ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টারকে কেন শক্তিশালী করা জরুরি
এতে জাতীয় মানদণ্ড প্রণয়ন, পরীক্ষাগার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, গুণগত মান তদারকি, গবেষণা ও অ্যাক্রেডিটেশন কার্যক্রমের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলো প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পাচ্ছে না।
বিশ্বের সফল জাতীয় রেফারেন্স পরীক্ষাগারগুলো মূলত প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব দেয়; নিয়মিত রোগনির্ণয়ের কাজ ধীরে ধীরে অন্যান্য পরীক্ষাগারে বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়। বাংলাদেশেও সেই দিকেই অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন।
সরকার ইতিমধ্যে এনআইএলএমআরসির অবকাঠামো ও অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতিতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করেছে।
এখন প্রয়োজন এ বিনিয়োগের পূর্ণ সুফল নিশ্চিত করা। অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় পরীক্ষাগার প্রতিষ্ঠানের মতো এনআইএলএমআরসিকেও অধিকতর প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বায়ত্তশাসন দেওয়া উচিত।
এর ফলে বিশেষজ্ঞ জনবল নিয়োগ, আধুনিক যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা আরও দ্রুত ও কার্যকর হবে।
একই সঙ্গে এনআইএলএমআরসির অধীনে একটি জাতীয় পরীক্ষাগার গুণগত মান ও অ্যাক্রেডিটেশন উইং গঠন করা প্রয়োজন, যা সারা দেশে পরীক্ষাগারের মান মূল্যায়ন, বাহ্যিক গুণগত মান যাচাই কর্মসূচি পরিচালনা, জাতীয় মানদণ্ড প্রণয়ন, অ্যাক্রেডিটেশন কার্যক্রমে সহায়তা এবং ল্যাবরেটরি পেশাজীবীদের ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে।
পাশাপাশি জিনোমিক মেডিসিন, মলিকুলার ডায়াগনস্টিকস, প্রিসিশন মেডিসিন এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স গবেষণাকে এগিয়ে নিতে একটি জাতীয় পরীক্ষাগার গবেষণা ও উদ্ভাবন তহবিল গঠন করা সময়ের দাবি।
একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তি হলো আস্থা। রোগী আস্থা রাখেন চিকিৎসকের ওপর, চিকিৎসক নির্ভর করেন পরীক্ষাগারের প্রতিবেদনের ওপর, সরকার নির্ভর করে জনস্বাস্থ্য-তথ্যের ওপর, আর গবেষক নির্ভর করেন নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক তথ্যের ওপর। পরীক্ষাগারের মান নিশ্চিত না হলে এ আস্থার ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।
কোভিড-১৯ মহামারি আমাদের দেখিয়েছে, শক্তিশালী পরীক্ষাগারব্যবস্থা শুধু রোগনির্ণয়ের জন্য নয়; রোগ নজরদারি, মহামারি মোকাবিলা, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স নিয়ন্ত্রণ এবং জাতীয় স্বাস্থ্যনিরাপত্তার জন্যও অপরিহার্য।
সীমিত সম্পদ নিয়েও এনআইএলএমআরসি তার সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। এখন প্রয়োজন তাকে তার প্রকৃত জাতীয় দায়িত্ব পালনের সুযোগ করে দেওয়া।
অধিকতর স্বায়ত্তশাসন, পর্যাপ্ত জনবল, টেকসই অর্থায়ন এবং একটি শক্তিশালী জাতীয় পরীক্ষাগার মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে উপকৃত হবে শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, দেশের প্রতিটি হাসপাতাল, প্রতিটি পরীক্ষাগার, প্রত্যেক চিকিৎসক এবং সর্বোপরি প্রত্যেক নাগরিক।
নির্ভুল পরীক্ষার ফল শুধু সঠিক রোগনির্ণয়েই সহায়তা করে না; এটি মানুষের জীবন রক্ষা করে, স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি আস্থা বাড়ায় এবং বাংলাদেশের স্বাস্থ্যনিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করে।
তাই এনআইএলএমআরসিকে শক্তিশালী করা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দাবি নয়; এটি একটি নির্ভরযোগ্য, আধুনিক ও টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার জাতীয় অঙ্গীকার।
-
ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ, অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং আহ্বায়ক, অ্যালায়েন্স ফর হেলথ রিফর্মস বাংলাদেশ
*মতামত লেখকের নিজস্ব।
