বাঁধনের ওপর হামলার পরও থামেনি বিদ্বেষ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বুনো উল্লাস


ইতালিতে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের ওপর হামলা ও হেনস্তার ঘটনায় যখন বিভিন্ন মহল থেকে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে, ঠিক তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। হামলার ভিডিও শেয়ার করে একশ্রেণির ফেসবুক ব্যবহারকারী প্রকাশ্যেই উল্লাস করছেন। কেউ হামলাকারীদের প্রশংসা করছেন, কেউ আবার হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে চা খাওয়ানো কিংবা ‘পার্টি’ দেওয়ার কথাও লিখছেন।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) রাতে ইতালির মেস্ত্রে শহরের একটি পার্কে ভাই ও তার পরিবারের সঙ্গে অবস্থানকালে হামলা ও হেনস্তার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেন বাঁধন। ঘটনার পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লাইভে এসে তিনি বিস্তারিত তুলে ধরেন। বাঁধনের ভাষ্য অনুযায়ী, একদল প্রবাসী বাংলাদেশি তার দিকে পানি, কোমল পানীয় ও ডিম নিক্ষেপ করেন। একপর্যায়ে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয় এবং তার হাত থেকে মোবাইল ফোন ফেলে দেওয়া হয়। তার ভাইয়ের স্ত্রীকেও ধাক্কা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

বাঁধনের অভিযোগ, হামলাকারীদের কয়েকজন নিজেদের আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মী-সমর্থক হিসেবে পরিচয় দেন। ভিডিওতে কয়েকজনকে বাঁধনকে ‘জুলাই জঙ্গি’ ও ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলতে এবং তাকে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিতে বলতে শোনা যায়। ঘটনার ভিডিও ধারণও করছিলেন তারা।

কিন্তু ঘটনা সেখানেই থেমে থাকেনি। হামলার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তা ঘিরে শুরু হয় আরেক ধরনের বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ। হামলার নিন্দার পাশাপাশি কিছু ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে ঘটনাটিকে আনন্দের বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করে পোস্ট ও মন্তব্য করতে দেখা গেছে।

এমনই একটি পোস্টে Md Araf নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে হামলার দৃশ্যের ভিডিও শেয়ার করে লেখা হয়, “মনটাই তো ভালো হয়ে গেলো।” সঙ্গে ব্যবহার করা হয় কান্না ও উদ্‌যাপনের ইমোজি।

ওই পোস্টের মন্তব্যের ঘরেও হামলাকে কেন্দ্র করে বিদ্রূপাত্মক কথাবার্তা দেখা যায়। একজন মন্তব্যকারী লেখেন, “যে থাপ্পড়টা দিছে তার এক কাপ চা খাওয়াতে ইচ্ছে করতেছে…”

এর জবাবে পোস্টদাতা লেখেন, “ধুর বেডা, খালি কি চা? বেডার লগে পার্টি দিতে হবে!”

অর্থাৎ একজন নারী অভিনয়শিল্পীর ওপর শারীরিক হামলার অভিযোগ সামনে আসার পরও ঘটনাটি নিয়ে প্রকাশ্যে আনন্দ প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একাংশকে।

আরেকটি পোস্টে Joynal Abedin নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে হামলার ভিডিও শেয়ার করে বাঁধনকে ‘ডিপস্টেটের দালাল’, ‘জুলাই জঙ্গি’সহ বিভিন্ন আক্রমণাত্মক বিশেষণে অভিহিত করা হয়। একই পোস্টে হামলাকারীদের ‘প্রবাসী দেশপ্রেমিক বাঙালী’ হিসেবে উল্লেখ করে একাধিক হাসির ইমোজিও ব্যবহার করা হয়েছে।

স্ক্রিনশট নেওয়ার সময় ওই পোস্টটিতে প্রায় ৩ হাজার প্রতিক্রিয়া, ৩৮৭টি মন্তব্য এবং ১৪৯টি শেয়ার দেখা যায়। ফলে হামলাকে ঘিরে এ ধরনের উল্লাস ও বিদ্রূপ যে একেবারেই নজরের বাইরে থেকে যাচ্ছে, সেটিও বলা যাচ্ছে না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব পোস্টে হামলার ঘটনাকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের মতো করে উপস্থাপনের প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। বাঁধনের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে ভূমিকা ও রাজনৈতিক অবস্থান টেনে তাকে আক্রমণ করে বিভিন্ন মন্তব্য করা হচ্ছে। হামলার সময় ধারণ করা ভিডিওতেও তাকে ‘জুলাই জঙ্গি’ বলে সম্বোধন করার বিষয়টি একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

বাঁধন নিজেও মনে করছেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখার কারণেই তাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেছেন, হামলাকারীরা নিজেদের আওয়ামী লীগ সমর্থক ও ‘বঙ্গবন্ধুর সৈনিক’ হিসেবেও পরিচয় দিয়েছেন।

ঘটনার পর ইতালির স্থানীয় পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছেন বাঁধন। তিনি হামলা ও হেনস্তার কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রকাশ করেছেন।

বাঁধন জানিয়েছেন, ঘটনার সময় তার ভাইয়ের ছোট শিশুও সেখানে ছিল। হামলাকারীদের উদ্দেশে তিনি প্রশ্ন তোলেন, একটি শিশুর সামনে এ ধরনের আচরণ কীভাবে করা সম্ভব। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেছেন, এ ধরনের হামলা বা ভয়ভীতি দেখিয়ে তাকে দমানো যাবে না।

এদিকে ঘটনার পর বাঁধন নিরাপদে আছেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব কে এম নাজমুল হক। একই সঙ্গে এ ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।

রাজনৈতিক মতপার্থক্য, কোনো শিল্পীর রাজনৈতিক অবস্থানের বিরোধিতা কিংবা তার কর্মকাণ্ডের সমালোচনা—সবই হতে পারে। কিন্তু সেই বিরোধ যখন শারীরিক হামলায় গড়ায় এবং হামলার অভিযোগ সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা নিয়ে প্রকাশ্যে উল্লাস, বিদ্রূপ ও হামলাকারীদের প্রশংসা করা হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা ও সামাজিক মূল্যবোধ নিয়েও।

বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনাটি এখন তাই শুধু ইতালির একটি পার্কে ঘটে যাওয়া হেনস্তার অভিযোগে সীমাবদ্ধ নেই; ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিদ্বেষ ও উল্লাসও হয়ে উঠেছে আলোচনার আরেকটি দিক।





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *