মোড়ক উন্মোচন: কালোত্তীর্ণ হবে ‘রাজনীতির সদরে-অন্দরে’


জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বিকেলে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। প্রত্যাশার চেয়ে সমাগম বেশি হওয়ায় অনুষ্ঠান শুরুর আগে আয়োজক প্রতিষ্ঠান সূচীপত্র একটু হিমশিম খেলেও অনুষ্ঠান শুরুর পর পাল্টে যায় পরিবেশ। যে আগ্রহ ও উদ্দীপনা নিয়ে ‘রাজনীতির সদরে-অন্দরে’ বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে সমবেত হয়েছিলেন আমন্ত্রিতরা, বক্তাদের বক্তব্যে তা পূরণ হয়েছে শতভাগ।

এই অনুষ্ঠানে ‘রাজনীতির সদরে-অন্দরে’ বইটি কালোত্তীর্ণ হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান। বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির এ সদস্য বলেন, “লেখকের আর্থিক সুবিধার জন্য নয় বরং নিজেদের জ্ঞান বৃদ্ধি, চিন্তাকে শানিত করতে হলে এ বইটি কিনতে হবে। লেখা ও বিষয়বস্তুর কারণে বইটি কালোত্তীর্ণ হবে। এ বই শুধু সাংবাদিকতা নয় বরং সাংবাদিক এবং একজন রাজনৈতিক কর্মীর সচেতনতা মিলিয়ে যে উদ্যোগটা হয়-সেই সংমিশ্রণ থেকে লেখা হয়েছে।”

প্রতিদিনের বাংলাদেশ এর সম্পাদক মারুফ কামাল খানের লেখা বইটি নিয়ে অনেকক্ষণ বলা যায় উল্লেখ করে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি নজরুল ইসলাম খান বলেন, “এ বইয়ের প্রত্যেকটা অধ্যায় আপনাকে ভাবতে শেখাবে। আপনার জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করবে।”

সূচীপত্রের প্রকাশক ও প্রধান নির্বাহী সাঈদ বারীর সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছাড়াও বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।

অনুষ্ঠানে বইটি নিয়ে আলোচনা করেন সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, যুগান্তর সম্পাদক আবদুল হাই শিকদার, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান, প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সহকারী প্রেস সচিব আশিক ইসলাম, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক আফসানা বেগম, গ্রন্থের প্রকাশক সূচীপত্রের প্রকাশক সাঈদ বারী, আবিষ্কার প্রকাশক দেলোয়ার হাসানসহ পেশাজীবী ও সাহিত্যিকরা বক্তব্য রাখেন।

গ্রন্থের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে নজরুল ইসলাম খান লেখকের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, “আমি বইটি পড়েছি, আবার পড়ব। অনেকগুলি বিষয় আছে এখানে। আমরা বহু রাজনীতিবিদ সম্পর্কে অনেক কথা জানি, অনেক কথা জানি না। ওসমানী সাহেবের দুইটা কুকুর ছিল… একটার নাম ছিল ফিল্ড মার্শাল, আরেকটার নাম ছিল ইন্দিরা। এটি আমরা কজন জানি। পাকিস্তান আমলে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান ও পরবর্তী পর্যায়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে কী ধারণা জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী পোষণ করতেন, তার ইঙ্গিত এই বই থেকে পাওয়া যায়।”

তিনি বলেন, “মারুফ কামাল বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করলেও ওসমানীকে নিয়ে তার চেয়ে বেশি পৃষ্ঠা লিখেছেন। রাজনীতিতে ইতিহাসে যাদেরকে ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছিল তাদের কথা তুলে ধরা হয়েছে।”

নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, “আমাদের দেশে এমন যুগ গেছে যখন পড়ালেখা না করেই ৯০ শতাংশ পাস। লাইব্রেরিতে বইয়ের ওপর ধুলা জমেছে, পড়ার লোক নেই। ভোট ছাড়া ক্ষমতায় যাওয়া যায়-এ কথা কেউ ভাবেওনি, কিন্তু তাই হয়েছে। সেসব অন্ধকার পেরিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান হলো, তারপর নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। এই মুহূর্তে এমন একটি অসাধারণ বই প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশনার মতো নিরানন্দ অনুষ্ঠান আজ উৎসবে পরিণত হয়েছে।”

তিনি বলেন, “রাজনীতির সদরে-অন্দরে বইটি পড়ে বোঝা যায় মারুফ কামাল খান একজন কবি কিন্তু অসমাপ্ত কবি, একজন সাহিত্যিক কিন্তু অসমাপ্ত সাহিত্যিক। তার লেখাটি সুখপাঠ্য হবে। সারা দেশে আমাদের লাইব্রেরি রয়েছে। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের লাইব্রেরি আছে। প্রত্যেকটা লাইব্রেরিতে আমরা বইটি রাখব।”

তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, “মারুফ কামাল খানের সঙ্গে আমার সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং দেশ-জাতি-সমাজ-রাজনীতি সম্পর্কে আমাদের চিন্তা অনেক কাছাকাছি। আমাদের পারস্পরিক সান্নিধ্য খুব ভালো।”

তিনি বলেন, “রাজনীতির সদরে-অন্দরে বইটি থেকে রস আহরণ নির্ভর করবে পাঠকের চাহিদার ওপর। তারা কোন দিকটি নেবেন। বইটি সুখপাঠ্য ছাড়াও সংগ্রহে রাখার মতো দলিল।”

“দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে যখন তিনি কাজ করেছিলেন তখন মারুফ কামাল ছিলেন নির্ভরযোগ্য অপেক্ষার স্থান। তার আপ্যায়ন ও হাস্যকৌতুকের মধ্যমণি ছিলেন তিনি। তিনি তার স্মৃতির ভান্ডার থেকে রাজনীতির সদরে-অন্দরে যা যা দেখেছেন, সেখানে অনেক চরিত্র এসেছে, অনেক ঘটনা এসেছে। অনেক পরিস্থিতি এসেছে তা তিনি বইয়ে লিখেছেন। সেখান থেকে রস আস্বাদন করা এবং সেখান থেকে জ্ঞান আহরণ করা দুটোই নির্ভর করবে কোন পাঠক কোন মাপের চশমা দিয়ে বই পাঠ করছেন এবং কতটা গভীর মনোযোগ থেকে বইটা পাঠ করছেন।”

তিনি বলেন, “বইটি পড়লে রাজনীতির সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক বেরিয়ে আসে। মহাভারত, ওডিসিতে মানুষের বিভিন্ন চরিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তেমনি রাজনীতির সদরে-অন্দরেও তুলে ধরা হয়েছে অনেক চরিত্র, যারা রাজনীতিক।”

অধ্যাপক আবু সাঈদ বলেন, “আমাদের দেশে ১৮ কোটি মানুষ হলেও বই বিক্রি হয় এক হাজার দুই হাজার। বইটির প্রচার কামনা করছি। আর বাঙালির আমি তত্ত্ব শেষ করে যখন আমরা হব তখনই উন্নতি হবে। লেখকের জন্য বই হচ্ছে সন্তানের মতো। রাজনীতির সদরে-অন্তরে বইটিও তেমনি। তিনি আমিত্ববাদের বাইরে সাবলীলভাবে লিখেছেন।”

শিমুল বিশ্বাস বলেন, “যে বাংলাদেশের জন্য মানুষ মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ দিয়েছে সেই বৈষম্যহীন বাংলাদেশ নির্মাণের স্বপ্ন দেখেন মারুফ কামাল খান।”

আব্দুল হাই শিকদার বলেন, “বইটির গুরুত্ব বুঝতে বইটি পড়লেই হবে। বইটি সাংবাদিকতা ও কবিত্বের সংমিশ্রণে মোড়ানো।”

গ্রন্থকারের কবিতার বইয়েরও প্রশংসা করেন তিনি। তিনি আরো বলেন, “তার লেখায় অনেক কিছু ফুটে উঠেছে। রাজনীতি নিয়ে সাংবাদিকদের অনেক লেখা রয়েছে। ‘ভাসানী যখন ইউরোপে’ বইটি অসাধারণ, আবুল মনসুর আহমদের ‘আমার দেখা রাজনীতির ৫০ বছর’, এবিএম মূসার ‘মুজিব ভাই’-এসব বইয়ের মধ্যে মারুফ কামালের ‘রাজনীতির সদরে-অন্দরে’ বইটিও যোগ হলো।”

সালেহ শিবলী বলেন, “আগামীতে আরো ভালো বই লিখবেন। তার মেধা খুবই তীক্ষ্ন। বইটি পড়ে অনেক কিছু জেনেছি। বইটিতে রাজনীতির ধারাবাহিকতা না থাকলেও প্রতিটি লেখার মধ্যে যোগসূত্র পাওয়া যাবে।”

তিনি বলেন, “আমরা বই পড়ছি না। সামাজিক মাধ্যমে না থেকে বইগুলো পড়লে রাজনীতিতে ভালো কিছু হবে। বই না পড়লে, রাজনীতির দুয়েকটা ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলে চলবে না।”

তিনি আরো বলেন, “লন্ডনে ২০১৪ সালের ১৬ জুলাই একটি সেমিনারে তারেক রহমান বলেছিলেন বিএনপি রাষ্ট্র ক্ষমতায় গেলে কোটা ৫৬ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। ২০১৮ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলন হলো, ২০২৪ সালে সেই কোটার আন্দোলন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিল। অর্থাৎ এসব কথা সেমিনারে হলেও কেউ কেউ না লিখে রাখে।”

সৈয়দ আবদাল আহমদ বলেন, “বই প্রকাশ করলে এক সময় সেটি ইতিহাস হয়ে থাকে। লেখক খুবই আড্ডাপ্রিয় মানুষ। তিনি নানা বিষয়ে বক্তব্য রাখেন। তার লেখাও খুব ভালো।”

আফসানা বেগম বলেন, “বইটিতে রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলে ধরা হয়েছে।”

আব্দুল গাফ্‌ফার চৌধুরী ও মারুফ কামাল খানের লেখার ভক্ত উল্লেখ করে কাদের গণি চৌধুরী বলেন, “চৌধুরীর লেখায় সত্য-মিথ্যার সংমিশ্রণ থাকত, কিন্তু মারুফ কামাল খানের লেখাতে থাকে শুধু সত্য।”

মারুফ কামাল খান বলেন, “আপনারা এখন বিচারক, আমি কাঠগড়ায়। আপনাদের কথা শুনে উৎসাহিত হয়েছি, ভবিষ্যতে আরো ভালো কিছু লিখতে পারব।” 

সভাপতির বক্তব্যে সাঈদ বারী বলেন, “বর্তমানে প্রকাশনা শিল্প খুবই নাজুক অবস্থার ভিতর দিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীকে এ শিল্পের উন্নয়নে মনোযোগ দিতে হবে।”





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *