নকলের অভিযোগে আটকে গেল ছয় সিনেমা, প্রযোজকের দাবি ‘প্রতিহিংসার শিকার’
এক প্রযোজকের ছয়টি সিনেমা নিয়ে আপত্তি তুলেছে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ড। মনজুরুল ইসলাম মেঘ প্রযোজিত সিনেমাগুলোর সার্টিফিকেশনের আবেদন বাতিল করেছে সংস্থাটি।
একই সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগে প্রযোজকের বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, সে বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
বোর্ডের আপত্তির তালিকায় রয়েছে ‘পরিণাম’, ‘রঙ্গশালা’, ‘রক্ত পিপাসা’, ‘রসু খাঁ’, ‘পাহাড়ের আর্তনাদ’ ও ‘বনদস্যু’। সিনেমাগুলোর পরিচালক যথাক্রমে মঈনউদ্দিন খান, পীযূষ কান্তি সেন, সজিব হোসেন ও মিজানুর রহমান লাবু।
জানা গেছে, গত ৩০ জুলাই ছয়টি সিনেমার সার্টিফিকেশনের জন্য আবেদন করেন প্রযোজক মনজুরুল ইসলাম মেঘ। এরপর আগস্টে বিভিন্ন দিনে সিনেমাগুলো পর্যবেক্ষণ করে বোর্ড। পর্যালোচনার পর দুটি সিনেমার ক্ষেত্রে পুরোনো চলচ্চিত্রের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য মিলের বিষয়টি সামনে আসে।
বোর্ডের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ‘পাহাড়ের আর্তনাদ’ সিনেমার সঙ্গে ২০২২ সালে সার্টিফিকেট পাওয়া ‘যমজ ভূতের গল্প’-এর হুবহু মিল রয়েছে। অভিযোগ হলো, আগের সিনেমাটির প্রযোজক, প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের নাম ও শিরোনাম বদলে নতুন নামে সেটি বোর্ডে জমা দেওয়া হয়েছে।
একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে ‘বনদস্যু’ নিয়েও। বোর্ড জানিয়েছে, ২০২৩ সালে সার্টিফিকেট পাওয়া ‘আমার অরণ্য’ সিনেমার কাহিনি, সংলাপ ও দৃশ্যের সঙ্গে নতুন সিনেমাটির হুবহু মিল পাওয়া গেছে।
এই ঘটনাকে প্রতারণা হিসেবে দেখছে সার্টিফিকেশন বোর্ড। তাই প্রযোজক মনজুরুল ইসলাম মেঘের বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান বরাবর সাত কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে তাকে।
অন্য চার সিনেমা নিয়েও সন্তুষ্ট নয় বোর্ড। ‘পরিণাম’, ‘রঙ্গশালা’, ‘রক্ত পিপাসা’ ও ‘রসু খাঁ’-এর গল্প, চিত্রনাট্য, সংলাপ, দৃশ্যায়ন ও কাহিনি বিন্যাসসহ বিভিন্ন দিককে মানহীন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বোর্ডের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়েছে, এসব সিনেমায় অপ্রাসঙ্গিক ও অশ্লীল সংলাপের পাশাপাশি অতিরিক্ত মদ্যপান ও ধূমপানের দৃশ্য রয়েছে। নির্মাণের সামগ্রিক মান নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে তারা। এসব কারণে সিনেমাগুলো দর্শকদের জন্য ইতিবাচক বার্তা দেওয়ার পরিবর্তে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেছে বোর্ড।
সার্টিফিকেশন অ্যাক্ট, ২০২৩-এর ৫(১২) ধারার কথা উল্লেখ করে ছয়টি সিনেমাকেই প্রদর্শনের জন্য অনুপযুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে।
তবে বোর্ডের সিদ্ধান্ত মেনে নিচ্ছেন না প্রযোজক মনজুরুল ইসলাম মেঘ। তার দাবি, ব্যক্তিগত বিরোধ ও প্রতিহিংসার কারণেই তার সিনেমাগুলো আটকে দেওয়া হয়েছে।
মনজুরুল ইসলাম মেঘ বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে চলচ্চিত্র নিয়ে কাজ করছি। আমার ছয়টি সিনেমা একসঙ্গে আটকে দেওয়ার বিষয়টি আমার কাছে স্বাভাবিক মনে হয়নি। কিছু অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আমি ও আরও অনেকে প্রতিবাদ করে আসছি। সেই কারণে প্রতিহিংসার শিকার হয়েছি বলে মনে করছি।’
নকলের অভিযোগের বিষয়ে তার ব্যাখ্যা, আগে সার্টিফিকেট পাওয়া দুটি সিনেমা তিনি কিনে নিয়েছেন। এরপর নাম পরিবর্তন করে নিজের সিনেমা হিসেবে বোর্ডে জমা দিয়েছেন।
তার ভাষ্য, আবেদনপত্রে আগের সিনেমা কেনার বিষয়টি জানানোর কোনো সুযোগ ছিল না। বোর্ড এ বিষয়ে জানতে চাওয়ায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করবেন তিনি।
চিঠি পাওয়ার আগেই বিষয়টি বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগও করেছেন এই প্রযোজক। তার দাবি, ২৭ আগস্ট তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পেলেও তার আগেই বিভিন্ন সংগঠনের লোকজনের কাছে এ বিষয়ে তথ্য চলে যায়। এমনকি সংশ্লিষ্ট পরিচালকদেরও হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এদিকে বোর্ডের দেওয়া সময়ের মধ্যেই জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন মনজুরুল ইসলাম। পাশাপাশি সিনেমাগুলো আটকে দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
তার ভাষায়, ‘আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই লিখিত ব্যাখ্যা দেব। পাশাপাশি আপিলের সুযোগ রয়েছে। সেই প্রক্রিয়াতেও যাব। প্রয়োজন হলে আইনানুগভাবেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
এখন প্রযোজকের লিখিত ব্যাখ্যার পর সার্টিফিকেশন বোর্ড কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই দেখার বিষয়।
এমআই/এলআইএ
