পুঁজিবাজারে সংস্কার চলমান, চ্যালেঞ্জ বিদেশি বিনিয়োগে


চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগে থেকেই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা ঘিরে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। নির্বাচনের পর প্রথম কার্যদিবসেই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স একদিনে প্রায় ২০০ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৬০০ পয়েন্টে উঠে সেই প্রত্যাশার বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর স্ংস্কার কার্যক্রম পুরোদমে চলছে। শেয়ারাবাজারে সূচক, লেনদেন বাড়ছে, আস্থা ফিরছে তবে চ্যালেঞ্জ বিদেশি বিনিয়োগে।

বিএনপি সরকার গঠনের পর শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে বেশ কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। এর মধ্যে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পুনর্গঠন করে প্রথম সংস্কার সম্পন্ন করে। এদিকে, বিএসইসি হাতে পুঁজিবাজার নিয়ে সরকারের নেওয়া বেশ কিছু সংস্কার কাজ চলমান রয়েছে। এর মধ্যে পুঁজিবাজার সংস্কারের মধ্যে একটি কাজ ছিল ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি করা। ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি, মিউচুয়াল ফান্ড সংস্কার কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া ১৮০ দিনে যেসব প্রধান সংস্কার কাজ করে যাচ্ছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-অডিটর প্যানেলের গাইডলাইন, মার্জার, কর্পোরেট গভর্নেন্স সংক্রান্ত রুলস। সংস্কারের অংশ হিসেবে এসব বিষয়ে পাবলিক ওপিনিয়ন নেওয়া সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া কমিশন ডি-রেগুলেশন, হুইসেল ব্লোয়ার, মার্জিন রুলস সংশোধনীর কাজ করেছে। লিস্টিং, ডি-লিস্টিং, ডাইরেক্ট লিস্টিং সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মার্চেন্ট ব্যাংকার, পোর্টফোলিও ম্যানেজার বিধিমালাও সংস্কার করবে কমিশন। এসব সংস্কার হলে শেয়ারবাজারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে, গতিশীল হবে দেশের শেয়ারবাজার।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “পুঁজিবাজার নিয়ে সরকারের যে সংস্কার কার্যক্রম সেগুলোর কিছু চলমান, কিছু সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি, মিউচুয়াল ফান্ডের সংস্কার কাজ সম্পন্ন করেছে কমিশন। গত ১৮০ দিনে আমাদের প্রধান অর্জনের মধ্যে ৩টি রুলস, একটি গাইডলাইন পাবলিক ওপিনিয়ন নিয়ে সম্পন্ন করেছে কমিশন। আরো বেশ কিছু সংস্কার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। যেসগুলো সম্পন্ন হলে বাজারে বিনিয়োগ আরো নিরাপদ করতে ভূমিকা রাখবে।”  

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “সরকারে ১৮০ দিনের মধ্যে আমাদের শেয়ারবাজারের প্রথম অ্যাচিভমেন্ট হচ্ছে আমরা প্রায় ১৫০০ কোটি টাকার লেনদেন দেখতে পেয়েছি। যার গড় লেনদেন ১০০০ কোটি টাকার উপরে। এছাড়া বাজারের ইনডেক্সও ইমপ্রুভমেন্ট হয়েছে ১০-১৫ শতাংশ। সেজন্য আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে, বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের কনফিডেন্স ফিরে আসছে।”

তিনি বলেন, “নতুন সরকারের কাছ থেকে প্রথম প্রত্যাশা ছিল সংস্কার। আর কমিশন পুনর্গঠনের মাধ্যমে সরকার প্রথম সংস্কার করেছে। নতুন কমিশন আসার সাথে সাথে বাজারের স্বার্থে বেশ কিছু কাজ করেছে। এর মধ্যে মিউচুয়াল ফান্ডের যে সমস্যা ছিল তা ওনারা লাঘব করেছে। মার্জিন রুলস রিভিউ হয়েছে, সামনে এটি ইমপ্লিমেন্টেশনে আসবে। আইপিও নিয়ে কমিশন কাজ করছে।”

ডিবিএ প্রেসিডেন্ট বলেন, “আমাদের বাজারকে আন্তর্জাতিক না হলেও রিজিওনাল লেভেলে নেওয়ার জন্য যা যা করা দরকার ওনারা (নতুন কমিশন) করবে। এর মধ্যে আমাদের বাজারে অনিয়মের কারণে ফরেন ইনভেস্টমেন্ট খুব কম। তাই অ্যাকাউন্টিবিলিটি, সুশাসন নিশ্চিত করবে কমিশন। তাহলে বিনিয়োগকারীদের কনফিডেন্স থাকবে, স্থিতিশীল হবে আমাদের বাজার।”

সূচকের চিত্র

২০২৬ সালে জাতীয় নির্বাচনের পর প্রথম কার্যদিবসেই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স একদিনে প্রায় ২০০ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৬০০ পয়েন্টে  ওঠে। পরে তা ওঠানামা করে, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দিন ১৭ ফেব্রুয়ারি ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ছিল ৫ হাজার ৫৭০ পয়েন্টে। আর গত ১৩ আগস্ট ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৮৮৩ পয়েন্টে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রধান সূচক বেড়েছে প্রায় ৩১৪ পয়েন্ট। এর মধ্যে গত ১৫ জুলাই ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স বেড়ে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৯২৬ পয়েন্ট দাঁড়িয়েছিল।  

লেনদেন চিত্র

চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দিন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে মোট লেনদেন হয়েছিল ১ হাজার ২২২ কোটি টাকা। গত ১৩ আগস্ট ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে ৯২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে গত জুনের প্রথম সপ্তাহে সরকার শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পুনর্গঠন করেছে। নতুন কমিশন বাজার ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে নানা পদেক্ষপ নিচ্ছে। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর ডিএসইতে গত ১২ জুলাই সর্বোচ্চ লেনদেন হয়েছিল ১ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা। কিন্তু তা বেশি গতি পায়নি।

বিদেশি বিনিয়োগ

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, চলতি বছরের গত জুলাইয়ের প্রথম ১৫ দিনের ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে  বৈদেশিক বিনিয়োগ ছিল ৩৩৯ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। জুন মাসের শেষ ১৫ দিনে বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৩৬৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। আলোচ্য সময়ের ব্যবধানে বিনিয়োগ কমেছে ৭.৪৪ শতাংশ।

বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশণের (বিএমবিএ) সাধারণ সম্পাদক সুমিত পোদ্দার রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “যেহেতু নতুন সরকার আসার পর নতুন কমিশন এসেছে, নতুন কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনাররা খুবই প্রফেশনাল। এ কারণে বাজারে ভালো একটা ভাইব্রেশন তৈরি হয়েছে।রিটেইল ইনভেস্টর অর ইনস্টিটিউশন ইনভেস্টর সবারই একটা কনফিডেন্স বিল্ডআপ হয়েছে।”

তিনি বলেন, “নতুন সরকার আসার পর আমাদের মার্কেটে ফরেন ইনভেস্টমেন্ট যেভাবে আশা করেছিলাম সেটি দেখিনি। এখানে আমাদের একটু কাজ করার জায়গা আছে। কারণ ফরেন ইনভেস্টমেন্ট না আসলে মার্কেট বড় হবে না।”

তিনি আরো বলেন, “এখন রেগুলেশন যেগুলো আসছে একটু ‘ফাস্ট ট্র্যাকে’ যদি আসে, তাহলে মার্কেটের সামনের দিকে সুফল তাড়াতাড়ি দেখতে পারব।”

বাজার মূলধন

বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক দিন পরই ২৬ ফেব্রুয়ারি শেয়ারবাজারের মূলধন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ১৮ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। যা গত ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ বাজার মূলধন। যদিও পরে তা কমেছে, গত ১৩ আগস্ট বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৭ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা।

বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব

শেয়ারবাজারে নতুন বিনিয়োগকারী আসছে নাকি বেরিয়ে গেছে সেটি বিও হিসাব দেখলেই অনেকটা স্পষ্ট হওয়া যায়। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর শেয়ারবাজারে নতুন বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব বেড়েছে প্রায় ৮ হাজার।

শেয়ারবাজারে গত ১৩ আগস্ট বিনিয়োগকারীদের বেনিফিশারি ওনার্স-বিও হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৫৫ হাজার ৯১২টি। এর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব ১৮ হাজার ২৫৬ টি,  পুরুষ বিনিয়োগকারীর বিও হিসাব ১২ লাখ ৪৮ হাজার ৩০৪টি, নারী বিনিয়োগকারীর বিও হিসাব ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৩৫২টি।  

বিএনপি সরকার গঠনের দিন ১৭ ফেব্রুয়ারি বিও হিসাবের সংখ্যা ছিল ১৬ লাখ ৪৭ হাজার ৯১৬টি। এর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক বিও হিসাব ছিল ১৭ হাজার ৯৩৪টি, পুরুষ বিও হিসাব ছিল ১২ লাখ ৩৯ হাজার ৮৬৯ টি এবং নারী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব ছিল ৩ লাখ ৯০ হাজার ১১৩টি।

গত বছরের শেষ দিন ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর বেনিফিশারি ওনার্স-বিও হিসাবের সংখ্যা ছিল ১৬ লাখ ৪০ হাজার ৩৭৫টি। এর মধ্যে পুরুষ বিও হিসাব ছিল ১২ লাখ ৩৩ হাজার ৭৪৩ টি, নারী বিনিয়োগকারী ছিল ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৮২৯টি এবং কোম্পানির বিও ছিল ১৭ হাজার ৮০৩ টি। নতুন বিনিয়োগকারী আসায় চলতি বছরের শুরু থেকে গত ১৩ আগস্ট পর্যন্ত বিও হিসাবের সংখ্যা বেড়েছে সাড়ে ১৫ হাজারের বেশি।

কারসাজি, অনিয়ম, শাস্তি

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ২০২৬ সালের ইনফোর্সমেন্ট রেকর্ডে বিভিন্ন তালিকাভুক্ত কোম্পানি, ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান, পরিচালক ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জরিমানা, সতর্কতা, নিষেধাজ্ঞাসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য রয়েছে। এর বাইরে বাজার কারসাজি ও নানা অনিয়মের ঘটনাগুলোও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। সরকারের অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, বিভিন্ন অনিয়মের ঘটনায় বিএসইসি মোট ১ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা জরিমানা করেছে। এসবের মধ্যে কিছু তদন্ত প্রতিবেদন দুর্নীতি দমন কমিশনে পাঠানো হয়েছে।





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *