পৃথিবীতে ২ হাজারের বেশি পারমাণবিক পরীক্ষা, কী ঘটেছিল মানুষের শরীরে?
মাশরুমের মতো বিশাল মেঘ, চোখ ধাঁধানো আলো আর ভয়াবহ বিস্ফোরণ—পারমাণবিক পরীক্ষার দৃশ্য কয়েক সেকেন্ডের। কিন্তু এর প্রভাব শেষ হতে পারে না এত সহজে। তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে বাতাস, পানি ও খাদ্যশৃঙ্খলে; ক্ষতিগ্রস্ত হয় মানুষের শরীর ও পরিবেশ।
১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোতে ‘Trinity’ পরীক্ষার মধ্য দিয়ে শুরু হয় পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ। এরপর বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে চালানো হয়েছে ২ হাজারের বেশি পারমাণবিক পরীক্ষা। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এসব পরীক্ষা ৬০টিরও বেশি স্থানে মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে।
কিন্তু বিস্ফোরণের পর মানুষের শরীরে আসলে কী ঘটে?
প্রথম আঘাত আসে তাপ ও বিকিরণে
পারমাণবিক বিস্ফোরণের কাছাকাছি থাকা মানুষের শরীরে একসঙ্গে আঘাত হানতে পারে প্রচণ্ড তাপ, বিস্ফোরণের চাপ এবং তাত্ক্ষণিক বিকিরণ। তীব্র তাপে শরীর পুড়ে যেতে পারে। আর উচ্চমাত্রার বিকিরণে ত্বকের ক্ষতি, চুল পড়ে যাওয়া, দুর্বলতা, বমি ও বমিভাব দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত মাত্রার বিকিরণে Acute Radiation Syndrome (ARS) বা তীব্র বিকিরণজনিত অসুস্থতা তৈরি হতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে এটি প্রাণঘাতীও হতে পারে। তবে ক্ষতির মাত্রা সবার ক্ষেত্রে এক নয়। বিস্ফোরণ থেকে দূরত্ব, আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ, বিকিরণের মাত্রা এবং কতক্ষণ বিকিরণের সংস্পর্শে ছিলেন—এসবের ওপর ঝুঁকি নির্ভর করে।

বিস্ফোরণ শেষ, কিন্তু ‘ফলআউট’ থেকে যায়
পারমাণবিক পরীক্ষার পর সবচেয়ে বড় বিপদগুলোর একটি হলো radioactive fallout। বিস্ফোরণের সময় মাটি ও অন্যান্য পদার্থ তেজস্ক্রিয় উপাদানের সঙ্গে মিশে বায়ুমণ্ডলে উঠে যেতে পারে। পরে বাতাসের সঙ্গে দূরে ছড়িয়ে পড়ে সেগুলো ধুলো বা বৃষ্টির মাধ্যমে আবার মাটিতে নেমে আসে। ফলে পরীক্ষাস্থল থেকে অনেক দূরের মানুষও তেজস্ক্রিয়তার সংস্পর্শে আসতে পারেন।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪৫ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে চালানো ২ হাজারের বেশি পারমাণবিক পরীক্ষার মধ্যে ৫০০টিরও বেশি ছিল বায়ুমণ্ডলে পরিচালিত।
কীভাবে তেজস্ক্রিয়তা শরীরে ঢোকে?
তেজস্ক্রিয়তার সংস্পর্শ দুইভাবে হতে পারে—external exposure এবং internal exposure। তেজস্ক্রিয় পদার্থ শরীরের বাইরে থাকলেও সেখান থেকে বিকিরণ শরীরে পৌঁছাতে পারে। আবার দূষিত বাতাস শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে ঢুকতে পারে। মাটি ও পানিতে তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়লে তা খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমেও মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এ কারণেই একটি পারমাণবিক বিস্ফোরণের প্রভাব শুধু বিস্ফোরণস্থলের আশপাশে সীমাবদ্ধ থাকে না।

থাইরয়েডে আঘাত করতে পারে আয়োডিন-১৩১
পারমাণবিক fallout-এর একটি আলোচিত উপাদান হলো আয়োডিন-১৩১ (I-131)। থাইরয়েড গ্রন্থি শরীরের প্রয়োজনীয় আয়োডিন গ্রহণ করে। ফলে তেজস্ক্রিয় আয়োডিন শরীরে প্রবেশ করলে থাইরয়েড সেটিকে সাধারণ আয়োডিন থেকে আলাদা করতে পারে না। এতে থাইরয়েড বিকিরণের সংস্পর্শে আসে। বিশেষ করে শিশুদের ঝুঁকি বেশি, কারণ তাদের থাইরয়েড বিকিরণের প্রতি তুলনামূলকভাবে বেশি সংবেদনশীল। যুক্তরাষ্ট্রের Nevada Test Site-এর পারমাণবিক পরীক্ষার fallout নিয়ে করা গবেষণাতেও শৈশবে তেজস্ক্রিয় আয়োডিনের সংস্পর্শ এবং পরবর্তী থাইরয়েড সমস্যার সম্পর্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।
ক্যানসারের ঝুঁকি—যে ক্ষতি দেখা দিতে পারে বহু বছর পর
বিকিরণের সব ক্ষতি সঙ্গে সঙ্গে বোঝা যায় না। উচ্চমাত্রার ionizing radiation শরীরের কোষের DNA ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এই ক্ষতির কিছু দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিকিরণের মাত্রা ও exposure-এর ধরন অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে বিকিরণের সংস্পর্শ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা কিছু বিকিরণজনিত স্বাস্থ্যপ্রভাবের প্রতি বেশি সংবেদনশীল। অর্থাৎ বিস্ফোরণের সময় একজন মানুষ বাইরে থেকে স্বাভাবিক দেখালেও তার শরীরে ক্ষতির কোনো প্রভাব ভবিষ্যতে প্রকাশ পেতে পারে।
বিকিনি অ্যাটল: বিস্ফোরণ থামলেও বিপদ থামেনি
পারমাণবিক পরীক্ষার ভয়াবহতার অন্যতম উদাহরণ Bikini Atoll। মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের এই এলাকায় যুক্তরাষ্ট্র একাধিক পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়। ১৯৫৪ সালের Castle Bravo পরীক্ষা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এর radioactive fallout প্রত্যাশার চেয়ে অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। পরীক্ষা বন্ধ হওয়ার পরও ওই অঞ্চলের মাটি, খাদ্য ও পরিবেশে তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন উদ্বেগ ছিল। অর্থাৎ বিস্ফোরণ শেষ হলেও জায়গাটি সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক হয়ে যায়নি।

সেমিপালাতিনস্কে ৪৫০টির বেশি পরীক্ষা
কাজাখস্তানের Semipalatinsk ছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্যতম প্রধান পারমাণবিক পরীক্ষা কেন্দ্র। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ৪৫০টিরও বেশি পারমাণবিক পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। ১৯৯১ সালে পরীক্ষাকেন্দ্রটি বন্ধ করা হয়। এই স্থানটির সঙ্গে ২৯ আগস্টের আন্তর্জাতিক পরমাণু পরীক্ষা বিরোধী দিবসেরও বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৯১ সালের ২৯ আগস্ট Semipalatinsk পরীক্ষাকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল।
শুধু মানুষ নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পরিবেশও
তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব মানুষের শরীরেই সীমাবদ্ধ নয়। মাটি ও পানিতে radioactive contamination ছড়িয়ে পড়লে কৃষিকাজ, খাদ্যশৃঙ্খল ও মানুষের বসবাসও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। কিছু পরীক্ষাস্থলে দীর্ঘদিন ধরে মাটি, পানি ও পরিবেশের তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে গবেষণা চালাতে হয়েছে। তাই পারমাণবিক পরীক্ষার ইতিহাস শুধু অস্ত্রের শক্তি যাচাইয়ের ইতিহাস নয়; এটি মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের ইতিহাসও।
তাহলে এত পরীক্ষা কেন হয়েছিল?
এর পেছনে বড় ভূমিকা ছিল শীতল যুদ্ধের পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্রের শক্তি ও কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে একের পর এক বিস্ফোরণ চালায়। পরে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন, ভারত, পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়াও পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়েছে। ১৯৪৫ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে চালানো পরীক্ষার সংখ্যা ২ হাজার ছাড়িয়ে যায়।
এখন কি পারমাণবিক পরীক্ষা বন্ধ?
বিশ্বে পারমাণবিক পরীক্ষার সংখ্যা আগের তুলনায় ব্যাপকভাবে কমেছে। ১৯৯৬ সালে গ্রহণ করা হয় Comprehensive Nuclear-Test-Ban Treaty (CTBT), যার লক্ষ্য সব ধরনের পারমাণবিক বিস্ফোরণ নিষিদ্ধ করা। তবে চুক্তিটি এখনো কার্যকর হয়নি। ১৯৯৬ সালের পরও ভারত ও পাকিস্তান ১৯৯৮ সালে এবং উত্তর কোরিয়া ২০০৬ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে একাধিক পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়েছে।

সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়—বিকিরণ দেখা যায় না
আগুন দেখা যায়, ধোঁয়া দেখা যায়, বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। কিন্তু বিকিরণ দেখা যায় না, গন্ধও পাওয়া যায় না। অথচ পর্যাপ্ত মাত্রায় বিকিরণ শরীরের কোষ ও DNA ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এর কিছু প্রভাব প্রকাশ পেতে পারে বিস্ফোরণের বহু বছর পর। তাই পারমাণবিক বিস্ফোরণের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এটিই—বিস্ফোরণ কয়েক সেকেন্ডে শেষ হলেও তার তেজস্ক্রিয় ছায়া মানুষের শরীর ও পরিবেশে বহু বছর থেকে যেতে পারে।
তথ্যসূত্র: United Nations (UN), World Health Organization (WHO), Centers for Disease Control and Prevention (CDC) এবং Comprehensive Nuclear-Test-Ban Treaty Organization (CTBTO)।
বাপ্পি/সা.এ
