যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতা বুঝতে পেরে আগ্রাসী হয়ে উঠছে ইরান?
যুদ্ধবিরতি চলছে, কিন্তু যুদ্ধ থামেনি। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ ও সমুদ্রপথে প্রতিদিনই বাড়ছে উত্তেজনা। এক পক্ষের হামলার জবাব আসছে অন্য পক্ষ থেকে। সামরিক স্থাপনা, যুদ্ধজাহাজ, তেল ট্যাংকার ও জ্বালানি অবকাঠামো কিছুই বাদ যাচ্ছে না।
ছয় মাস ধরে চলা এই সংঘাতের সাম্প্রতিক পর্যায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছে ইরান। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দাবি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ অবিলম্বে আগের মতো উন্মুক্ত করতে হবে।
প্রশ্ন উঠছে, বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখেও ইরান কেন এতটা অনড়? ইরান কি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতা বুঝে আরও আগ্রাসী হয়ে উঠছে?
হরমুজ এখন সবচেয়ে বড় অস্ত্র
পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগকারী হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন করা হয়। ফলে এই নৌপথে সামান্য বিঘ্নও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের প্রধান ইস্যু ছিল না। কিন্তু যুদ্ধের একপর্যায়ে ইরান এটি বন্ধ করে দেয়। যুদ্ধবিরতির পরও পুরোপুরি খুলে দিতে রাজি নয় তেহরান। বরং ইরান এখন প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কথা বলছে।
যুক্তরাষ্ট্র এ অবস্থান মেনে নেয়নি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের কর্মকর্তারা বারবার হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। ট্রাম্প এমনও বলেছেন, প্রয়োজনে প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র নেবে।
কিন্তু ওয়াশিংটনের হুমকি-হুঁশিয়ারিতে পিছু হটার বদলে পাল্টা অবস্থান আরও শক্ত করছে তেহরান।

একের পর এক পাল্টা হামলা
সর্বশেষ বুধবার ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিস) দাবি করেছে, তারা জর্ডানের আল-আজরাক এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত একটি সামরিক ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির কাছে ১০টি জাহাজেও হামলার দাবি করেছে তারা।
আরও পড়ুন>
সংকটের মধ্যেও কঠোর হামলার হুঁশিয়ারি ইরানের
কুয়েত-বাহরাইনে হামলার হুমকি ইরানের, নাবিকদের জাহাজ ছাড়ার পরামর্শ
ইরানের দাবি, এসব জাহাজের মধ্যে দুটি মার্কিন জাহাজ ও আটটি তেলবাহী ট্যাংকার ছিল।
এর ঠিক একদিন আগে যুক্তরাষ্ট্র পাঁচটি ইরানি তেল ট্যাংকার ধ্বংস করার কথা জানায়। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের দাবি, ইরানের আইআরজিসি একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজে দুবার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টা করেছিল। এর জবাবেই ট্যাংকারগুলোতে হামলা চালানো হয়।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যতবার মার্কিন নৌযানে হামলার চেষ্টা করবে, ততবার তাদের ট্যাংকার হারাতে হবে।
এরপর জর্ডানে ইরানের হামলার দাবি সামনে আসে। তবে জর্ডানের ভাষ্য, ইরানের ছোড়া ২০টি ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৮টি ভূপাতিত করেছে তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। বাকি দুটি জনবসতিহীন এলাকায় পড়ে। এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। এক মার্কিন কর্মকর্তাও বলেছেন, সেখানে অবস্থানরত মার্কিন সেনারা নিরাপদে আছেন।
তেলের বাজারে বাড়ছে উদ্বেগ
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সংঘাত বাড়ায় এর প্রভাব এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে পড়তে শুরু করেছে। বুধবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছায়।
ইরানের হামলায় তেলবাহী জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কুয়েত ও বাহরাইনের বন্দরে থাকা তেল ট্যাংকারগুলোকেও ইরান হুমকি দিয়েছে বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে।
এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের খোর ফাক্কান বন্দরে একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর এসেছে। তবে এর জন্য কে দায়ী, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিদের সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনায় সাম্প্রতিক হামলাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র কি সামরিকভাবে চাপে?
ইরানের অনড় অবস্থানের পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপের কথাও সামনে আসছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের পাশাপাশি ইউক্রেন ও ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দিতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর বড় চাপ তৈরি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ধারাবাহিক হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের কিছু সামরিক স্থাপনা, রাডার ও অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে যুদ্ধ নিয়ে জনসমর্থনও প্রশ্নের মুখে। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, অনেক মার্কিন নাগরিক ইরানের সঙ্গে যুদ্ধকে সমর্থন করছেন না। দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত চালিয়ে যেতে হলে ট্রাম্প প্রশাসনকে কংগ্রেসের সমর্থনের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।
অর্থাৎ সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থাকলেও ওয়াশিংটন রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে চাপের মধ্যে রয়েছে এমন ধারণা ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরানের কৌশল: ক্ষতি স্বীকার, কিন্তু আত্মসমর্পণ নয়
অন্যদিকে ইরান শুরু থেকেই এই সংঘাতকে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে দেখছে। ব্যাপক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক হামলার পরও তেহরান নতি স্বীকার করেনি।

শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা ও আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পরও ইরানের সামরিক কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। বরং দেশটি পাল্টা হামলার সক্ষমতা ধরে রেখেছে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে বুঝতে হবে যে খেলার নিয়ম বদলে গেছে। তার ভাষ্য, ইরানের নিরাপত্তা ও স্বার্থে হামলা হলে এখন থেকে আরও দ্রুত ও শক্তিশালী জবাব দেওয়া হবে।
আইআরজিসির দাবি, তারা হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখে যুক্তরাষ্ট্রের একটি চালকবিহীন সাবমেরিনও আটক করেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, এটি ‘ডাইভ-এলডি’ মডেলের স্বয়ংক্রিয় পানির নিচের যান।
আরও পড়ুন>
সংকটের মধ্যেও কঠোর হামলার হুঁশিয়ারি ইরানের
কুয়েত-বাহরাইনে হামলার হুমকি ইরানের, নাবিকদের জাহাজ ছাড়ার পরামর্শ
প্যানেটার সতর্কবার্তা
এমন পরিস্থিতিতে সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সিআইএ পরিচালক লিওন প্যানেটা সতর্ক করেছেন, ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের যুদ্ধ আরও অন্তত ছয় মাস চলতে পারে।
প্যানেটার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এমন এক অচলাবস্থায় আটকে গেছে, যেখান থেকে বের হওয়ার কার্যকর পথ খুব সীমিত। এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’-এ পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তিনি আরও বলেছেন, পেন্টাগনের নেতৃত্ব ও কমান্ড কাঠামো নিয়ে সাম্প্রতিক অস্থিরতা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে প্রতিপক্ষদের ভুল বার্তা দিতে পারে।
প্যানেটার মতে, ট্রাম্পের সামনে এখন তিনটি পথ: যুদ্ধ থেকে সরে আসা, বর্তমান অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত করা অথবা হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করা। তার মতে, তৃতীয় পথই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে।
সামনে কোন পথ?
বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত এখন শুধু দুই দেশের সামরিক শক্তির লড়াই নয়। এটি হয়ে উঠেছে সহনশীলতা, অর্থনীতি, জনসমর্থন এবং কৌশলগত অবস্থানের লড়াই।

যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে বিপুল সামরিক শক্তি। কিন্তু একাধিক ফ্রন্টে দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা, অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধ ওয়াশিংটনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে ইরান ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখেও পাল্টা আঘাত করার সক্ষমতা ধরে রেখেছে। সবচেয়ে বড় কথা, হরমুজ প্রণালিকে কৌশলগত চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ তাদের হাতে রয়েছে।
তাই ইরানকে ‘খামখেয়ালি’ বলার চেয়ে বাস্তবতা সম্ভবত আরও জটিল। তেহরান হয়তো বুঝতে পারছে, দীর্ঘ যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ব্যয়বহুল। আর সেই হিসাবেই হরমুজকে সামনে রেখে সর্বোচ্চ চাপ ধরে রাখতে চাইছে তারা।
তবে এই কৌশল কতদিন কার্যকর থাকবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা ইরানকে নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। ফলে এই সংঘাতের পরবর্তী ধাপ নির্ধারণে সামরিক শক্তির পাশাপাশি তেলের বাজার, আন্তর্জাতিক চাপ এবং দুই দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সূত্র: আল-জাজিরা, রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান
এমএসএম
