পর্দায় মানুষের মুক্তির গল্প বলা জহির রায়হানের অমীমাংসিত অধ্যায়
কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাদের কাজ থেকে যায় সময়ের চেয়েও দীর্ঘ জীবন নিয়ে। জহির রায়হান তেমনই একজন। তিনি গল্প লিখেছেন, সিনেমা বানিয়েছেন, সাংবাদিকতা করেছেন; আবার প্রয়োজনের মুহূর্তে ক্যামেরাকেই পরিণত করেছেন প্রতিবাদের ভাষায়। ভাষা আন্দোলনের চেতনা, বাঙালির অধিকারবোধ, মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত বাস্তবতা তার সৃষ্টির ভেতর দিয়ে বারবার ফিরে এসেছে এই ভূখণ্ডের মানুষের স্বপ্ন ও সংগ্রাম। অথচ যে মানুষটি পর্দায় মানুষের মুক্তির গল্প লিখেছিলেন, তার নিজের জীবনের শেষ গল্পটিই থেকে গেছে অসমাপ্ত।
১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার মজুপুর গ্রামে জন্মেছিলেন জহির রায়হান। মাত্র ৩৬ বছরের জীবনে সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে যে কাজ তিনি করে গেছেন, তা তাকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্রষ্টায় পরিণত করেছে।
তার প্রকৃত নাম ছিল আবু আবদাল মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ। ছাত্রজীবনেই রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল।
বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল করার সময় তিনি গ্রেপ্তার হন। পরে ‘জহির রায়হান’ নামেই পরিচিত হয়ে ওঠেন।
শুধু রাজনীতি নয়, সাহিত্যও তখন তার ভাবনার বড় জায়গা। ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সূর্যগ্রহণ’। এরপর ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’, ‘হাজার বছর ধরে’, ‘আরেক ফাল্গুন’, ‘বরফ গলা নদী’ ও ‘আর কতদিন’ এর মতো বইয়ে তিনি তুলে ধরেন মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, মধ্যবিত্তের টানাপোড়েন, গ্রামীণ সমাজ এবং সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা। ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসের জন্য ১৯৬৪ সালে তিনি আদমজী সাহিত্য পুরস্কার পান।
সাংবাদিকতাও ছিল তার কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ‘যুগের আলো’, ‘খাপছাড়া’, ‘যান্ত্রিক’, ‘সিনেমা’সহ বিভিন্ন প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। পরে ‘প্রবাহ’ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্বও পালন করেন। অর্থাৎ কলম তার কাছে শুধু সাহিত্য সৃষ্টির মাধ্যম ছিল না; সময়কে বোঝা এবং মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ারও একটি পথ ছিল।
এরপর তিনি চলচ্চিত্র নিজের করে নিলেন। ১৯৫৭ সালে ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ চলচ্চিত্রে সহকারী হিসেবে কাজ করার মধ্য দিয়ে তার চলচ্চিত্রজীবনের সূচনা। ১৯৬১ সালে ‘কখনো আসেনি’ দিয়ে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এরপর ‘কাঁচের দেয়াল’, ‘বেহুলা’, ‘আনোয়ারা’সহ একাধিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ১৯৬৪ সালের ‘সঙ্গম’ ছিল পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র এবং পরের বছর ‘বাহানা’ ছিল পাকিস্তানের প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র।
কিন্তু জহির রায়হানের চলচ্চিত্রজীবনের আসল গুরুত্ব শুধু প্রযুক্তিগত সাফল্যে নয়। তার সিনেমায় ধীরে ধীরে সময়ের রাজনৈতিক ভাষা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ‘জীবন থেকে নেয়া’। ১৯৭০ সালে মুক্তি পাওয়া এই চলচ্চিত্রে একটি পরিবারের গল্পের ভেতর দিয়ে ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, নিপীড়ন ও মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে প্রতীকের মাধ্যমে তুলে ধরেন তিনি। ভাষা আন্দোলনের চেতনা এবং তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতার ছাপ থাকা এই চলচ্চিত্র পর্দার বিনোদনের গণ্ডি পেরিয়ে একটি সময়ের রাজনৈতিক দলিল হয়ে ওঠে।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে জহির রায়হানের ক্যামেরা আরো সরাসরি যুদ্ধের পক্ষে দাঁড়ায়। ২৫ মার্চের পর তিনি কলকাতায় যান। সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচার ও চলচ্চিত্র নির্মাণে যুক্ত হন। তার নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’ পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার ভয়াবহতা বিশ্বের সামনে তুলে ধরার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র দলিল হয়ে ওঠে। চলচ্চিত্রটি আন্তর্জাতিকভাবেও আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং ১৯৭২ সালে তাসখন্দ চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয়।
কলকাতায় ‘জীবন থেকে নেয়া’র প্রদর্শনীও ছিল গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঘটনা। চলচ্চিত্রটি দেখে সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, তপন সিনহা ও ঋত্বিক ঘটকের মতো নির্মাতারা প্রশংসা করেছিলেন বলে বাংলাদেশ টেলিভিশনের একটি প্রামাণ্যচিত্রে উল্লেখ রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় চলচ্চিত্র প্রদর্শনী থেকে পাওয়া অর্থ মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় দেওয়ার কথাও বিভিন্ন সূত্রে এসেছে।
স্বাধীনতা এলো। কিন্তু জহির রায়হানের নিজের জীবনে তখনও শান্তি ফেরেনি। তার বড় ভাই প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক শহীদুল্লা কায়সার, ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের সময় নিখোঁজ হন। স্বাধীনতার পর ভাইকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন জহির রায়হান। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি তিনি খবর পান, শহীদুল্লা কায়সারকে মিরপুরে দেখা গেছে বা সেখানে আটক রাখা হয়েছে। ভাইকে খুঁজতে সেদিন তিনি মিরপুরে যান। এরপর আর ফিরে আসেননি।
মিরপুর তখনো পুরোপুরি নিরাপদ ছিল না। সেদিনের অভিযানে সেনা ও পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। পরদিন মিরপুর নিয়ন্ত্রণে এলেও জহির রায়হানের মরদেহ আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। মিরপুরের ১২ নম্বর পানির ট্যাংকের কাছে তার শেষ অবস্থানের কথা বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে।
তারপর কেটে গেছে পাঁচ দশকেরও বেশি সময়। কিন্তু জহির রায়হানের শেষ পরিণতি নিয়ে প্রশ্ন পুরোপুরি শেষ হয়নি। তিনি ঠিক কীভাবে নিহত হন, তার মরদেহের কী হয়েছিল এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য ও সর্বসম্মত উত্তর আজও অনুপস্থিত। তাই তার জীবনের শেষ অধ্যায় বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গভীর বেদনা ও রহস্যের অংশ হয়ে আছে।
অদ্ভুত এক পরিহাসও যেন এখানে লুকিয়ে আছে। যে মানুষটি ক্যামেরা দিয়ে সময়কে ধরে রাখতে চেয়েছিলেন, তার নিজের শেষ সময়ের দৃশ্য আমাদের হাতে নেই। তিনি ‘স্টপ জেনোসাইড’-এ একটি জাতির ওপর সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের সাক্ষ্য রেখে গেছেন, কিন্তু তার নিজের অন্তর্ধানই হয়ে গেছে ইতিহাসের এক অনুপস্থিত দৃশ্য।
জহির রায়হানের জীবন তাই শুধু একজন চলচ্চিত্রকারের জীবন নয়। এটি এমন এক প্রজন্মের গল্প, যারা ভাষার অধিকার থেকে স্বাধীনতার স্বপ্ন পর্যন্ত প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে নিজেদের যুক্ত করেছিল। তিনি সেই প্রজন্মের একজন শিল্পী, যিনি দর্শকের সামনে শুধু গল্প বলেননি গল্পের ভেতর সময়ের সত্যটিও রেখে গেছেন।
সাহিত্যে তিনি মানুষের জীবন দেখেছেন। চলচ্চিত্রে দেখেছেন সমাজ ও রাষ্ট্রকে। প্রামাণ্যচিত্রে তুলে ধরেছেন যুদ্ধের নির্মমতা। আর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত খুঁজেছেন তার নিখোঁজ ভাইকে। তার সৃষ্টির সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই তিনি সময়কে দূর থেকে দেখেননি। সময়ের ভেতর দাঁড়িয়েই তাকে ধারণ করেছেন।
বুধবার ৯১তম জন্মদিনে তাই জহির রায়হানকে মনে করার অর্থ শুধু তার পুরোনো সিনেমা কিংবা বইয়ের কথা মনে করা নয়। বরং ফিরে দেখা এমন এক শিল্পীকে, যার কাছে শিল্প ছিল মানুষের কথা বলার মাধ্যম, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস এবং ইতিহাসকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব।
পর্দায় তিনি মানুষের মুক্তির গল্প লিখেছিলেন। কিন্তু মিরপুরের অন্ধকারে এসে তার নিজের গল্প থেমে গেল। সেই অসমাপ্ত গল্পই হয়তো তাকে আজও এতটা জীবন্ত করে রেখেছে কারণ কিছু মানুষের জীবন শেষ হয়, কিন্তু তাদের প্রশ্নের শেষ হয় না।
