৩২৫ গবেষণাপত্র প্রত্যাহার: ‘রিট্র্যাক্টেড’ মানেই কি গবেষকের জালিয়াতি?
বাংলাদেশের ৩২৫টি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক সাময়িকী থেকে প্রত্যাহার বা বাতিল হওয়ার তথ্য প্রকাশের পর গবেষণা অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে গবেষণা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো গবেষণাপত্র প্রত্যাহার হওয়া মানেই সংশ্লিষ্ট গবেষক প্রতারণা বা জালিয়াতি করেছেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়; প্রত্যাহারের কারণ ও গবেষকের ভূমিকা আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
গবেষণা সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো গবেষণাপত্র প্রত্যাহার হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট গবেষক গবেষণায় অসদাচরণ করেছেন—এই দুটি বিষয় সবসময় এক নয়। প্রত্যাহারের কারণ, সংশ্লিষ্ট লেখকের ভূমিকা এবং সাময়িকীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া পৃথকভাবে যাচাই করা জরুরি।৩১ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত রিট্র্যাকশন ওয়াচ ডেটাসেটের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৩২৫টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহৃত হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছে। একই তথ্যচিত্রে চীনের ৩৭ হাজার ৭৩৫টি, যুক্তরাষ্ট্রের ৭ হাজার ৪০৫টি, ভারতের ৬ হাজার ২৫০টি, রাশিয়ার ৩ হাজার ১৬০টি, সৌদি আরবের ২ হাজার ৪৯৫টি, ইরানের ২ হাজার ১৩৭টি, যুক্তরাজ্যের ২ হাজার ১১০টি, জাপানের ১ হাজার ৮৭২টি এবং পাকিস্তানের ১ হাজার ৫৮৪টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহৃত হিসেবে দেখানো হয়েছে।
অর্থাৎ, গবেষণাপত্র প্রত্যাহার শুধু বাংলাদেশের গবেষণা ব্যবস্থার ঘটনা নয়; এটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকাশনা ব্যবস্থারও একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ।
নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীদের গবেষণাপত্রও প্রত্যাহৃত হয়েছে
আন্তর্জাতিক গবেষণা জগতের উদাহরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিশ্বের সর্বোচ্চ বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতি নোবেল পুরস্কার পাওয়া বিজ্ঞানীদের গবেষণাপত্রও বিভিন্ন সময়ে প্রত্যাহৃত হয়েছে।
রিট্র্যাকশন ওয়াচের তালিকা অনুযায়ী, ২০১৯ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেলজয়ী গ্রেগ সেমেনজা–র ১৫টি, ডেভিড বাল্টিমোর ও লিন্ডা বি. বাকের তিনটি করে এবং টমাস সুদহফ ও জ্যাক ডব্লিউ. সজটাকের দুটি করে গবেষণাপত্র প্রত্যাহৃত হয়েছে। এ ছাড়া ফ্রান্সেস এইচ. আর্নল্ড, ক্যারোলিন আর. বার্তোজি, ব্রুস এ. বিউটলার, বেন ফেরিঙ্গা, তাসুকু হনজো, রবার্ট জে. লেফকোভিৎস, মাইকেল রসবাশ, হ্যারল্ড ই. ভার্মাস, শিনিয়া ইয়ামানাকা ও মাইকেল ডব্লিউ. ইয়াংসহ আরও কয়েকজন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীর অন্তত একটি করে গবেষণাপত্র প্রত্যাহৃত হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছে।
গবেষণা সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব উদাহরণ গবেষণাপত্র প্রত্যাহারকে হালকাভাবে দেখার কারণ নয়; বরং প্রত্যাহারের কারণ ও সংশ্লিষ্ট গবেষকের দায় আলাদাভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। প্রত্যাহারের পেছনে গবেষণায় জালিয়াতি যেমন থাকতে পারে, তেমনি থাকতে পারে অনিচ্ছাকৃত বৈজ্ঞানিক ভুল, তথ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা, লেখকত্ব নিয়ে বিরোধ, প্রকাশনা-সংক্রান্ত জটিলতা কিংবা গবেষণাগারের অন্য কোনো সদস্যের অনিয়ম।
কেন গবেষণাপত্র প্রত্যাহার হয়
গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে তথ্য জাল বা মনগড়া তৈরি, তথ্য বিকৃতি, অন্যের লেখা বা গবেষণা চুরি, একই গবেষণা একাধিক সাময়িকীতে প্রকাশ, লেখকত্ব নিয়ে বিরোধ, গবেষণার নৈতিক অনুমোদনসংক্রান্ত সমস্যা, আপসকৃত বা পক্ষপাতদুষ্ট সহকর্মী পর্যালোচনা, বাণিজ্যিকভাবে তৈরি গবেষণাপত্র প্রকাশ, তথ্য বিশ্লেষণ বা পদ্ধতিগত গুরুতর ভুল এবং অনিচ্ছাকৃত বৈজ্ঞানিক বা পরিসংখ্যানগত ত্রুটি।
অর্থাৎ, সব প্রত্যাহারের নৈতিক গুরুত্ব বা দায়ের মাত্রা এক নয়। কোনো ক্ষেত্রে গবেষণাগত অসদাচরণ থাকতে পারে, আবার কোনো ক্ষেত্রে গবেষক সততার সঙ্গে কাজ করলেও প্রকাশের পর গুরুতর ভুল শনাক্ত হতে পারে।
গবেষণা প্রকাশনা ব্যবস্থায় প্রত্যাহার মূলত প্রকাশিত গবেষণার রেকর্ড সংশোধনের একটি প্রক্রিয়া। তাই ‘প্রত্যাহৃত’ শব্দটি দেখেই সংশ্লিষ্ট গবেষককে জালিয়াত হিসেবে চিহ্নিত করার আগে প্রত্যাহার নোটিশে উল্লেখিত কারণ জানা গুরুত্বপূর্ণ।
সব লেখকের দায় কি সমান?
গবেষণা সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি গবেষণাপত্রের সব লেখকের দায় সবসময় সমান হয় না। নোবেলজয়ী শিনিয়া ইয়ামানাকার গবেষণাগারে কর্মরত এক গবেষকের বিরুদ্ধে তথ্য জাল ও বিকৃতির অভিযোগ ওঠার পর একটি গবেষণাপত্র প্রত্যাহৃত হয়। তদন্তে অন্য লেখকদের সম্পৃক্ততা না মিললেও গবেষণাগারের পরিচালক হিসেবে ইয়ামানাকা নৈতিক দায় স্বীকার করেছিলেন। ঘটনাটি দেখায়, একটি গবেষণাপত্রে একাধিক লেখক থাকলেও তাঁদের ভূমিকা ও দায় একই ধরনের নাও হতে পারে।
প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তও বদলাতে পারে
গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত সবসময় চূড়ান্ত নয়। সাম্প্রতিক এক ঘটনায় পদার্থবিজ্ঞানে ১৯১৮ সালের নোবেলজয়ী ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের দুটি গবেষণাপত্র ২০১১ সালে স্বত্বাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রত্যাহার করা হয়েছিল। পরে স্প্রিঙ্গার নেচারের তদন্তে সেটিকে মানবিক ভুল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশক গবেষণাপত্র দুটি পুনর্বহাল করে এবং প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত বাতিল করে।
নোবিপ্রবির শিক্ষকের বক্তব্য
সম্প্রতি নিজের গবেষণাপত্র প্রত্যাহার প্রসঙ্গে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. মিজানুর রহমান বলেন, “জার্নাল থেকে রিসার্চ পেপার রিট্র্যাক্ট করার ঘটনায় আমাদের শিক্ষার্থী এবং কলিগদের কাছে যাতে কোনো ভুল মেসেজ না যায়, সেজন্য আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করছি।”
সহকর্মী পর্যালোচনা (পিয়ার রিভিউ) প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “লেখকদের পর্যালোচক নির্বাচন, সুপারিশ বা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ ছিল না।”
তিনি আরো বলেন, “রিভিউয়ার কে হবেন, কীভাবে রিভিউ সম্পন্ন হবে এবং পুরো পিয়ার রিভিউ পরিচালনা এর সবটাই জার্নাল কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে থাকে।”
প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তার বক্তব্য, “সাময়িকী কর্তৃপক্ষ তাদের কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ বা বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি এবং তাদের ক্ষেত্রে আপিলের সুযোগও রাখা হয়নি।” লেখকদের শুধু সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত অথবা দ্বিমত পোষণের আনুষ্ঠানিক সুযোগ দেওয়া হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, “জার্নালের ভেতরের কোনো প্রশাসনিক বা পর্যালোচনামূলক ব্যর্থতার দায় গবেষকদের দেওয়া অযৌক্তিক ও অন্যায়।” এ কারণে সাময়িকীর প্রত্যাহার সিদ্ধান্তের সঙ্গে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিমত পোষণ করেছেন বলেও জানান তিনি। তার দাবি, সাময়িকীর মূল প্রত্যাহার নোটিশেও তাদের দ্বিমতের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।
নোবিপ্রবির ইইই বিভাগের শিক্ষক সোহেল রানা বলেন, “বিশ্বের অনেক দেশেই গবেষণাপত্র প্রত্যাহার হয়েছে। অর্থাৎ, প্রত্যাহার একটি বৈশ্বিক বিষয়।”
তিনি বলেন, “সীমিত গবেষণা অনুদান, আধুনিক গবেষণাগার ও যন্ত্রপাতির ঘাটতির মধ্যেও দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-গবেষকেরা গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং তাদের অনেকে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রকাশ করছেন।”
তার ভাষায়, “গবেষণায় অনিয়ম হলে অবশ্যই তদন্ত ও জবাবদিহি হতে হবে। কিন্তু কয়েকটি প্রত্যাহৃত গবেষণাপত্রের কারণে পুরো শিক্ষক সমাজ বা গবেষকদের সততা ও অবদানকে প্রশ্নবিদ্ধ করা ন্যায়সংগত নয়।”
গবেষণা সংশ্লিষ্টদের মতে, গবেষণায় তথ্য জালিয়াতি, তথ্য বিকৃতি, অন্যের গবেষণা চুরি, ভুয়া সহকর্মী পর্যালোচনা কিংবা বাণিজ্যিকভাবে তৈরি গবেষণাপত্রের মতো অনিয়ম প্রমাণিত হলে অবশ্যই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একইসঙ্গে গবেষকদের প্রকাশনা নীতি, তথ্য ব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বশীল গবেষণা আচরণ বিষয়ে আরো প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।
তাদের মতে, বিজ্ঞান একটি স্ব-সংশোধনশীল ব্যবস্থা। নতুন তথ্য, পুনঃবিশ্লেষণ বা প্রকাশনা-পরবর্তী তদন্তে কোনো গুরুতর সমস্যা ধরা পড়লে গবেষণার রেকর্ড সংশোধন করাই এই ব্যবস্থার অংশ। তাই কোনো গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের খবর সামনে এলে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত—‘কেন প্রত্যাহার হয়েছে?’ এরপর দেখা প্রয়োজন প্রত্যাহার নোটিশে কী বলা হয়েছে, সমস্যাটি গবেষণার কোন অংশে ছিল এবং সংশ্লিষ্ট লেখকের ভূমিকা কী ছিল। শুধু ‘রিট্র্যাকটেড’ শব্দটি দেখে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা দেশের গবেষকদের সততা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কতটা যৌক্তিক—সেই প্রশ্নই এখন সামনে আনছেন গবেষণা সংশ্লিষ্টরা।
