অপেক্ষায় ২২ বছর: পিতৃপরিচয়ের জন্য মেয়ের লড়াই


একটি মামলা করা হয়েছিল ন্যায়বিচারের আশায়। সেই মামলার বয়স এখন ২২ বছর। এর মধ্যে বদলেছে সময়, বদলেছে বিচারক, পেরিয়েছে মামলার বিভিন্ন ধাপ। কিন্তু, শেষ হয়নি এক মা ও মেয়ের অপেক্ষা—কবে হবে বিচার, কবে মিলবে প্রাপ্য পরিচয়।

২০০৩ সালে গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গীর মরকুন টেকপাড়া এলাকায় পোশাক শ্রমিক হিসেবে ভাড়া বাসায় থাকতেন কোহিনূর বেগম (ছদ্মনাম)। তার অভিযোগ, বাড়িওয়ালার ছেলে রুহুল আমিন তাকে ধর্ষণ করেন। বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টা করা হয় বলে বাদীপক্ষের অভিযোগ। কয়েক মাস পর কোহিনূর অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে তাকে গর্ভপাত করানোর জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল বলেও মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

তবে, কোহিনূর বেগম সেই চাপের কাছে নতি স্বীকার করেননি। সন্তান জন্ম দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এর পর সন্তানের পিতৃপরিচয় নিশ্চিত করা এবং ধর্ষণের বিচার চেয়ে তৎকালীন টঙ্গী থানায় মামলা দায়ের করেন। 

বিচারিক প্রক্রিয়া এগোতে থাকলেও ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য সময় যেন থমকে থাকে। কোহিনুর বেগমের ভাষায়, এত বছরে আদালতের কত তারিখ গেছে, কত বিচারক বদলেছে, তার হিসাব নেই। কিন্তু, শেষ হয়নি তার অপেক্ষা। 

কোহিনুর বেগম বলেন, “২২ বছর ধরে শুধু আদালতে যাচ্ছি। কত বিচারক বদলেছে, কত তারিখ গেছে, কিন্তু এখনো বিচার শেষ হয়নি। আমি শুধু আমার মেয়ের অধিকার আর ন্যায়বিচার চাই।”

এই দীর্ঘ অপেক্ষার সবচেয়ে বড় ছাপ পড়েছে তার মেয়ের জীবনে। জন্মের পর থেকেই বাবার পরিচয় ছাড়াই বেড়ে উঠেছেন কাকলি আক্তার (ছদ্মনাম)। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিচয়ের সংকটও যেন তার জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে।

বিদ্যালয় থেকে শুরু করে সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনের নানা ক্ষেত্রে পিতৃপরিচয় নিয়ে তাকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র, নাগরিক সনদসহ বিভিন্ন নথিপত্রেও তৈরি হয়েছে জটিলতা। ভবিষ্যৎ সংসার জীবন নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা।

কাকলি আক্তার বলেন, “আমি কোনো অপরাধ করিনি। অথচ, জন্মের পর থেকেই একটি পরিচয়ের জন্য লড়াই করতে হচ্ছে। আমার একটাই চাওয়া, আদালত দ্রুত রায় দিক। আমি আমার ন্যায্য পরিচয় ফিরে পাই।”

নাম বদল, নতুন জটিলতা

মামলাটি দীর্ঘদিন বিচারাধীন থাকার মধ্যেই সামনে আসে আরেকটি বিষয়। মামলার এজাহারে অভিযুক্তের নাম রুহুল আমিন থাকলেও পরবর্তীতে জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবস্থা চালু হলে তিনি মো. সুমন নামে পরিচয়পত্র করেন। এতে মামলার নথির সঙ্গে তার বর্তমান পরিচয়পত্রের তথ্যের অমিল দেখা দেয়।

তবে, স্থানীয়ভাবে বিষয়টি ভিন্নভাবে জানা যায়। সরেজমিনে মরকুন টেকপাড়া এলাকায় গিয়ে অভিযুক্তের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা হলে তার মা নুরুন্নাহার ও ছোট বোন মায়া আক্তার জানান, রুহুল আমিন ও মো. সুমন একই ব্যক্তি। তাদের ভাষ্য, এলাকায় সবাই তাকে রুহুল আমিন নামেই চেনে, তবে জাতীয় পরিচয়পত্রে তিনি মো. সুমন নাম ব্যবহার করেছেন।

ডিএনএ পরীক্ষায় মেলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

মামলার দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে ২০১৭ সালে আদালতের নির্দেশে অভিযুক্ত রুহুল আমিন ও ভুক্তভোগীর মেয়ে সুরভী আক্তারের ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়।

ওই বছরের ২৭ এপ্রিল প্রকাশিত ফরেনসিক প্রতিবেদনে পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে উল্লেখ করা হয়, কাকলি আক্তারের পিতা রুহুল আমিন।

ডিএনএ পরীক্ষায় জৈবিক সম্পর্কের এই তথ্য সামনে এলেও মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনো হয়নি। ফলে, আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি পরিচয়ের জন্যও অপেক্ষা করতে হচ্ছে কাকলিকে।

গাজীপুর জেলা জজ আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জাকিয়া আরিফ স্বর্ণা বলেছেন, “ধর্ষণ একটি জামিন-অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য অপরাধ। এ ধরনের মামলায় ডিএনএ পরীক্ষায় অভিযুক্তের সঙ্গে ভুক্তভোগীর সন্তানের সম্পর্ক প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।” 

তার মতে, এ ধরনের মামলায় আপসের সুযোগ নেই। ডিএনএ প্রতিবেদন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে গেলে আইন অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত করাই হচ্ছে পরবর্তী পদক্ষেপ।

গাজীপুর পিবিআই’র পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তার জানিয়েছেন, মামলার তদন্ত অনেক আগেই শেষ করে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে।

একসময় যে মেয়েটি জন্মের পর নিজের বাবার পরিচয় জানত না, দুই দশকের বেশি সময় পর ডিএনএ পরীক্ষায় সেই পরিচয়ের একটি বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সামনে এসেছে। তবু, আদালতের চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষা শেষ হয়নি।

২২ বছর ধরে চলা এই অপেক্ষা তাই শুধু একটি মামলার নিষ্পত্তির জন্য অপেক্ষা নয়; এটি একজন মায়ের ন্যায়বিচার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং একটি মেয়ের নিজের পরিচয় ফিরে পাওয়ার লড়াই। ভুক্তভোগী পরিবার এখন চায়, দীর্ঘ এই আইনি পথের শেষ প্রান্তে দ্রুত একটি রায় আসুক, যাতে ২২ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটে।





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *