভুক্ত নয়। এটি পৌরসভা বা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের কাজ হওয়া উচিত। তা সত্ত্বেও নিরাপত্তার তাগিদে ক্রাইম ডিটেকশন ও অপরাধ দমনে গতি আনতে আমরা নিজেদের উদ্যোগেই এই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।”
পরিচয় শনাক্তে তথ্যের গুরুত্ব
অজ্ঞাত মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করতে পিবিআই নিজস্ব প্রযুক্তি ব্যবহার করে। তবে, তদন্তের শুরুতেই যদি ভাড়াটিয়ার পরিচয়, ঠিকানা, ফোন নম্বর বা বায়োডাটা পাওয়া যায়, তাহলে তদন্ত অনেক দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব বলে জানিয়েছেন পিবিআই কর্মকর্তারা।
পিবিআই’র ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) এম এন মুরশেদ বলেছেন, “অজ্ঞাত বা পরিচয়হীন মরদেহ উদ্ধার হলে পিবিআই নিজস্ব প্রযুক্তির সাহায্যে পরিচয় শনাক্তের কাজ করে। তবে, যেকোনো অপরাধ তদন্ত ও আসামি আইডেন্টিফিকেশনের ক্ষেত্রে ভাড়াটিয়া ফরম বা বায়োডাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সঠিক তথ্য ও পরিচয়পত্র সংরক্ষিত থাকলে যেকোনো অপরাধের রহস্য উদঘাটন ও আসামিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা সম্ভব।”
