বেনজীর সিরিয়াল কিলার, তাকে ফেরাতে আমিরাতে ল ফার্ম নিয়োগ করা হয়েছে
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে সিরিয়াল কিলার হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
সেই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সঙ্গে বাংলাদেশের বন্দিবিনিময় চুক্তি না থাকলেও বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনতে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। আইনি লড়াইয়ের জন্য আমিরাতে একটি ল ফার্মও নিয়োগ দিয়েছে সরকার।
বেনজীরকে ফেরত আনা নিয়ে মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রাতে জাতীয় সংসদে সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেমের একটি সাধারণ প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা জানান। এসময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদকে আশ্বস্ত করেন যে, কেবল বেনজীর নন, বিদেশে পলাতক সব অপরাধীকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারিক প্রক্রিয়ায় বিচার নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের শৈথিল্য প্রদর্শন করা হবে না।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বেনজীর আহমেদের মতো একজন কুখ্যাত লোক নিয়ে মহান সংসদে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করতে হচ্ছে, এটি খুবই দুর্ভাগ্যজনক। তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে একজন সিরিয়াল কিলার। তার বিরুদ্ধে উপযুক্ত আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করা হয়। গত ১২ জুন ইন্টারপোলের আবুধাবি শাখা আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় যে, বেনজীর আহমেদ সংযুক্ত আরব আমিরাতে গ্রেফতার হয়েছেন।’
মন্ত্রী জানান, আমিরাতের আইন অনুযায়ী ৩০ দিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠানোর কথা থাকলেও বাংলাদেশ সরকার মাত্র চারদিনের মাথায় তা প্রেরণ করে। দুই দেশের মধ্যে সরাসরি প্রত্যার্পণ (বন্দি বিনিময়) চুক্তি না থাকায় পারস্পরিক আইনি সহায়তা (মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিসটেন্স) নীতির আওতায় তাকে ফেরানোর চেষ্টা চলছে। আইনি লড়াইয়ের জন্য গত ৩০ জুলাই আমিরাতের ‘হামদান আল কাবি অ্যাডভোকেটস অ্যান্ড লিগ্যাল কনসালটেন্সি’ নামের একটি শীর্ষ ল ফার্ম নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ। আমিরাত সরকার বেনজীরকে ফেরানোর বিষয়ে কিছু সুনির্দিষ্ট আইনি নথি ও আরবি অনুবাদ চেয়েছে, যা দ্রুত সময়ের মধ্যে পাঠানো হচ্ছে।
বেনজীর জামিন নিয়ে আমিরাত থেকে সেন্ট লুসিয়ায় পালিয়েছেন— গণমাধ্যমে প্রকাশিত এমন খবরের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কোনো রাষ্ট্র বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি। অনির্ভরযোগ্য উৎসের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সমীচীন নয়। তার বিরুদ্ধে রেড নোটিশ কার্যকর রয়েছে।’
এছাড়া দেশে বেনজীরের পাসপোর্ট জালিয়াতির বিষয়ে মামলা চলমান আছে এবং তার জব্দ করা অ্যাপার্টমেন্ট সিলগালা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের পরিসংখ্যান
বক্তব্যে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের মানবাধিকার লঙ্ঘনের পরিসংখ্যান তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ওই সময়ে হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে এক হাজার ৪৮ জনের। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্যাতনে মারা গেছেন ১৩৩ জন। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে গুমের শিকার হয়েছেন ৭০৯ জন, যার মধ্যে ১৫৫ জন এখনো ফেরেননি। তবে গুম কমিশনে এ পর্যন্ত এক হাজার ৮৫০ জনের অভিযোগ জমা পড়েছে। রাজনৈতিক সহিংসতায় দুই হাজার ৬৩০ জন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে তিন হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। সব মিলিয়ে ওই শাসনামলে সাত থেকে আট হাজার মানুষ নিপীড়ন ও হত্যার শিকার হয়েছেন।
জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘জাতিসংঘের তথ্যমতে এক হাজার ৪০০ লোক নিহত হলেও আমাদের হিসাব মতে নিহতের সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ গুরুতর আহত বা চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। সরকারি হিসাবে দুই চোখ হারানো মানুষের সংখ্যা ৩৮ জন হলেও, হাসপাতালে চিকিৎসাধীনদের হিসাব মেলালে এই সংখ্যা পাঁচ শতাধিক ছাড়িয়ে যাবে। এক চোখ হারিয়েছেন ২৬৩ জন এবং স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়েছেন দুই হাজার ৪০৭ জন।’
এই ১৭ বছরের নির্যাতন-নিপীড়নের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে শেখ হাসিনার পরই বেনজীর আহমেদ ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের নাম উল্লেখ করেন তিনি।
বেনজীরকে ফেরানোর বিষয়ে সরকারের ধীরগতির অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, ‘সব বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে দুবাই ছুটে গেলেই হয় না। রাষ্ট্রীয় ও আইনি প্রক্রিয়া আছে। আমরা কূটনৈতিক চ্যানেলে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’
এ বিষয়ে দুবাইয়ে প্রবাসীরা কেন আন্দোলন করছে না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ওটা একটি রাজতন্ত্র। সেখানে মিছিল করলেই বেনজীরকে দিয়ে দেবে না, উল্টো প্রবাসীরা গ্রেফতার হবেন। এর আগে জুলাই আন্দোলনে সেখানে প্রবাসীরা গ্রেফতার হয়েছিলেন, তাদের ছাড়িয়ে আনতে আমাদের জান বেরিয়ে গেছে।’
মানবাধিকার ও গুমবিরোধী আইন পাসের সময় বিরোধীদলের সংসদ বর্জনেরও সমালোচনা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আপনারা স্ট্যান্ডিং কমিটির মিটিংয়ে গেলেন, অথচ আইন পাসের আগে ওয়াকআউট করলেন। আপনারা সংশোধনী দিয়ে সহযোগিতা করতে পারতেন, তা করেননি। গুম আইনে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড রাখা হয়েছে। আমাদের প্রতিশ্রুতি ছিল গুম শব্দটি চিরতরে মুছে ফেলার, আমরা সেই আইনি কাঠামো তৈরি করেছি।’
এমওএস/একিউএফ
