সীতাকুণ্ডের গ্যাস দুর্ঘটনায় ৯ মৃত্যু: দুই পরিবারের স্বপ্ন শেষ
“সোরকারি চাকরির পরীক্ষা দ্যাওয়ার জন্যে আজক্যা ছোলের বাড়িত আসার কথা আছিল, আইল হামার ছোলের লাশ।”
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙা কারখানায় বিষাক্ত গ্যাসে নিহত গাইবান্ধা সদরের পশ্চিম কুপতলা গ্রামের রানা মিয়ার (২৩) মা মনোয়ারা বেগম বিলাপ করতে করতে কথাগুলো বলছিলেন।
শনিবার দুপুরে অ্যাম্বুলেন্সে করে রানা মিয়ার লাশ গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়। ছেলের লাশ দেখে বাড়ির উঠানের এক পাশে কান্না করছিলেন রানার বাবা বর্গাচাষি হারুন অর রশীদ।
তিনি বলেন, “অভাবের সংসার। ছোলটা মাসে মাসে ট্যাকা দিলো হয়, তাকে দিয়্যা কোনো মতে সংসারটা চলছিলো, এ্যাখোন হামাক ক্যাটা ট্যাকা দিবি।”
সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙা কারখানায় নিহত নয়জনের মধ্যে দুজনের বাড়ি গাইবান্ধায়। তাঁদের একজন রানা মিয়া। তাঁর বাড়ি গাইবান্ধা সদর উপজেলার পশ্চিম কুপতলা গ্রামে।
হারুন অর রশীদ বলেন, ‘‘সম্প্রতি রানা গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে অফিস সহায়ক পদে চাকরির জন্য আবেদন করেছিলেন। আগামী ২১ আগস্ট ওই চাকরির লিখিত পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। লিখিত পরীক্ষা দেওয়ার জন্য শনিবার রানার বাড়ি আসার কথা ছিল। কিন্তু তিনি বাড়ি ফিরেছেন লাশ হয়ে।’’
রানার বড় ভাই মোনারুল ইসলাম চট্টগ্রাম থেকে তাঁর লাশ নিয়ে সকাল ১০টার দিকে বাড়িতে পৌঁছান। গ্রামের বাড়িতে লাশ পৌঁছানোর পর স্বজনদের কান্না-আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। একনজর দেখতে প্রতিবেশীরাও তাঁর বাড়িতে ভিড় করেন।
পরে জোহরের নামাজের পর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে রানা মিয়াকে দাফন করা হয়।
মোনারুল ইসলাম বলেন, ‘‘তাঁরা দুই ভাই ও এক বোন। রানা মিয়া ২০২১ সালে পশ্চিম কুপতলা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০২৩ সালে সাদুল্লাপুর ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর অভাবের সংসারে সহযোগিতা করতে সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল নামে একটি কারখানায় শ্রমিকের চাকরি নেন।’’
মোনারুল ইসলামও চট্টগ্রামের অন্য একটি কোম্পানিতে চাকরি করেন। সেখানে তিনি স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করেন। তাঁদের একমাত্র বোন পিংকির বিয়ে হয়েছে।
একই ঘটনায় নিহত হয়েছেন সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ধোপাডাঙ্গা ইউনিয়নের কিশামত হলদিয়া গ্রামের খোকন মিয়া (২৩)। তাঁর বাবা বর্গাচাষি। তাঁদের দুই ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে উজ্জ্বল মিয়া কৃষিকাজ করেন। মেয়ের বিয়ে হয়েছে। সবার ছোট ছিলেন খোকন।
খোকনের স্ত্রী দুই বছরের সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন। প্রায় ছয় মাস আগে খোকন চট্টগ্রামের ওই জাহাজভাঙা কোম্পানিতে চাকরি নেন।
শনিবার সকালে খোকনের লাশও অ্যাম্বুলেন্সে করে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। দুপুরে জানাজা শেষে তাঁকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
শুক্রবার সকালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে এই দুর্ঘটনা ঘটে। স্ক্র্যাপ জাহাজের গ্যাস সিলিন্ডার থেকে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত গ্যাসে নয়জন নিহত হন।
নিহতরা হলেন—মতিউর রহমান (১৯), সানি জলদাস (২৩), পলাশ জলদাস (৩৫), হাবিবুর রহমান (৫১), মোহাম্মদ মনসুর (৫৫), নাসির উদ্দিন (৫১), আবদুল আলীম (৩৬), রানা মিয়া (২৩) এবং খোকন মিয়া (২৩)।
নিহতদের মধ্যে সানি, পলাশ, হাবিবুর, মনসুর ও নাসির ভাটিয়ারীর বাসিন্দা। মনসুর ও নাসির দুই ভাই। এ ছাড়া খোকন ও রানা মিয়ার বাড়ি গাইবান্ধা জেলায় এবং আবদুল আলীমের বাড়ি পাবনা জেলায়।
অভাবের সংসারে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে চট্টগ্রামের জাহাজভাঙা কারখানায় শ্রমিকের কাজ নিয়েছিলেন রানা ও খোকন। রানা সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। কিন্তু পরীক্ষার দিন আসার আগেই কর্মস্থলের দুর্ঘটনায় তাঁদের জীবন থেমে গেল।
সূত্র: বিডি নিউজ
বাংলাদেশ জার্নাল/এনএম
