৫১ লাখ মানুষকে কলেরার টিকা দেবে সরকার: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
দেশের ১৪টি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ উপজেলা ও থানায় ৫১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষকে কলেরার টিকা দেওয়ার লক্ষ্যে ‘প্রিভেন্টিভ ওরাল কলেরা ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইন-২০২৬’ শুরু করছে সরকার। আগামী ২২ আগস্ট থেকে প্রথম ধাপের টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়ে চলবে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। দ্বিতীয় রাউন্ড চলবে ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২৫ অক্টোবর।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) রাজধানীর নগর ভবন অডিটোরিয়ামে ক্যাম্পেইনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এসব তথ্য জানান।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, কলেরা প্রতিরোধযোগ্য ও চিকিৎসাযোগ্য রোগ হলেও সময়মতো চিকিৎসা না হলে তীব্র ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতার কারণে দ্রুত জীবনহানি ঘটতে পারে। নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের পাশাপাশি ওরাল কলেরা ভ্যাকসিন (ওসিভি) কলেরা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ঘনবসতি, নগরায়ন, নিরাপদ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের সীমাবদ্ধতা, মানুষের চলাচল এবং বিভিন্ন এলাকার বিশেষ ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সরকার targeted, evidence-based ও preventive approach গ্রহণ করেছে। রোগের বোঝা, পূর্ববর্তী টিকাদানের ইতিহাস, জনসংখ্যার ঘনত্ব ও সংক্রমণের আশঙ্কাসহ বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুত করা Multi-Year Plan of Action-এর আওতায় পর্যায়ক্রমে দেশের ১৪৪টি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ উপজেলা ও থানায় এই প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
প্রথম পর্যায়ের ১৪টি অগ্রাধিকার এলাকার মধ্যে রয়েছে- ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের লালবাগ, গেন্ডারিয়া, কদমতলী ও কামরাঙ্গীরচর; ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের শের-ই-বাংলা নগর, খিলক্ষেত ও তেজগাঁও; মুন্সিগঞ্জ সদর, কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ, হোসেনপুর ও তাড়াইল; নারায়ণগঞ্জ সদর এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর ও নবীনগর।
দুই রাউন্ডে প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ ৫০ হাজার ডোজ টিকা প্রয়োজন হবে জানিয়ে সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নির্বাচিত এলাকার এক বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সী জনগোষ্ঠীকে নির্ধারিত যোগ্যতার ভিত্তিতে টিকা দেওয়া হবে। দুই ডোজের মধ্যে ন্যূনতম ১৪ দিনের ব্যবধান থাকবে।
ক্যাম্পেইনে VaxEPI প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের কথাও তুলে ধরেন তিনি। এর মাধ্যমে টিকা গ্রহণের তথ্য সংরক্ষণ, টিকাদানের আওতা পর্যবেক্ষণ, কর্মসূচির তদারকি এবং পরবর্তী মূল্যায়ন সহজ হবে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বৈশ্বিকভাবে ওরাল কলেরা ভ্যাকসিনের সরবরাহ সংকটের কারণে তিন বছরেরও বেশি সময় preventive cholera vaccination কার্যক্রম সীমিত ছিল। ২০২৬ সালে বৈশ্বিক সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির পর WHO, Gavi ও UNICEF preventive campaign পুনরায় শুরু করার উদ্যোগ নেয়। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশকে প্রায় ১০ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডোজ বরাদ্দের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, জাতীয় পরিকল্পনা অনুযায়ী বাংলাদেশে ১ কোটি ৩ লাখ ৫২ হাজার ৫০০ ডোজ OCV সরবরাহে Gavi সহায়তা করছে। ভ্যাকসিনটি WHO pre-qualified এবং টিকা ও সংশ্লিষ্ট পরিচালন ব্যয়েও Gavi সহযোগিতা দিচ্ছে।
কলেরা প্রতিরোধে শুধু টিকার ওপর নির্ভর না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নিরাপদ পানি, উন্নত স্যানিটেশন ও পয়ঃনিষ্কাশন, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, নিরাপদ খাদ্য প্রস্তুত ও সংরক্ষণ, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং সময়মতো ORS ও চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।
স্বাস্থ্যকর্মী, স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের উদ্দেশে সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, কোনো যোগ্য ব্যক্তি যেন টিকাদানের আওতার বাইরে না থাকে। মসজিদ-মাদ্রাসা, স্কুল, কমিউনিটি সভা, মাইকিংসহ স্থানীয় যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে জনগণকে টিকা নিতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে এই ক্যাম্পেইনের কারণে নিয়মিত EPI কার্যক্রম যাতে কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন তিনি।
গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ভ্যাকসিন নিয়ে ভুল তথ্য, গুজব বা বিভ্রান্তি যেন মানুষের মধ্যে অনীহা তৈরি করতে না পারে, সে জন্য সঠিক তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের vaccine safety, cold chain, accurate record keeping, AEFI management এবং respectful service delivery-সংক্রান্ত নির্ধারিত নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণের আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানের শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ‘প্রিভেন্টিভ ওরাল কলেরা ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইন-২০২৬’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
