রড চুরির অপবাদে হাত-পা বেঁধে ৩ ঘণ্টা ধরে পেটানো হয় ১৪ বছর বয়সী শিশুকে
ফরিদপুরের মধুখালীতে রড চুরির অপবাদ দিয়ে তাওহিদ শেখ (১৪) নামের এক শিশুকে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। নির্যাতনের শিকার শিশুটি বর্তমানে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
স্থানীয় একটি মুড়ি কারখানার মালিক ও তার ছেলে এ নির্যাতন চালিয়েছেন বলে দাবি ভুক্তভোগী শিশু ও তার পরিবারের।
শিশুটির ভাষ্যমতে, চুরির অপবাদ দিয়ে তার হাত-পা ও চোখ-মুখ বেঁধে লোহার পাইপ দিয়ে বেধড়ক পেটানো হয়েছে। নির্যাতনের শিকার শিশুটি আহত অবস্থায় বর্তমানে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
রোববার (৩০ আগস্ট) দিবাগত রাতে উপজেলার নওয়াপাড়া বাজার এলাকায় ‘মায়ের দোয়া’ মুড়ি কারখানার দ্বিতীয়তলার ছাদে শিশুটিকে নির্যাতন করা হয় বলে স্বজনদের অভিযোগ। ভুক্তভোগী তাওহিদ শেখ উপজেলার নওপাড়া ইউনিয়নের নওপাড়া কুরানিয়ার চর এলাকার রুবেল শেখের ছেলে। শিশুটি স্থানীয় বাজারের একটি ফার্নিচারের দোকানের কর্মচারী।
আহত শিশুর স্বজনদের অভিযোগ, ওই মিলের মালিক ইশারত মোল্লা (৫৫) এবং তার ছেলে মুন্না মোল্লা (২২) শিশু তাওহিদকে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন করে ফেলে রাখেন। পরে পরিবারের লোকজন আহত অবস্থায় শিশুটিকে খুঁজে পেয়ে ঘটনার পরদিন সকালে অসুস্থ অবস্থায় ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে।
শিশুটি বর্তমানে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি ও নিউরোসার্জারি বিভাগে চিকিৎসাধীন। তার পাশে বসে কাঁদতে দেখা যায় দাদি রহিমা বেগম, বাবা রুবেল শেখ ও মা শম্পা বেগমকে। এ সময় শিশুটির পরনের লুঙ্গি সরিয়ে নির্যাতনের চিহ্ন দেখান তারা।
এ সময় দেখা যায়, ভুক্তভোগী তাওহিদ শেখের পুরো নিতম্ব কালচে হয়ে আছে। যন্ত্রণায় হাসপাতালের বিছানায় বসতে না পারায় সারাক্ষণ কাত হয়ে থাকছে শিশুটি। তবে তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসকের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
নির্যাতনের শিকার তাওহিদ শেখের ভাষ্যমতে, মুড়ির মিল সংলগ্ন তাদের বাড়ি। ঘটনার দিন রাত ৯টার দিকে ফার্নিচারের দোকানের কাজ শেষ করে ওই মিলের সামনে দিয়ে বাড়িতে ফিরছিল সে। এ সময় মুন্না মোল্লা তাকে ডেকে দ্বিতীয়তলার ছাদে নিয়ে যায়। সেখানে ইশারত মোল্লাও আসেন। একপর্যায়ে রশি দিয়ে হাত-পা বেঁধে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এ সময় রড চুরির কথা অস্বীকার করলে তাওহিদকে বেধড়ক পেটানো হয়। চিৎকার করতে গেলে কাপড় দিয়ে মুখও বেঁধে ফেলা হয়। এভাবে প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে তাকে পেটানো হয়।
তাওহিদ শেখের দাদি রহিমা বেগম বলেন, ওইদিন অনেক রাত হলেও সে (তাওহিদ) বাড়িতে না আসায় আমরা তাকে খুঁজতে বের হই। রাত সাড়ে ১২টার দিকে ওই মিলের ভবনের নিচে গোঙানির শব্দ পেয়ে আমরা সেখানে যাই। প্রথমে আমরা মনে করেছিলাম, ছাদ থেকে নিচে পড়ে সে আহত হয়েছে। কিন্তু পরে চেতনা ফিরলে সে পরিবারের কাছে ঘটনা খুলে বলে।
শিশুটির বাবা রুবেল শেখ অভিযোগ করে বলেন, ঘটনার পর ছেলেকে নির্যাতনের বিষয়ে জানতে গেলে উল্টো আমাদের হুমকি দিয়ে ইশারত মোল্লা বলেছেন, ‘ওরেতো মারছি, তোরেও মেরে ফেলবো, আমার কিছুই করতে পারবি না।’
রুবেল বলেন, গ্রামের কেউ ওদের (নির্যাতনকারী) ভয়ে কথা বলে না, ওদের অনেক টাকা আছে। এতটুকু বাচ্চা মানুষকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে এমনভাবে কী কেউ মারে? আমি সবার কাছে এর সুষ্ঠু বিচার চাই।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ইশারত মোল্লা বলেন, ওই ছেলেটি (তাওহিদ) এলাকায় বিভিন্ন মালামাল চুরি করে থাকে। আমার ঘরের কাজের রড চুরি করেছে কিন্তু ধরতে পারি না। ওইদিন ছাদে গিয়ে হাতে-নাতে ধরেছি। তখন আমার ছেলে ও দুই ভাতিজা চড়থাপ্পড় দিয়েছে। মানবতা দেখিয়ে পুলিশে দিইনি, এখন দেখতেছি পুলিশে দেওয়াই ভালো ছিল।
এ বিষয়ে কথা হলে মধুখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুকদেব রায় বলেন, এ ঘটনায় থানায় কোনো অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ দিলে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এনকেবিএন/এমএমকে
