রাজবাড়ি নাকি প্রাচীন জনপদ—সেই রহস্যে ঘেরা শেরপুরের ‘জামুর ঢিবি’
সবুজ ফসলের মাঠে জেগে আছে বিশাল এক ঢিবি। সেখানে খেজুর, বরই, পিতরাজসহ নানা গাছ। কোথাও ফুটে আছে লজ্জাবতী ফুল। চারপাশে নিরিবিলি গ্রামীণ পরিবেশ। কিন্তু এই শান্ত ঢিবি ঘিরেই স্থানীয় মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই।
বগুড়ার শেরপুর উপজেলার কুসুম্বি ইউনিয়নের আদম জামুর গ্রামের ‘জামুর ঢিবি’ স্থানীয়ভাবে ‘ধনপোতা ঢিবি’ নামেও পরিচিত। স্থানীয় লোকজনের ধারণা, ঢিবির নিচে চাপা পড়ে আছে রাজবাড়ি। কেউ বলেন, এখানে ছিল কোনো প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপনা। আবার কারও মতে, মাটির নিচে লুকিয়ে থাকতে পারে প্রাচীন কোনো জনপদের চিহ্ন। তবে এসব প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে।
জামুর ঢিবিতে এক দিন
শেরপুর উপজেলা শহর থেকে জামুর ঢিবির দূরত্ব প্রায় ৯ কিলোমিটার। শেরপুর-নন্দীগ্রাম আঞ্চলিক সড়কের শেরপুর পৌরসভার নন্দীগ্রাম সড়ক মোড় অথবা কলেজ রোড থেকে কুসুম্বি ইউনিয়নের বেলঘড়িয়া বাজারে যাওয়া যায়। বাজার থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে আদম জামুর গ্রামের পাশে এই ঢিবি। গ্রামের পাকা সড়ক থেকেই ঢিবিটি দেখা যায়।
গত ৩১ আগস্ট সেখানে গিয়ে দেখা যায়, সমতল জমির তুলনায় ঢিবিটি বেশ উঁচু। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ঢিবিটি আগে অনেক উঁচু ছিল। ধীরে ধীরে মাটিতে দেবে গেছে। তাঁদের হিসাবে, বর্তমানে এটির উচ্চতা প্রায় ৩০ থেকে ৪০ ফুট। আয়তন প্রায় দুই থেকে আড়াই একর। ঢিবির ওপর ও চারপাশে নানা ধরনের গাছপালা। দূর থেকেই সবুজে ঘেরা ঢিবিটি আলাদা করে চোখে পড়ে। তবে এই সবুজের আড়ালেই আছে ক্ষয়ের চিহ্ন। ঢিবির নিচের অংশের মাটি কেটে আশপাশের জমি চাষাবাদের উপযোগী করা হয়েছে। ওপরের অংশেও মাটি কাটার দাগ রয়েছে। কাটা মাটিতে পুরোনো ইট ও মাটির তৈজসপত্রের টুকরাও দেখা যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা মমতাজ আলী প্রামাণিকের বয়স ৭৫ বছর। ছোটবেলায় তিনি ঢিবিটিকে এখনকার তুলনায় অনেক উঁচু দেখেছেন। তাঁর বাবা-দাদারাও এই ঢিবির কথা জানতেন। মমতাজ আলী বলেন, সময়ের সঙ্গে ঢিবিটি ধীরে ধীরে নিচু হয়ে যাচ্ছে। একসময় আশপাশের গ্রামের মানুষ ঢিবির মাটি কেটে পুরোনো ইটের টুকরা সংগ্রহ করতেন। বাড়িঘরের বিভিন্ন কাজে সেসব ইট ব্যবহার করা হতো।
ইতিহাসের সঙ্গে মেলে কিছু সূত্র
স্থানীয়ভাবে প্রচলিত এসব গল্পের সঙ্গে ইতিহাসের কিছু সূত্রও মেলে বলে মনে করেন জামুর ইসলামিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, বগুড়া অঞ্চল প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন জনপদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ অঞ্চলে প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন জনপদ ও স্থাপনার বিকাশ ঘটেছে। এতে জামুর ঢিবিকে ঘিরে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের আগ্রহ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
কুসুম্বি ইউনিয়নের জামুর ইসলামিয়া কলেজের ইসলামের ইতিহাসের সহকারী অধ্যাপক মো. সুজাউদ্দৌলা মনে করেন, ঢিবিটি নিয়ে প্রচলিত ধারণাগুলো যাচাই করা দরকার। প্রত্নতাত্ত্বিক খনন শুরু হলে ঢিবিটির ইতিহাস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
কুসুম্বি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহ আলম ঢিবিটি খনন ও সংরক্ষণের দাবি জানান।
সংরক্ষিত, খননের পরিকল্পনাও আছে
শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইদুজ্জামান জামুর ঢিবি পরিদর্শন করে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে লিখিতভাবে জানানোর উদ্যোগ নেবেন বলে জানান।
রাজশাহী বিভাগীয় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বগুড়ার আঞ্চলিক পরিচালক এ কে এম সাইফুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এত বড় ঢিবি সাধারণত দেখা যায় না। উত্তরবঙ্গে ১৬১টি ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষিত আছে। এর মধ্যে জামুর ঢিবিও রয়েছে। ঢিবিটি ২০১৫-১৬ সালের দিকে সরকারিভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট সময় বলতে পারব না, তবে এটি খননের বিষয়টি আমাদের অগ্রাধিকারের মধ্যে আছে।’
জামুর ঢিবিতে নিয়মিত দর্শনার্থীর আনাগোনা নেই। দিনের বেশির ভাগ সময় শান্ত পড়ে থাকে ঢিবিটি। অথচ মাটির স্তর সরালে এই ঢিবিই হয়তো সামনে আনতে পারে অজানা কোনো ইতিহাস, যা হয়ে উঠতে পারে শেরপুরের ঐতিহাসিক নিদর্শন।
