সন্তান হওয়ার পর যে মানসিক রোগ চিনতেই পারেন না অনেকে


সন্তান জন্মের পর মায়ের জীবনে আনন্দের পাশাপাশি আসে ঘুমহীনতা, ক্লান্তি, শারীরিক পরিবর্তন আর নতুন দায়িত্বের চাপ। কিন্তু, কখনো কখনো এসবের আড়ালে শুরু হতে পারে গুরুতর এক মানসিক অসুস্থতা—প্রসব-পরবর্তী সাইকোসিস, যা অনেক সময় আক্রান্ত মা নিজেও বুঝতে পারেন না।

সন্তান জন্মের পর মায়ের মন খারাপ, কান্না বা অস্থিরতাকে অনেকেই স্বাভাবিক পরিবর্তন হিসেবে দেখেন। পরিবারও ধরে নেয়, নতুন শিশুকে ঘিরে ব্যস্ততার কারণেই হয়তো এমনটা হচ্ছে। কিন্তু সব মানসিক পরিবর্তন এক নয়। কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতি দ্রুত গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।

প্রসব-পরবর্তী সাইকোসিস খুবই বিরল। তবে, এটি অত্যন্ত গুরুতর একটি মানসিক অসুস্থতা। সাধারণত সন্তান জন্মের পর প্রথম দুই সপ্তাহের মধ্যেই এর লক্ষণ দেখা দিতে পারে। কখনো কখনো কয়েক সপ্তাহ পরও লক্ষণ শুরু হতে পারে। এই অসুস্থতায় মায়ের আচরণ ও চিন্তায় দ্রুত পরিবর্তন আসতে পারে।

কেমন হতে পারে লক্ষণ?

এই অসুস্থতার ক্ষেত্রে মায়ের বাস্তবতা বোঝার ক্ষমতায় পরিবর্তন আসতে পারে। তিনি এমন কিছু দেখতে, শুনতে বা অনুভব করতে পারেন, যা আসলে ঘটছে না। বাস্তবে যার কোনো ভিত্তি নেই, এমন কোনো বিশ্বাস বা ধারণাও তার মনে দৃঢ়ভাবে তৈরি হতে পারে।

এর সঙ্গে দেখা দিতে পারে তীব্র বিভ্রান্তি, বিষণ্নতা, ঘুমের সমস্যা, অস্বাভাবিক চঞ্চলতা কিংবা অতিরিক্ত উত্তেজনা। কখনো মন খুব ভালো থাকা এবং পরক্ষণেই তীব্র বিষণ্নতায় ডুবে যাওয়ার মতো দ্রুত মেজাজ পরিবর্তনও হতে পারে। লক্ষণগুলো কখনো আসে, আবার কিছু সময়ের জন্য কমেও যেতে পারে। এ কারণেই বিষয়টি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনের মনোরোগ ও আচরণবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সুদাবেহ গিভরাডের মতে, শুরুতে ঘুমের ঘাটতি, বিরক্তি কিংবা মাথায় দ্রুতগতিতে নানা চিন্তা ঘুরতে থাকার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এরপর পরিস্থিতি দ্রুত এমন পর্যায়ে যেতে পারে, যখন ব্যক্তি বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিশ্বাসে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন বা এমন কিছু দেখতে-শুনতে পারেন, যার বাস্তবে অস্তিত্ব নেই।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই অসুস্থতা দ্রুত বাড়তে পারে এবং এটি একটি চিকিৎসাজনিত জরুরি অবস্থা। প্রতি এক হাজার প্রসবের মধ্যে আনুমানিক এক থেকে দুটির ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি দেখা যায়।

কেন হয়?

প্রসব-পরবর্তী সাইকোসিসের সঠিক কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করতে পারে। গর্ভাবস্থা ও সন্তান জন্মের সময় হরমোনে বড় ধরনের পরিবর্তন, ঘুমের ঘাটতি এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার পরিবর্তন—এসবের সঙ্গে আগে থেকে থাকা কিছু জৈবিক ঝুঁকি মিলেই পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

পরিবারে প্রসব-পরবর্তী সাইকোসিস বা দ্বিমেরু মানসিক রোগের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি বাড়তে পারে। যেসব নারীর দ্বিমেরু মানসিক রোগ রয়েছে, তাদেরও এ ধরনের অসুস্থতার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।

তবে, এখানেও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় আছে। চিকিৎসক ক্রিস্টাল শিলারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে কোনো চিহ্নিত ঝুঁকির কারণই পাওয়া যায় না। অর্থাৎ আগে থেকে কোনো মানসিক অসুস্থতার ইতিহাস না থাকলেও সন্তান জন্মের পর একজন নারীর এমন সমস্যা হতে পারে।

‘মা তো খুশি থাকার কথা’—এই ধারণাই বাধা

গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, সন্তান জন্মের পর মায়ের সবসময় আনন্দে থাকার কথা—সমাজে এমন একটি ধারণা প্রচলিত আছে। ফলে নতুন মায়ের আচরণে অস্বাভাবিক কিছু দেখা গেলেও পরিবার অনেক সময় সেটিকে গুরুত্ব দেয় না। কেউ ভাবেন, সন্তান জন্মের পর ক্লান্তি বা ঘুমের অভাব থেকেই এমন হচ্ছে। কেউ আবার সাহায্য চাইতেও সংকোচ বোধ করেন।

কিন্তু, প্রসব-পরবর্তী মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এই দেরিই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। কারণ সাইকোসিসের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেই অনেক সময় বুঝতে পারেন না যে তিনি অসুস্থ। ফলে, পরিবার বা কাছের মানুষকেই প্রথমে পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করতে হতে পারে।

চিকিৎসা কি সম্ভব?

দ্রুত সঠিক চিকিৎসা পেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা সম্ভব। প্রসব-পরবর্তী সাইকোসিসের চিকিৎসা সাধারণত হাসপাতালে করা হয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধ, বিষণ্নতার চিকিৎসার ওষুধ কিংবা মেজাজ নিয়ন্ত্রণের ওষুধ দেওয়া হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ-প্রয়োগে মস্তিষ্কে খিঁচুনি সৃষ্টি করে চিকিৎসা পদ্ধতি, অর্থাৎ ইলেকট্রোকনভালসিভ থেরাপিও ব্যবহার করা হয়। সুস্থ হওয়ার পথে প্রয়োজন হলে কথা-ভিত্তিক চিকিৎসা বা কগনিটিভ বিহেভিয়রাল থেরাপিও দেওয়া হতে পারে।

স্ট্যানফোর্ডের ড. গিভরাড বলেন, “অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি খুব ভালোভাবে চিকিৎসাযোগ্য। এমন অনেক নারী আছেন, যারা প্রসব-পরবর্তী সাইকোসিসে আক্রান্ত হওয়ার পরও পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করেছেন।”

তবে, সুস্থ হতে কত সময় লাগবে, তা সবার ক্ষেত্রে এক নয়। গুরুতর লক্ষণ কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা গেলে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি।

চিকিৎসার সময় মা ও শিশুকে আলাদা না রাখার গুরুত্ব

এই অসুস্থতার চিকিৎসায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন হলে মা ও শিশুকে আলাদা করে রাখা অনেক সময় মায়ের জন্য আরও একটি মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মায়েদের অনেককে শিশুর কাছ থেকে আলাদা রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যে কিছু বিশেষায়িত মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মা ও শিশুকে একসঙ্গে রেখে চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। এসব কেন্দ্র মা ও শিশুর বন্ধন অটুট রাখতে সাহায্য করে এবং আলাদা হয়ে থাকার মানসিক আঘাতও কমায়।

আগেই বোঝার উপায় কি নেই?

ঝুঁকিতে থাকা নারীদের ক্ষেত্রে সন্তান নেওয়ার আগে, গর্ভাবস্থায় এবং সন্তান জন্মের পর চিকিৎসকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা গুরুত্বপূর্ণ। আগে প্রসব-পরবর্তী সাইকোসিস বা দ্বিমেরু মানসিক রোগের ইতিহাস থাকলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শে আগেই একটি চিকিৎসা পরিকল্পনা করা যেতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে সন্তান জন্মের আগে বা জন্মের সময় থেকে নির্দিষ্ট ওষুধ শুরু করার বিষয়টিও চিকিৎসকেরা বিবেচনা করেন।

তবে সমস্যা হলো, এই অসুস্থতার জন্য বিষণ্নতার মতো সহজে ব্যবহারের উপযোগী কোনো নির্দিষ্ট পরীক্ষা বা নিয়মিত স্ক্রিনিং ব্যবস্থা এখনো নেই। ফলে চিকিৎসক কিংবা পরিবারের সদস্যদেরই মায়ের আচরণ ও মানসিক অবস্থার পরিবর্তন খেয়াল করতে হয়।

চিকিৎসক ক্রিস্টাল শিলার বলেন, “অনেক নারী ভয় পান—নিজের সমস্যার কথা বললে হয়তো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে পাঠানো হবে কিংবা তাদের সন্তানকে তাদের কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে। এই ভয় ও সামাজিক লজ্জা অনেক সময় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।”

সন্তান জন্মের পর শুধু শিশুর যত্ন নয়, মায়েরও খোঁজ নিন

সন্তান জন্মের পর মায়ের শারীরিক সুস্থতার দিকে যেমন নজর দেওয়া হয়, তেমনি তার মানসিক অবস্থার দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। বিশেষ করে সন্তান জন্মের পর প্রথম কয়েক সপ্তাহ খুব গুরুত্বপূর্ণ। অথচ প্রচলিত ব্যবস্থায় অনেক মায়ের প্রসব-পরবর্তী নিয়মিত পরীক্ষা হয় প্রায় ছয় সপ্তাহ পর। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথম ছয় সপ্তাহই আবার প্রসব-পরবর্তী সাইকোসিসের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকার সময়।

তাই নতুন মায়ের ঘুম কেমন হচ্ছে, আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন এসেছে কি না, তিনি অস্বাভাবিক কিছু দেখছেন বা শুনছেন কি না, হঠাৎ খুব উত্তেজিত বা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছেন কি না—এসব বিষয় পরিবারের সদস্যদের খেয়াল করা দরকার।

সবচেয়ে বড় কথা, এমন কোনো লক্ষণ দেখা দিলে ‘সন্তান হওয়ার পর এমন হয়’ বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। দ্রুত চিকিৎসকের সাহায্য নেওয়া জরুরি। কারণ প্রসব-পরবর্তী সাইকোসিস ভয়ংকর হতে পারে, কিন্তু দ্রুত চিকিৎসা পেলে সুস্থ হয়ে ওঠাও সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন মায়ের সঙ্গে এমন একটি বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করা জরুরি, যেখানে তিনি ভয় বা লজ্জা ছাড়াই নিজের মনের অস্বাভাবিক অনুভূতিগুলোর কথা বলতে পারেন। কারণ বিশ্বাসের জায়গা তৈরি হলেই অনেক মা তাদের সবচেয়ে কষ্টের কথাগুলো মুখে আনতে সাহস পান।

*দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *