ইমদাদুল হক মিলনের উপন্যাসের বিষয়-আশয়
আহমেদ মাওলা
আশি-নব্বই দশকের তুমুল জনপ্রিয়, তারুণ্যের জীবন-ভাষ্যকার, লাইন ধরে অটোগ্রাফ নেওয়ার প্রচণ্ড ভিড়ে মুখরিত বইমেলার দিনগুলোর কথাই আমার মনে পড়ে। ইমদাদুল হক মিলন মানে ব্যাপক সাড়া, পোশাক-পরিচ্ছদে, শোভন ব্যক্তিত্বে, দারুণ স্মার্ট, পাঠকনন্দিত কথাশিল্পী মিলন ভাইকে এক নজর দেখার জন্য তখন তন্বী-তরুণীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ার অবস্থা। জেলায় জেলায় ইমদাদুল হক মিলনের একক বইমেলার আয়োজন, মৌমাছির মতো ঘিরে ধরা একক স্টলে সদ্য প্রকাশিত মনোরম প্রচ্ছদের উপন্যাস, চিবুক বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে, তিনি ব্যস্ত হাতে মাথা ঝুঁকে স্বাক্ষর করছেন—মিলন ভাইয়ের কথা ভাবলেই এরকম দৃশ্যই আমার চোখে ভাসে।
বইমেলায় হুমায়ূন আহমেদ এবং ইমদাদুল হক মিলন—এই দুজনের নামই বেশি উচ্চারিত হতো, তাঁদের প্রকাশনা স্টল ঘিরে ভিড় লেগেই থাকত। ভিড়ের চাপ সামলাতে না পেরে একবার তো বইমেলার কর্তৃপক্ষ হুমায়ূন আহমেদকে সবিনয়ে মেলা থেকে চলে যেতে অনুরোধ করতে বাধ্য হন। তখন বাংলা একাডেমির ভেতরেই সীমাবদ্ধ জায়গার মধ্যে বইমেলার আয়োজন হতো। আহা, আমাদের সেই পাঠক গেল কই? নানা কারণে বইমেলা সেই আবেগের জায়গায় নেই। নতুন প্রজন্ম ডিজিটাল ডিভাইসের প্রবল প্রলোভনে, কাগজের বুক থেকে ‘ফেসবুক’ রাতে জাগিয়ে রাখে, দিনে চোখ জুড়ে থাকে, বদলে গেছে প্রজন্মের মনোজগতের মানচিত্র। কিন্তু একটা প্রশ্ন আমার মাথায় ঘুরপাক খায়—সাম্প্রতিক আড্ডায়-আলোচনায়-লেখালেখিতে ইমদাদুল হক মিলনের নাম উচ্চারিত হতে দেখা যায় না কেন? অথচ এ কথা তো ঠিক যে, প্রেমবিষয়ক লেখা দিয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও পরবর্তী সময়ে ইমদাদুল হক মিলন তাঁর লেখার বিষয় ও ভাষা বদল করেছেন। তাঁর দৃষ্টি ক্রমেই জীবনের গভীরে প্রবেশ করেছে, ব্যক্তিমানুষের ক্ষত-বিক্ষত, রক্তাক্ত অন্তঃপৃথিবী ও বহিঃপৃথিবীর অনেক অনিবার্য অনুষঙ্গ যুক্ত হয়েছে তাঁর লেখায়। ক্রমেই ইমদাদুল হক মিলন সমাজমনস্ক হয়ে উঠেছেন, মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সংকট, সামাজিক বৈষম্য, দেশ-কালচেতনা ইত্যাদি জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর আলো ফেলেছেন তিনি। প্রথম থেকেই সহজ, নিরাভরণ, স্বচ্ছন্দ গতির এক নিজস্ব ভাষাভঙ্গি রয়েছে তাঁর। বিষয়ের উপস্থাপনা ও বিশ্লেষণের শ্রমের ছাপ লক্ষণীয় তাঁর লেখায়। ১৯৭৬ সালে তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘যাবজ্জীবন’ বাংলা একাডেমীর ‘উত্তরাধিকার’ পত্রিকায় ধারাবাহিক ছাপার মধ্য দিয়ে তিনি ঔপন্যাসিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন এবং পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। অর্থাৎ প্রথম উপন্যাসেই তিনি জীবনকে স্পর্শ করার চেষ্টা করেছেন। এর পর তিনি হেঁটে এসেছেন অনেকটা পথ—শতাধিক গ্রন্থ অবধি। ৭০তম (৮ সেপ্টেম্বর ১৯৫৫) জন্মদিন উপলক্ষ্যে ‘যাবজ্জীবন’, ‘কালাকাল’, ‘পরাধীনতা’, ‘সাড়ে তিন হাত ভূমি’, ‘নূরজাহান’-এর মতো অমর উপন্যাসের স্রষ্টার প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।
ইমদাদুল হক মিলন গ্রামীণ এবং উপকূলবর্তী জীবনকে ধারণ করতে অধিক আগ্রহী। তাঁর শ্রেষ্ঠ লেখাগুলো মূলত গ্রামকেন্দ্রিক জীবনকেই ধারণ করেছে। এখানে তাঁর সাফল্যও প্রশ্নাতীত। কেননা তাঁর দেখার চোখ অভিজ্ঞ, দৃষ্টি বস্তুগ্রাহী। আমাদের বর্তমান ঔপন্যাসিকরা যেখানে শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণির ড্রয়িংরুম-নির্ভর জীবনকে উপস্থিত করতে অধিক আগ্রহী, সেখানে মিলনের এই গ্রামীণ জীবননির্ভর উপন্যাস একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে পরিগণিত।
পেছনে ফেলে আসা পথের দিকে তাকালে দেখা যায়, ইমদাদুল হক মিলন উপন্যাসের যাত্রায় এক জায়গায় খুব বেশি দিন অবস্থান করেননি। ক্রমাগত তিনি স্থান বদল করেছেন। প্রেম-প্রণয়, বিরহ ও বেদনা, মানবিক সংঘাত ইত্যাদি অভ্যস্ত বসতি ছেড়ে চলে এসেছেন অন্য এক দিগন্তে। সৃষ্টিশীল এক উৎসবমুখর এলাকায়। প্রবহমান কথাসাহিত্যে সঞ্চার করেছেন নতুন রক্ত ও আয়তন। গ্রাম ও শহর—উভয় পটভূমিতে তিনি বিহার করেছেন বেশ স্বচ্ছন্দভাবে। এই স্থানান্তরে যাত্রা তাঁর প্রচণ্ড লেখনীশক্তিরই পরিচায়ক। সমাজের নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে উপরতলার মানুষও তাঁর উপন্যাসে জায়গা করে নিয়েছে, ভিড় জমিয়েছে বিভিন্ন পেশা এবং বৃত্তির মানুষ। অবলোকনের প্রখরতায় সেই মানুষগুলো হয়ে উঠেছে জীবন্ত, সজীব। আমার বিশ্বাস, ইমদাদুল হক মিলনের প্রেম-প্রণয়ের লেখাগুলোই অধিক পঠিত, কাঁচা আবেগের লেখাগুলো দিয়েই তাঁকে বিচার করা হয়—তাঁর সিরিয়াসধর্মী, জীবনের শৈল্পিক উন্মোচনমূলক লেখাগুলো পাঠকের দৃষ্টির আড়ালেই রয়ে গেছে। আমাদের এখানে তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের উন্নাসিক মানসিকতা হচ্ছে, জনপ্রিয় লেখক মানে ‘সস্তা’, ‘বাজারি’ লেখক। জনপ্রিয় হওয়াটাই যেন দোষের, তাঁদের লেখা গুরুত্বহীন, পানসে, চটুল—এই ভুল রিডিং সাহিত্য-বিবেচনায় আত্মঘাতী নেতিবাচক ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করেছে। ‘জনপ্রিয়’ মানে ‘লোকপ্রিয়’। এই লোকপ্রিয়তার সংস্কৃতিগত যৌক্তিকতা আছে। ‘জনপ্রিয়তার’ অর্থ ‘মনোরঞ্জন’ নয়, ‘লোকনন্দন’—এই নন্দনতাত্ত্বিক দৃষ্টিকে প্রথাগত ধারণা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সমালোচনা সাহিত্যের একাডেমিক আঙ্গিনাকে কলুষিত, দূষিত করেছে। ঢাকার সাহিত্য-পাঠের সঙ্গে পার্টি রাজনীতি ঢুকে পড়েছে, ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পুরস্কার ও সাহিত্যের মূল্যমান বিবেচনা করার এক ধরনের দুষ্টচক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। ফলে আমাদের সাহিত্যের উৎকর্ষের মানদণ্ড বিচার ভেঙে পড়েছে। প্রমাণ কী? এই যে, কেউ কেউ ওভাররেটেড হয়েছেন, অনেক গুরুত্বপূর্ণ লেখক উপেক্ষিত, অবহেলার শিকার হয়েছেন—এটা আমাদের টোটাল সাহিত্যের ধারাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, দায় ও দরদের সাহিত্যের অবনমন ঘটিয়েছে। হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন, মঈনুল আহসান সাবের, মঞ্জু সরকার, বুলবুল চৌধুরী—এরকম অনেকেই সাহিত্য-বিবেচনার ক্ষেত্রে অবহেলিত। আমার ধারণা, ইমদাদুল হক মিলনের সাহিত্য সেই এলিট, এলিট রুচির কারণে উপেক্ষিত। তাঁর উপন্যাস-যাত্রা কিংবা বলা যায় স্থান বদল করার মধ্যে দেখা যায়, তাঁর মানস-মণ্ডলে ভিড় করেছে অসংখ্য পেশার ও জাতের মানুষ, বিচিত্র চরিত্রের মানুষ। যারা জীবন-সত্য, সমাজ-সত্য হয়ে আমাদের সামনে কিলবিল করছে। তাঁকে কখনো লিখতে হয়েছে গ্রাম্য বাজারের মিষ্টি দোকানদারকে নিয়ে, লুপ্তপ্রায় হাজাম সম্প্রদায় কিংবা বেলদারদের নিয়ে, সেজাঁল খা জ্বীন নামাতে পারে, কোনো এক সেজাঁল খার পিছু ধাওয়া করতে হয়েছে তাঁকে। কালো ঘোড়ার পেছনে ‘স্বাধীনতা’ লিখে পিছু ধাওয়া করতে হয়েছে, কখনো সার্কাসের জোকার, গ্রাম্য পতিতা, গ্রাম্য ডাক্তার মনীন্দ্র ঠাকুর, দরগা তলার জোড়া সাপ, নিরন্নের কাল, কিংবা সেই মহিলা, বারবার বিয়ে করা যার অভ্যাস, তাকে নিয়ে।
যে কোনো শিল্পকর্ম বিচারে, বিশেষত উপন্যাস বিচারে আমাদের বিবেচ্য এবং আলোচ্য তিনটি বিষয়। প্রথমত: লেখক কী পদ্ধতিতে জীবনকে দেখেছেন, দ্বিতীয়ত: তিনি জীবন থেকে কী গ্রহণ করেছেন, কী বর্জন করেছেন, তৃতীয়ত: তাঁর সমস্ত বক্তব্য কোন নৈতিক বোধে বিশিষ্ট। যে কোনো লেখকের সাহিত্যকীর্তি আলোচনা করতে গেলে উক্ত সূত্র তিনটির আলোকেই হওয়া বাঞ্ছনীয়। ইমদাদুল হক মিলন মানুষের মনের বিচিত্র গহনতা উপন্যাসের বিষয় করে তুলেছেন। এক্ষেত্রে তাঁর মনোভঙ্গি বা অ্যাটিটিউড-এর কথা সর্বাগ্রে আলোচনা করা দরকার।
ইমদাদুল হক মিলনকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছে মানুষের বিচিত্র চরিত্র। মানবচরিত্রের সূক্ষ্ম রহস্যকে আবিষ্কার করার জন্যই যেন তিনি বিচিত্র পেশার, চরিত্রের মানুষকে উপস্থিত করেছেন তাঁর উপন্যাসে। মানবজীবনের সূক্ষ্ম রহস্যবোধ তাঁকে উদ্বেল করেছে সবচেয়ে বেশি। বিস্তৃত বহুভুজ মানবজীবনের অনেক এলাকাই থাকে আবৃত, অনাবিষ্কৃত, অন্ধকারে ঢাকা। কিন্তু একজন শিল্পীর প্রধান এবং প্রথম কাজ হচ্ছে জীবনের সেই অনালোকিত এলাকাকে আবিষ্কার করা, যদি তিনি সত্যিকারের শিল্পী হয়ে থাকেন। ইমদাদুল হক মিলনের মৌল প্রেরণা হচ্ছে সেই অনাবিষ্কৃত এলাকাকে উপস্থিত করা।
ইমদাদুল হক মিলনের শিল্প-অন্বেষার মূল সূত্রটি হচ্ছে মানবিকতা। এই মানবিক আত্ম-অন্বেষায় তিনি অগ্রসর হয়েছেন জীবনমুখিতার দিকে। তাই তো দেখা যায়, তাঁর উপন্যাসের কুশীলবরা প্রবাসী জীবনের আত্মগ্লানি নিয়ে বলতে থাকে—‘মুক্তি দাও, আমাকে মুক্তি দাও। আমার কোনো রাজনৈতিক বিশ্বাস নেই।’ (পরাধীনতা)। জীবনের জাগতিক বিশ্বাস হয়ে পড়ে শিথিল। তাঁর উপন্যাসের কুশীলবরা সংগ্রাম করে শুধু বেঁচে থাকার জন্য। জীবনের তাগিদে তাদের হতে হয় কখনো সার্কাসের জোকার কিংবা বেলদার, শেরু হাজাম হয়ে যায় ভিক্ষুক, তবু তাদের মানবিক আকুতির পাশে শুইয়ে থাকে বনেদী খৈয়াজাত সাপ। শুধু বেঁচে থাকার লড়াইয়ে হয়ে পড়ে তারা উন্মূল, ভূস্বামীর বল্লমবিদ্ধ হয়ে রক্তাক্ত হয় কেউ। ‘রূপনগরের’ ভাসমান চরিত্র ‘নেপাল’-এর কথা শোনার মতো লোক নেই। এক বেদনাময় আত্মাভিমান নিয়ে ভেসে যায় ‘নেপাল’। তাঁর উপন্যাসে মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীনতার পর গ্রামে ফিরে আসে, কিন্তু বাড়িতে থাকতে পারে না, ডাকাতির দায়ে অভিযুক্ত হয়ে যেতে হয় জেলে। কারণ তখনো সমাজ-সংগঠনের মধ্যে থেকে যায় ঘরের ইঁদুরের মতো কিছু রাজাকার। স্বাধীনতার মাত্র কিছুকাল পরেই তারা হয়ে ওঠে সমাজ-অধিপতি। রাতারাতি খোলস পাল্টিয়ে হয়ে যায় বড় কর্তা। সেই মুক্তিযোদ্ধাদের, সেই সূর্যসন্তানদের করার যেন কিছু নেই। স্বাধীনতা তাদের কাছে অর্থহীন হয়ে পড়ে। কালো ঘোড়ার পেছনে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি লিখে তার পিছু ধাওয়া করতে হয় তাদের। একসময়ে আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে জেল ফেরত ‘রতন’ তার সহযোদ্ধাদের খবর দেয় ‘দ্বিতীয় পর্বের শুরু’ করার জন্য। রতন বলে—‘আমি আরেকটি মুক্তিযুদ্ধ করব। আগের যুদ্ধটা হয়েছিল বাইরের শত্রুর সঙ্গে। এবারের যুদ্ধটা হবে ঘরের শত্রুর সঙ্গে’ (দ্বিতীয় পর্বের শুরু)। মনে হয়, ঘরের মানুষের সঙ্গে যুদ্ধ এতদিনে শুরু হয়ে গেছে। যে যুদ্ধ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের জন্য। উপন্যাসের বিষয়, ভাষা এবং বক্তব্যের উপস্থাপনায় ইমদাদুল হক মিলন সচেতন মনোভঙ্গির স্বাক্ষর রেখেছেন। প্রবাসী বাঙালি জীবনকে নিয়ে তাঁর দুটি উপন্যাস ‘পরাধীনতা’ এবং ‘পরবাস’ সুধীজন কর্তৃক উচ্চপ্রশংসিত। ‘পরাধীনতা’ উপন্যাসে তিনি প্রবাসী বাঙালি জীবনকে এমন বিশ্বস্ততার সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন যে এটিকে নিদারুণ বাস্তবতা থেকে কোনো ক্রমেই আলাদা করা যায় না। উপন্যাসের নায়ক ‘লালনের’ উক্তি ‘সেই কঠিন বাস্তবতার চিত্র ধরা পড়ে এভাবে—‘বন্ধু, তুমি জানো না। তুমি কিছু জানো না। প্রবাস জীবন কোনো মানুষের জীবন নয়। প্রবাস জীবন কুকুরের বেড়ালের জীবন।’ (পরাধীনতা) বাংলাদেশের যুবক পশ্চিম জার্মানি প্রবাসী লালনের এই সংলাপের মধ্যে আত্মগ্লানির পরিচয় ফুটে ওঠে। এই দরিদ্রতম দেশের হাজার হাজার যুবক বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। যেন জীবনের কাছে তারা বন্দি, পরাধীন—পরের অধীন। যেখানে বাঙালিদের কাছে বাড়িভাড়া দিতে পর্যন্ত চায় না। এই অমানবিক পরিবেশের মধ্যেও তাদের থাকতে হয়। এই মানবিক দিকটির ওপর তিনি আলো ফেলেছেন সচেতনভাবে—নিজের অর্জিত অভিজ্ঞতার আলোকে।
‘কালাকাল’ উপন্যাসটি বাংলাদেশের লুপ্তপ্রায় হাজাম সম্প্রদায় নিয়ে লেখা। হাজাম অর্থাৎ মুসলমান সমাজের ধর্মীয় কাজ ‘খৎনা’ করে যারা, এদের নিয়ে ইতিপূর্বে কেউ লিখেছেন কিনা আমার জানা নেই। তবে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ এই সম্প্রদায়ের জীবনবৃত্তান্ত অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন তিনি। হাজাম সম্প্রদায়কে বিষয় হিসেবে নির্বাচন করার মধ্যেও তাঁর স্বাতন্ত্র্যের সাক্ষাৎ মেলে। তাছাড়া ‘কালাকাল’ উপন্যাসটি আগাগোড়া বিক্রমপুরের আঞ্চলিক ভাষায় রচিত। বাংলা উপন্যাস সাহিত্যে ‘কালাকাল’ এক বিরল দৃষ্টান্ত।
বিষয় নির্বাচনে যেমন ইমদাদুল হক মিলনের বৈচিত্র্যের সন্ধান মেলে, তেমনি কাহিনী ও চরিত্র সৃজনেও তাঁর নান্দনিক অভিনিবেশ লক্ষ্য করা যায়। আমাদের চল্লিশ-পঞ্চাশের ঔপন্যাসিকরা প্রধানত গ্রাম এবং গ্রামীণ জীবনকে উপস্থিত করতে অধিক প্রয়াসী ছিলেন। তাঁদের এই গ্রামকেন্দ্রিক ঘটনাংশ নির্বাচনে উপন্যাসের প্রকরণ-পরিচর্যার পরিশ্রুত ছিল না, কিন্তু কবিতাস্পর্শী ভাষা তাঁদের সেই দুর্বলতাকে অতিক্রম করে গেছে। ইমদাদুল হক মিলন গ্রামীণ এবং উপকূলবর্তী জীবনকে ধারণ করতে অধিক আগ্রহী। তাঁর শ্রেষ্ঠ লেখাগুলো মূলত গ্রামকেন্দ্রিক জীবনকেই ধারণ করেছে। এখানে তাঁর সাফল্যও প্রশ্নাতীত। কেননা তাঁর দেখার চোখ অভিজ্ঞ, দৃষ্টি বস্তুগ্রাহী। আমাদের বর্তমান ঔপন্যাসিকরা যেখানে শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণির ড্রয়িংরুম-নির্ভর জীবনকে উপস্থিত করতে অধিক আগ্রহী, সেখানে মিলনের এই গ্রামীণ জীবননির্ভর উপন্যাস একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে পরিগণিত।
আমাদের উপন্যাসে নাগরিক চেতনার অনুপ্রবেশ ষাট দশক থেকেই। যদিও এখনো নগরজীবনের জটিলতা, মনস্তাত্ত্বিক সংকট এবং শ্রেণিবৈষম্যের মতো বিষয় আমাদের উপন্যাসে ধারণ করেনি। তবে সামাজিক ও রাজনৈতিক অভিঘাত আমাদের উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে চমৎকারভাবে। ইমদাদুল হক মিলনও এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর আলো ফেলেছেন। একজন কথাশিল্পীর সাফল্য মনে হয় বিষয় ও বক্তব্য উপযোগী ভাষা এবং বর্ণনাকৌশলে। মহৎ কথাশিল্পী নির্লিপ্ত দৃষ্টি দিয়ে বিষয়কে পর্যবেক্ষণ করেন এবং নিরাসক্ত মনোভঙ্গি দিয়ে বর্ণনা করেন।
আঞ্চলিক ভাষায় উপন্যাস রচনায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি। তাঁর আঞ্চলিক ভাষার উপন্যাসের সাফল্যও প্রশ্নাতীত। অনেকের আঞ্চলিক ভাষা আঞ্চলিকতাকে অতিক্রম করতে পারে না, কিন্তু তাঁর আঞ্চলিক ভাষা শুধু অতিক্রমী নয়, অনেকাংশে সংক্রামিতও করেছে। আঞ্চলিক ভাষা শুধু স্থানিক আবেদন পূর্ণ করে না, কখনো কখনো স্থানকেও বিশিষ্ট করে তোলে। ইমদাদুল হক মিলন তাঁর উপন্যাসে কিছু স্থানকে প্রায় উপন্যাসে ব্যবহার করেছেন। যেমন—কাজীর পাগলা, লৌহজং, পয়শা, দীঘলী, মাওয়া, মেদিনী মণ্ডল ইত্যাদি। যে কোনো লেখকের জন্মগ্রাম বা অঞ্চল তার স্মৃতিতে অটুট থাকে, সেই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাপন পদ্ধতি, পরিবেশ, ভাষা, লৌকিক আচার—এসব তার ওপর প্রভাব বিস্তার করবে, এ তো স্বাভাবিক। ইমদাদুল হক মিলনের বেলায়ও তা ঘটেছে। তাঁর শৈশব-কৈশোর কেটেছে গ্রামে, ঢাকার বিক্রমপুরে।
বিক্রমপুরের জীবন-প্রকৃতি এবং ভাষা তিনি অবলীলায় ব্যবহার করেছেন তাঁর উপন্যাসে। যেমন—‘কাইল রাইতে কলমা বাজারে হুইয়া রইছ। খিদায় দাদা নাতীন কেঐরঐ গুম আহেনা। দুইফরে এক গেরস্তে ইট্টুহানি ফেন দিছিলো। দুইজনে ভাগ কইরা হেই খাইছি হারাদিন। ফেন অইলো পানি। হেই জিনিশ পেডে থাকে কতোক্ষণ। খিদায় তো গুম আহেনা। পরী খালি আপুর ঝাপুর করে। কি করুম। পোলাপান মানুষ, ভুলানের লাইগা হারারাইত হুইয়া হুইয়া কিচ্ছা কইলাম। পরীরে ও পরী, মোনে আছেনি তর বেবাক কতা, আ? হ থাকবো না ক্যা! বেবাকঐ তো নেজেগ কিচ্ছা।’ (কালাকাল)
আঞ্চলিক ভাষার যে উদাহরণ উপস্থিত করা হয়েছে এখানে, তা একবার পাঠ করলেই বোঝা যায়, বাংলাভাষী যে কোনো অঞ্চলের মানুষের কাছে এটা দুর্বোধ্য বা অস্পষ্ট মনে হয় না। অর্থাৎ আঞ্চলিকতাকে অতিক্রম করে এই ভাষা সার্বজনীন হয়ে গেছে। আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে তাঁর এই নিরীক্ষা একদিন সাফল্যের মুদ্রায় চিহ্নিত হবে।
ইমদাদুল হক মিলনের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী, মহাকাব্যিক ‘নূরজাহান’ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র নূরজাহান। তাকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে অন্যান্য চরিত্রগুলো। মেদিনী মণ্ডল গ্রামের দবিরগাছি ও মা হামিদার একমাত্র দুরন্ত মেয়ে নূরজাহান। গ্রামের পাশ দিয়ে যাচ্ছে ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক, এ সড়কের কল্যাণে বদলে যাচ্ছে পুরো জনপদ, গ্রামের জীবনধারায় আসছে পরিবর্তন। বদলে যাওয়ার রূপটি ঔপন্যাসিক দেখিয়েছেন নূরজাহানের চোখ দিয়ে। নূরজাহান প্রতিদিন রাস্তা বাঁধানো কতটুকু এগুলো তো দেখে। রাস্তার মাটি কাটতে আসা হাজারও মানুষ, কন্ডাক্টর আলী আমজাদ, সাবকন্ডাক্টর হেকমত, সুরুজ, নিখিল, আলমগীর—এসব চরিত্রের সঙ্গে নূরজাহানের দেখা হয়, কথা হয়। খাঁবাড়ি, মিয়াবাড়ি, মেন্দাবাড়ি, হালদারবাড়ি, সারেংবাড়ি, হাজামবাড়ি, গাঁওয়ালবাড়ি, ধানিজমির চক, গ্রাম-প্রান্তরে কিশোরী নূরজাহানের নিত্য স্বাধীন বিচরণ। মেদিনী মণ্ডল গ্রামের সবুজ প্রকৃতি থেকে নূরজাহানকে কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন ভাবা যায় না। সে যেন মেদিনী মণ্ডলের প্রকৃতিদুহিতা।
হালদারবাড়ির মজনু ছিল নূরজাহানের স্বপ্নের মানুষ, কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, মজনুর সঙ্গে তার বিয়ে হয় না। তার বিয়ের প্রস্তাব আসে বদের বদ, বাপের চেয়ে তিন গুণ বয়সী মান্নান মাওলানার সঙ্গে। মান্নান মাওলানার খপ্পর থেকে বাঁচার জন্য মা-বাবা তাকে বিয়ে দেয় উদ্ভূত, উন্মূল ভাসমান মানুষ রাব্বানের সঙ্গে। বিয়ের এক বছরের মধ্যে সে হয় নিরুদ্দেশ। দেয় তাকে তালাক। নির্মম নিয়তি হিসেবে নূরজাহানকে মেনে নিতে হয় সতীনসহ মতলিবের সঙ্গে দ্বিতীয় বিয়ে।
নূরজাহান চঞ্চল কিশোরী থেকে যুবতী, তারপর বধূ থেকে তালাকপ্রাপ্তা নিষ্প্রভ নারীতে পরিণত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নূরজাহান চরিত্রের বিকাশ ও বিবর্তন কাঙ্ক্ষিত। নূরজাহানের চরিত্র অঙ্কনে ইমদাদুল হক মিলন অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। হৃদয়ের সমস্ত অনুরাগ দিয়ে তিনি নূরজাহান চরিত্র সৃষ্টি করেছেন। সে জন্যই হয়তো নূরজাহানের শেষ পরিণতি দেখে পাঠকদের চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে, হৃদয়-আর্দ্র হয়, এক মানবিক বেদনায় আকুল হয় মন। পাঠক কিছুতেই নূরজাহানের আত্মহত্যা মেনে নিতে পারে না।
নূরজাহানের মৃত্যুতে শুধু মানুষ নয়, প্রকৃতিও যেন ফুঁসে ওঠে, বিদ্রোহী হয়ে ওঠে পোষা কুকুরটিও। বিশেষত, নূরজাহান চরিত্র সৃষ্টিতে ইমদাদুল হক মিলনের কৃতিত্ব এখানেই যে, নিরাপরাধ মাকুন্দা কাশেমকে যখন মান্নান মাওলানা অন্যায়ভাবে গরুচোর সাজিয়ে মেরে রক্তাক্ত করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়, তখন উপস্থিত পুলিশ ও অজস্র মানুষের সামনে মান্নান মাওলানার মুখে থুতু ছিটিয়ে দেয় নূরজাহান। এই ব্যতিক্রমী প্রতিবাদী ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া নূরজাহানের মতো উচ্ছল কিশোরীর পক্ষেই সম্ভব। হোক না তা সমাজের চোখে যতই নিন্দনীয়, কিন্তু আমরা মনে করি, দুরন্ত কিশোরী, দুঃসাহসী এক নারী, সেদিন রাগে, ক্ষোভে, ঘৃণায় জ্বলে উঠেছিল নূরজাহান। নূরজাহানের থুতু ফতোয়াবাজ, কাঠমোল্লাদের বিরুদ্ধে ছিল প্রচণ্ড এক প্রতিবাদ। সবল, প্রভাবশালী কোনো পুরুষ সেদিন মান্নান মাওলানার অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে এগিয়ে আসেনি। ব্যতিক্রমী প্রতিবাদ নিয়ে এগিয়ে এসেছে সাধারণ গ্রামীণ কিশোরী, অবলা নারী নূরজাহান।
তেজোদীপ্ত, উজ্জ্বল, প্রতিবাদী ভূমিকার জন্য নূরজাহান চরিত্রটি বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে থাকবে। নূরজাহান আসলে একটি প্রতীকী চরিত্র হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের যে কোনো গ্রামেই তাকে নিয়ে যাওয়া যায়। মৌলবাদের বিরুদ্ধে, ফতোয়াবাজের বিরুদ্ধে, ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে নূরজাহান হচ্ছে এক সোচ্চার প্রতিবাদী চরিত্র।
এইচআর/এএসএম
