চিঠির সেই আবেগ এখন শুধুই অতীত


একটি হলুদ খাম। তার ওপর কাঁপা কাঁপা হাতে লেখা প্রিয়জনের নাম। ভেতরে কয়েক পাতার ভালোবাসার আকুতি আর খবরের সমাহার। ডাকপিয়নের সাইকেলের পরিচিত ঘণ্টার শব্দ শুনে বাড়ির উঠানে ছুটে আসার সেই দিনগুলো এখন শুধুই অতীত। ডিজিটাল যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুততায় বিলুপ্তির পথে হাতে লেখা চিঠি। 

আজ ১ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব চিঠি লেখার দিবসে নাটোরের প্রবীণদের কণ্ঠে ফুটে উঠেছে হারিয়ে যাওয়া সেই অপেক্ষার দিনগুলোর স্মৃতিকাতরতা।

একসময় স্বজন বা প্রিয়জনের সংবাদের জন্য কাগজ-কলমই ছিল ভরসা। চিঠির উত্তর পেতে কখনো সপ্তাহ, কখনো মাস কেটে যেত। নাটোর শহরের আলাইপুর এলাকার মাজেদুল ইসলাম বাবু বলেন, ‘‘যোগাযোগ এখন অনেক সহজ ও দ্রুত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু চিঠির মতো সেই নিবিড় অনুভূতি আর তৈরি হয় না। হাতে লেখা অক্ষরের মধ্যে লেখকের ব্যক্তিত্ব ও আবেগ লেগে থাকত।’’ 

কানাইখালীর ৬৫ বছর বয়সী এ বি এম গোলাম মোস্তফা খোকন স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘‘আমাদের সময়ে একটি চিঠির জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষার যে এক ধরনের মধুর কষ্ট আর আনন্দ ছিল, তা এখনকার প্রজন্মকে বোঝানো কঠিন।’’  

অন্যদিকে নলডাঙ্গার জমেলা বেওয়া জানান, চিঠি ছিল মনের কথা বলার সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা ও স্মৃতি ধরে রাখার পাত্র।

বর্তমানে মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইমোজির ভিড়ে চিঠি যেন নতুন প্রজন্মের কাছে এক বিস্মৃত অধ্যায়। নাটোর দিঘাপতিয়া এম কে কলেজের শিক্ষার্থী নাফিস ও ইভা নূর জানান, দ্রুত বার্তার যুগে ডিজিটাল নির্ভরতা স্বাভাবিক হলেও হাতে লেখা চিঠির ব্যক্তিগত স্পর্শ অন্য কিছুতে পাওয়া সম্ভব নয়। 

নাটোর প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি প্রভাষক ফরাজী আহমেদ রফিক বাবন মনে করেন, ‘‘চিঠি শুধু ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিল না, এটি ছিল সমাজ ও সময়ের জীবন্ত দলিল।’’ 

প্রযুক্তির দাপটে ব্যক্তিগত চিঠি আদান-প্রদান কমলেও নাটোর ডাকঘরের কার্যক্রম থেমে নেই বলে জানান পোস্ট মাস্টার শরিফুল ইসলাম। বর্তমানে প্রাতিষ্ঠানিক ডাক, পার্সেল এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি সেবা চালু রয়েছে।

বিশ্বজুড়ে ১ সেপ্টেম্বরকে ‘বিশ্ব চিঠি লেখার দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়, যার মূল উদ্দেশ্য ডিজিটাল ব্যস্ততার বাইরে গিয়ে মানুষকে আবার কাগজ-কলমে অনুভূতি প্রকাশের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা। 

নাটোরের সুশীল সমাজের মতে, প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার পাশাপাশি বিদ্যালয়গুলোতে চিঠি লেখার প্রতিযোগিতা বা পুরনো চিঠি সংরক্ষণের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে এই আবহমান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব।





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *