রোহিঙ্গা সংকট বিশ বছর যেতে দেওয়া উচিত হবে না: শামা ওবায়েদ


কেবল মানবিক সহায়তার দায়িত্ব না সেরে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের তাদের নিজভূম মিয়ানমারে ফেরাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দায়িত্ব নিতে বলেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।

এই সংকট যেন আরও এক দশক দীর্ঘ না হয়, সে বিষয়েও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তাগিদ দিয়েছেন তিনি।

বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ‘ঢলের’ নয় বছর পূর্তির দুদিন আগে রোববার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “দশ বছর আগে মানবিক জরুরি পরিস্থিতিতে সাড়া দিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু এখন এসে বাংলাদেশ একটি দীর্ঘায়িত রাজনৈতিক সংকট মোকাবেলা করছে। একটি সাধারণ বার্তা আমি দিতে চাই। দশ বছরকে কোনোভাবে বিশ বছর হতে দেওয়া উচিত হবে না।”

ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিক্যাব) এবং অক্সফ্যাম আয়োজিত ‘১০ বছরে যাচ্ছে রোহিঙ্গা সংকট: মানবিক সাড়াদান থেকে টেকসই সমাধান’ শীর্ষক দিনব্যাপী সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের নামে মিয়ানমারের রাখাইনে দেশটির সেনাবাহিনীর হত্যা, নির্যাতনের শিকার হয়ে ২০১৭ সালের ২৫ অগাস্টের পর থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। সে সময় মানবিক কারণে বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিলেও বর্তমানে কক্সবাজার ও উখিয়া-টেকনাফের ক্যাম্পগুলোতে প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে; যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ ও নিরাপত্তার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করেছে।

রোহিঙ্গাদের তাদের দেশে ফেরাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে শামা ওবায়েদ বলেন, “বেঁচে থাকার চেয়েও বেশি কিছু প্রাপ্য রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর। তাদের দরকার বাড়ি, তাদের দরকার নিরাপত্তা, তাদের দরকার মর্যাদা। এবং শান্তিতে নিজের মাতৃভূমিতে ফেরার অধিকার তাদের প্রাপ্য।

“বাংলাদেশ তাদের পাশে দাঁড়ানো অব্যাহত রাখবে। কিন্তু বাংলাদেশের কেবল একা দাঁড়ানো উচিত হবে না। আসুন রোহিঙ্গারা যাতে নিরাপদে, স্বেচ্ছায়, মর্যাদা ও ভরসা নিয়ে নিজভূমে ফিরতে পারে, সে জন্য একযোগে কাজ করি। কিন্তু এটা শুধু একটা মানবিক বাধ্যবাধকতা নয়; এটা রাজনৈতিক দায়িত্ব। এটা নৈতিক দায়িত্ব। এবং এটা এমন দায়িত্ব, যেটা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই কাঁধে তুলে নিতে হবে।”

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অনিশ্চিত জীবনের কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “দশ বছর অনেক লম্বা সময়। সরকারের জন্য এটা একটা নীতিগত চক্র। প্রতিষ্ঠানের জন্য এই পরিকল্পনার দিগন্তরেখা। কিন্তু ক্যাম্পে বেড়ে ওঠা শিশুর জন্য দশ বছর হচ্ছে তার শৈশব। একজন যুবকের জন্য এটা পড়াশোনাহীন থাকা। একটি পরিবারের জন্য এটা ঘরবাড়িহীন একটি দশক। আর একটি সম্প্রদায়ের জন্য এটি অনিশ্চয়তায় জন্ম নেওয়া প্রজন্ম। আমরা দশ বছরকে বিশ বছর হতে দিতে পারি না।”

বাংলাদেশ ২০১৭ সালে বড় রকমের রোহিঙ্গা ঢল শুরুর পর থেকে সীমান্ত ও হৃদয় খোলা রেখেছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “১২ লাখের বেশি বাস্তুচ্যত রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশে আশ্রিত। আমরা তাদেরকে খাদ্য, আশ্রয়, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সুরক্ষা দিয়েছি। আমাদের নিজস্ব উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ স্বত্বেও আমরা সেটা করেছি।”

রোহিঙ্গাদের অবস্থানের কারণে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উপর চাপ পড়ার কথা তুলে ধরে শামা ওবায়েদ বলেন, “তারা তাদের জমি, সম্পদ ও কমিউনিটি রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিয়েছে। তাদের জীবিকা ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের সরকারি সেবাও চাপের মুখে পড়েছে। তাদের হৃদ্যতা সবসময় এক থাকবে, এটা ভাবা ঠিক হবে না।”

এ কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করাও মানবিক সহযোগিতার অত্যাবশ্যকীয় দিক হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য, রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা প্রয়োজন কিন্তু এটা কোনো সমাধান নয়। রোহিঙ্গাদের সহায়তার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য সহযোগীদের সাধুবাদ জানায় সরকার। কিন্তু রোহিঙ্গা সমস্যার উদ্ভব মিয়ানমারে। এর সমাধানও মিয়ানমারে পেতে হবে।

“চূড়ান্ত লক্ষ্য হল, রোহিঙ্গাদের তাদের রাখাইনের মাতৃভূমিতে নিরাপদ, স্বেচ্ছা, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন। এটা কেবল একটা নীতিগত অগ্রাধিকার নয়, এটাই একমাত্র সমাধানের পথ। রোহিঙ্গারাও বারবার তাদের মাতৃভূমিতে ফেরার আকুতি জানিয়েছেন। আমাদের উচিত তাদের কথা শোনা, তাদের ইচ্ছার প্রতি সম্মান দেওয়া।”

শরণার্থী শিবির মাতৃভূমির স্থায়ী বিকল্প হওয়া উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, “তাদের পরিচয় যাচাই-বাছাইয়ের কাজ আমাদের এগিয়ে নিতে হবে। দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হবে। আর সেখানে ক্যাম্পে জন্ম নেওয়া শিশুদের বিষয়ও বিবেচনায় রাখতে হবে।”

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে আস্থার তৈরির বিষয়ে সরকারের কাজ করার কথা তুলে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা চান তিনি।

অনুষ্ঠানে থাকা ঢাকায় চীনের উপ-রাষ্ট্রদূত লিউ ইউয়িনের দিকে ইঙ্গিত করে শামা ওবায়েদ বলেন, তার বিশ্বাস প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে তাদের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সেটা তাদের কাজেও প্রতিফলিত হবে।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএম





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *