সংকটের আবর্তে স্বপ্নের পাঠশালা: শ্রীপুর সরকারি কলেজে ১২ হাজার শিক্ষার্থীর লড়াই


সকাল হলেই শ্রীপুর সরকারি কলেজের প্রাঙ্গণ মুখর হয়ে ওঠে হাজারো শিক্ষার্থীর পদচারণায়। কেউ ছুটছেন শ্রেণিকক্ষে, কেউ ল্যাবে, কেউবা সেমিনারে। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে প্রতিদিন এখানে আসেন ১২ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী। কিন্তু, সেই স্বপ্নের পাঠশালাটিই এখন চলছে নানা সংকটকে সঙ্গী করে।

শিক্ষক সংকট, কর্মচারীর স্বল্পতা, শ্রেণিকক্ষ ও ল্যাবের অপ্রতুলতা—সব মিলিয়ে শ্রীপুর সরকারি কলেজের বাস্তব চিত্র অনেক হতাশাজনক। এ কলেজে বর্তমানে কমপক্ষে ডজনখানেক শিক্ষকের পদসহ দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির একাধিক পদ শূন্য রয়েছে। ফলে, কোথাও বিকল্প শিক্ষক, কোথাও খণ্ডকালীন শিক্ষক-কর্মচারী দিয়ে সামলানো হচ্ছে শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম।

কলেজ প্রশাসন ও অফিস সূত্র জানিয়েছে, কয়েক বছর আগে জাতীয়করণের আওতায় আসে শ্রীপুর সরকারি কলেজ। এরপর বয়সজনিত কারণে বেশ কয়েকজন শিক্ষক অবসরে যান। কেউ কেউ মারা যাওয়ায় শূন্য হয়েছে বিভিন্ন পদ। বর্তমানে ইসলাম শিক্ষা, সমাজকর্ম, হিসাববিজ্ঞান, ভূগোল ও পরিবেশবিজ্ঞান, গণিত, ইতিহাস, ব্যবস্থাপনা, মার্কেটিং, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান, কৃষিবিজ্ঞান, ইংরেজি, প্রাণিবিদ্যা ও অর্থনীতি বিষয়ে একজন করে সহকারী অধ্যাপকের পদ শূন্য রয়েছে। কোনো কোনো বিভাগে একাধিক প্রভাষকের পদও খালি।

সম্প্রতি বাংলা বিভাগে একজন অধ্যাপক সংযুক্ত করা হলেও উপাধ্যক্ষের পদটি এখনো শূন্য। আবার পদ সৃজন না হওয়ায় অধ্যক্ষ পদেও একজন সংযুক্ত কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন।

শুধু শিক্ষক নয়, প্রশাসনিক জনবল সংকটও প্রকট। সহকারী গ্রন্থাগারিক, প্রদর্শক, প্রধান সহকারী ও হিসাবরক্ষক অবসরে যাওয়ার পর অফিসে বর্তমানে মাত্র একজন তৃতীয় শ্রেণির সরকারি কর্মচারী রয়েছেন। কাজের চাপ সামলাতে খণ্ডকালীন একাধিক কর্মচারী নিয়োগ দিতে হয়েছে। এমনকি বিভাগীয় তহবিল থেকে পারিতোষিক দিয়ে দুই বিভাগ বা সেমিনারের দায়িত্ব একজন সেমিনার সহকারীর ওপরও দেওয়া হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেই, এমন ব্যক্তিদেরও কোথাও কোথাও খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের দাবি, এতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে এবং বিষয়ভিত্তিক শিক্ষার মান নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।

তবে, এত সংকটের মধ্যেও থেমে নেই কলেজটির একাডেমিক সাফল্য। কলেজের অভ্যন্তরীণ বড় একটি আয়ের উৎস অনার্স ডিসিপ্লিন। ১০টি অনার্স বিভাগে প্রতি বছর গড়ে কমপক্ষে দেড়শ শিক্ষার্থী প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক উত্তীর্ণ হওয়ার গৌরব অর্জন করছেন বলে কলেজ সূত্র জানিয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মতে, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও এই ফলই প্রমাণ করে-প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ ও প্রচেষ্টা এখনো শক্ত অবস্থানে রয়েছে।

তবে, শ্রেণিকক্ষ ও ল্যাবের সংকট তাদের সেই পথকে কঠিন করে তুলেছে। বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর তুলনায় প্রয়োজনীয় কক্ষ ও ল্যাব না থাকায় নিয়মিত পাঠদান ও ব্যবহারিক শিক্ষা পরিচালনায় চাপ তৈরি হচ্ছে। এরপরও শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের ভাষায়, নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কলেজটি যেন ‘মেরুদণ্ড সোজা‘ রেখেই এগিয়ে চলেছে।

কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক লুৎফর রহমান বলেছেন, “শিক্ষক-কর্মচারী সংকটের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলা বিভাগে একজন অধ্যাপক সংযুক্ত হয়েছেন। অন্যান্য বিভাগেও কর্তৃপক্ষ চাইলে একইভাবে শিক্ষক সংযুক্ত করতে পারেন।”

শ্রেণিকক্ষ ও ল্যাব সংকটের বিষয়ে অধ্যক্ষ বলেন, “স্থানীয় সংসদ সদস্যের চাহিদাপত্রের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। এরইমধ্যে ঠিকাদার নিয়োগের মাধ্যমে ভবন সম্প্রসারণের কাজ চলছে। পরবর্তীতে আরো সম্প্রসারণ করা হবে।”

শ্রীপুর সরকারি কলেজের গল্প তাই শুধু সংকটের গল্প নয়; এটি সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এগিয়ে চলার গল্প। একদিকে শূন্য পদ, অপরদিকে ১২ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন। সেই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে কলেজটি প্রতিদিনই প্রমাণ করার চেষ্টা করছে-সুযোগ কম থাকলেও স্বপ্নের পরিধি ছোট হয় না।





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *