ট্রেনে নিরাপত্তার বদলে আতঙ্ক, পাঁচ মাসে পাথর নিক্ষেপের ৬২ ঘটনা


দেশের নিরাপদ ও সাশ্রয়ী যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ট্রেনের ওপর আস্থা রাখেন হাজারো মানুষ। কিন্তু চলন্ত ট্রেনের জানালা ভেদ করে হঠাৎ ছুটে আসা পাথর সেই নিরাপত্তাবোধে তৈরি করছে নতুন শঙ্কা। একটি পাথরের আঘাতে মুহূর্তেই গুরুতর আহত হচ্ছেন যাত্রী, ভাঙছে ট্রেনের জানালার কাচ, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সরকারি সম্পদ।

কুমিল্লার রাজাপুর স্টেশন এলাকায় উপকূল এক্সপ্রেসে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনাই এই ঝুঁকির ভয়াবহতা সামনে এনেছে। ৩০ জুলাই রাতে নোয়াখালীগামী ওই ট্রেনের জানালার পাশে বসেছিলেন মাইজদীর বাসিন্দা মহিউদ্দিন। ট্রেনটি রাজাপুর স্টেশন অতিক্রম করার সময় হঠাৎ বিকট শব্দে জানালার কাচ ভেঙে একটি পাথর ভেতরে ঢুকে তার মাথায় আঘাত করে। রক্তাক্ত অবস্থায় তিনি ট্রেনের ভেতরেই লুটিয়ে পড়েন। পরে নোয়াখালী পৌঁছে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

মহিউদ্দিন বলেন, “ট্রেনটি স্টেশন অতিক্রম করতেই হঠাৎ মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে পড়ে যাই। প্রথমে বুঝতেই পারিনি কী হয়েছে। পরে দেখি মাথা দিয়ে রক্ত পড়ছে। তখন বুঝতে পারি বাইরে থেকে পাথর এসে লেগেছে।”

তার এই অভিজ্ঞতা এখন আর একক কোনো ঘটনা নয়। রেলওয়ের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন পথে চলন্ত ট্রেনে ৬২টি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় সাধারণ যাত্রী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বাস্তবে ঘটনার সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে ঝুঁকির বিস্তৃতিও স্পষ্ট হয়। ৬২টি ঘটনার মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম পথে ঘটেছে ৩৭টি। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার পথে ১৯টি, লাকসাম-নোয়াখালী পথে চারটি এবং লাকসাম-চাঁদপুর পথে দুটি ঘটনা ঘটেছে।

রেলওয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলের সহকারী পরিবহন কর্মকর্তা-২ মো. মনিরুজ্জামান বলেন, পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় শুধু যাত্রী আহত হচ্ছেন না, ট্রেনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তিনি বলেন, “পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় শুধু যে যাত্রীরা আহত হয় এমন নয়, সরকারি সম্পদ ট্রেনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতিটি ঘটনায় ভেঙেছে ট্রেনের জানালার কাচ।”

তার ভাষ্য, একটি এসি বগির একটি জানালা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সেটি মেরামত না হওয়া পর্যন্ত পুরো বগিটি চলাচলের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে। ফলে যাত্রী নিরাপত্তার পাশাপাশি রেলওয়ের স্বাভাবিক পরিচালনাও ব্যাহত হচ্ছে।

আতঙ্কের সঙ্গে ট্রেনে উঠছেন যাত্রীরা

কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের রেলপথে এই ধরনের ঘটনা বাড়তে থাকায় যাত্রীদের মধ্যেও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রাম-আখাউড়া ২০০ কিলোমিটার, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ১৪৭ কিলোমিটার, লাকসাম-নোয়াখালী ৪৮ কিলোমিটার এবং লাকসাম-চাঁদপুর ৫০ কিলোমিটার রেলপথে আন্তঃনগর ও মেইল এক্সপ্রেস মিলিয়ে ২৬ জোড়া ট্রেন চলাচল করে। প্রতিদিন এসব পথে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ যাতায়াত করেন।

ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী মহানগর প্রভাতীর যাত্রী ফাহিমা চৌধুরী বলেন, “ট্রেনে আমরা নিরাপদে যাতায়াতের জন্য চলাচল করি। কিন্তু চলন্ত অবস্থায় হঠাৎ পাথর এসে পড়লে আতঙ্কিত না হয়ে উপায় নেই।”

শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে যাতায়াতের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “পাথর চোখে বা মাথায় লাগলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। একটা পাথর শুধু কাচ ভাঙে না, একজন মানুষের জীবনও শেষ করে দিতে পারে।”

ফাহিমা চৌধুরীর মতে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে সেখানে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পাথর নিক্ষেপকারীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সারোয়ার বাবুর অভিজ্ঞতাও একই ধরনের। তিনি বলেন, পাথরের আঘাতে মাথা, চোখ, নাক কিংবা কানে গুরুতর আঘাত লাগছে। প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। ফলে ট্রেনে ওঠার ক্ষেত্রেও যাত্রীদের মধ্যে ভয় তৈরি হচ্ছে।

কারা ছুড়ছে পাথর, কেন শনাক্ত করা যাচ্ছে না

রেলসংশ্লিষ্টদের প্রাথমিক ধারণা, স্কুলপড়ুয়া শিশু-কিশোর, মাদকসেবী ও ছিনতাইকারীদের একটি অংশ এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। তবে ঘটনাস্থল দ্রুত শনাক্ত করে অপরাধীদের ধরার ক্ষেত্রে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

চট্টগ্রাম প্রধান কার্যালয়ের গ্রেড-১ বি ট্রেন পরিচালক ওমর ফারুক বলেন, ট্রেনে দায়িত্ব পালনকারী কর্মীরা বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকেন। ফলে হঠাৎ পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে কারা এ কাজ করেছে, তা শনাক্ত করা কঠিন।

তার মতে, ট্রেনের সামনে ও পেছনে কার্যকর ক্যামেরা থাকলে পাথর নিক্ষেপের সময় কোন স্থান থেকে কারা এ কাজ করছে, তা শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।

কুমিল্লায় কর্মরত সাংবাদিক মাসুদ আলমও মনে করেন, শুধু পাথর নিক্ষেপের ঘটনাকে দুষ্টুমি হিসেবে দেখলে সমস্যার সমাধান হবে না। তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের পরিচয় বের করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি শিশু-কিশোর জড়িত থাকলে তাদের অভিভাবকদেরও জানানো প্রয়োজন।

মামলা হয়েছে, গ্রেপ্তার নেই

পাথর নিক্ষেপের ঘটনা নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে অপরাধীদের শনাক্ত ও আটকের সক্ষমতা নিয়ে। একের পর এক ঘটনা ঘটলেও এখন পর্যন্ত রেল নিরাপত্তা বাহিনী কিংবা পুলিশ এসব ঘটনায় জড়িত কাউকে আটক করতে পারেনি।

রেলওয়ে চট্টগ্রাম থানার উপপরিদর্শক সহদেব কুমার সরকার বলেন, চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের দিকে ডুলাহাজরা, রামু ও দোহাজারিতে পাথর নিক্ষেপের প্রবণতা রয়েছে। ২০২৪ সাল থেকে এসব ঘটনায় ১২টি মামলা হয়েছে। তবে কোনো মামলাতেই কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করা যায়নি।

তিনি বলেন, রাতের বেলায় দ্রুতগামী ট্রেনে এ ধরনের ঘটনা বেশি হওয়ায় ঘটনাস্থল শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট এলাকায় সচেতনতা কার্যক্রম ও বিট পুলিশিং করা হচ্ছে।

রেলওয়ে লাকসাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন বলেন, ফেনী স্টেশনসংলগ্ন এলাকা ও কুমিল্লার রাজাপুরের দুটি স্থানে সম্প্রতি পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় যাত্রী আহত হওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে যাত্রীরা অভিযোগ করেন না। তাই পুলিশ নিজ উদ্যোগে ঘটনাগুলো লিপিবদ্ধ করে সংশ্লিষ্ট এলাকায় সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

টহল ও সচেতনতা, তবু পুরোপুরি থামছে না

পাথর নিক্ষেপের প্রবণতা আগের তুলনায় বেড়েছে দাবি করে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী লাকসাম শাখার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সালাহউদ্দিন ভুইয়া বলেন, টহল বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় মানুষকে সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, “টহল বাড়ানোর পাশাপাশি জনসচেতনতা তৈরিতে নেওয়া হচ্ছে নানা উদ্যোগ। পাথর নিক্ষেপের ঘটনা প্রতিরোধে আমরা নিয়মিত টহল দিচ্ছি।”

তিনি আরও জানান, স্থানীয়দের সচেতন করতে লিফলেট বিতরণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. সুবক্তগীন বলেন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার পথে পাথর নিক্ষেপ কিছুটা কমলেও সাম্প্রতিক সময়ে কুমিল্লা অঞ্চলে এ ধরনের ঘটনা বেড়েছে। তবে এটি নিছক দুষ্টুমি, নাকি এর পেছনে পরিকল্পিত কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তিনি বলেন, “পাথর নিক্ষেপের ঘটনা সামাজিক ও প্রশাসনিকভাবে প্রতিহত করার চেষ্টা চলছে। রেললাইনের পাশের বসতিগুলোতে লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে পাথর নিক্ষেপের ভয়াবহতা তুলে ধরা হচ্ছে।”

এ ছাড়া জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সহযোগিতাও নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

চলন্ত ট্রেনে একটি পাথর কখনো শুধু একটি জানালার কাচ ভাঙে না—তার সঙ্গে ভেঙে যেতে পারে একজন যাত্রীর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। পাঁচ মাসে ৬২টি ঘটনার পরও যখন অপরাধীদের শনাক্ত করা যাচ্ছে না, তখন রেলপথের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি, দ্রুত তদন্ত এবং কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা কতটা জরুরি, সেই প্রশ্নই এখন সামনে আসছে।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএম





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *