অসম প্রেম-বিচ্ছেদ: ধর্মান্তর ও অভিনেত্রীর অন্তর্দ্বন্দ্ব


বিতর্কিত টিভি রিয়েলিটি শো ‘বিগ বস’-এর ১৩তম আসরে পরিচয় অসীম রিয়াজ ও অভিনেত্রী হিমাংশি খুরানার। এ শো শেষ হওয়ার পর সম্পর্কে জড়ান তারা। তারপর কয়েকটি মিউজিক ভিডিওতে একসঙ্গে পারফর্ম করেন। হিমাংশি খুরানা হিন্দু ধর্মের অনুসারী আর অসীম রিয়াজ মুসলিম। চার বছর সম্পর্কে থাকার পর অসম প্রেমের সম্পর্কের ইতি টানেন এই যুগল।   

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে বিচ্ছেদের ঘোষণা দেন অসীম-হিমাংশি। সে সময় এই অভিনেত্রী বলেছিলেন—ধর্মীয় বিশ্বাস ভিন্ন হওয়ার কারণে আমরা আমাদের ভালোবাসাকে ত্যাগ করছি।” পরে আসীমও একই তথ্য নিশ্চিত করেন। কয়েক দিন আগে পারাস ছাবরার পডকাস্টে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন হিমাংশি খুরানা। এ আলাপচারিতায় ধর্মান্তর, আধ্যাত্মিকতা, বিশ্বাস ও অন্তর্দ্বন্দ্ব নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন এই অভিনেত্রী। 

অসীম রিয়াজের সঙ্গে অসম প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন হিমাংশি খুরানা। ভিন্ন ধর্মের হওয়ায় সম্পর্কের ইতি টানেন তারা। 


এ আলাপচারিতায় হিমাংশি খুরানা কখনো অসীম রিয়াজের নাম উল্লেখ করেননি। বরং ‘পার্টনার’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। পার্টনার তাকে ধর্মান্তরিত হওয়ার কথা বলেছিলেন। এ তথ্য উল্লেখ করে হিমাংশি খুরানা বলেন, “সে তার ধর্মের ভালো দিকগুলো সম্পর্কে আমাকে বলত। প্রত্যেক মানুষই নিজের ধর্মের ভালো বিষয়গুলোই বলে থাকেন, এটা দোষের কিছু নয়। তারা চেয়েছিল বিষয়গুলো বুঝি এবং গ্রহণ করি। কিন্তু এটা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। তার কোনো দোষ ছিল না, সে কখনো আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ করেনি। কিন্তু এটা ছিল আমার সিদ্ধান্ত—আমি এ ধরনের কিছু করতে চাইনি।”

হিমাংশি খুরানা


ধর্মান্তরের বিষয়টি অসীম-হিমাংশির আলোচনায় উঠে এসেছিল তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। একটা সময়ে এই দ্বন্দ্ব হিমাংশির অন্তর্দ্বন্দ্বে রূপ নিয়েছিল। তা স্মরণ করে এই অভিনেত্রী বলেন, “আমার মনে হয়েছিল—আমি আমার ঈশ্বরের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছি।”

হিমাংশির মনে হয়েছিল, ধর্মান্তরিত হলে আর আগের ধর্ম পালন করতে পারবেন না। তা স্মরণ করে এই অভিনেত্রী বলেন, “আমার মনে হয়েছিল, এরপর হয়তো আমি আর এসব (নিজ ধর্ম পালন) করতে পারব না। তাই বলেছিলাম, তার আগে চারধাম ও সব তীর্থস্থান ঘুরে দেখতে চাই। কারণ এরপর তাদের সঙ্গে আর দেখা করতে পারব না। মনে হচ্ছিল, আমি যেন বিদায় জানাচ্ছি।”

মন যখন বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছিল, তখন ধর্মীয় স্থানগুলোতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন হিমাংশি খুরানা


ধর্ম পরিবর্তন করলে ছোটবেলা থেকে বেড়ে ওঠার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিশ্বাস ও ধর্মীয় অনুশীলনগুলো হয়তো আর অনুসরণ করতে পারবেন না। তাই নিজের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা ধর্মীয় স্থানগুলোতে যাওয়ার ইচ্ছা তৈরি হয়েছিল হিমাংশির। নিজের ধর্মকে বিদায় জানানোর এই চিন্তাই তাকে আরো গভীরভাবে প্রশ্ন করতে বাধ্য করে। প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে তিনি বলেন, “এই প্রশ্নটা যে আমার মনে উঠল, সেটাই তো একটা বড় ব্যাপার। কেন মনে হলো—আমি আমার ঈশ্বরকে বিদায় জানাচ্ছি?”

এরপর হিমাংশি নিজেকে প্রশ্ন করতে শুরু করেন, নিজের শৈশব ও বেড়ে ওঠার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা বিশ্বাসগুলোকে দমিয়ে রেখে সত্যিই কি অন্য একটি ধর্মের নিয়মকানুন ও আচার-অনুষ্ঠান অনুসরণ করতে পারবেন? তার ধর্মবিশ্বাস এমন কোনো বিষয় নয়, যা ইচ্ছা করলেই বন্ধ করে দেওয়া যায়। কারণ তা তার অভ্যাস, অনুভূতি, সংস্কার ও বেড়ে ওঠার সঙ্গে গভীরভাবে মিশে গেছে। এমনকি, অন্য কারো ধর্মীয় আচারে অংশ নেওয়াটাও বিশ্বাসঘাতকতার মতো মনে হবে কি না, তা-ও মনে হয়েছিল এই অভিনেত্রীর। 

হিমাংশির ধর্ম বিশ্বাস সম্পর্কিত সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়েছেন তার পার্টনার অসীম রিয়াজ 


পার্টনারের সঙ্গে কথোপকথনের স্মৃতি উল্লেখ করে হিমাংশি খুরানা বলেন, “আমি তাকে বলেছিলাম—আমি যদি তোমার ঈশ্বরের সামনে মাথা নত করি, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আমার মুখ থেকে ‘ওয়াহেগুরু’ বেরিয়ে আসবে। সেটাও তো এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা হবে। আর এটা তো আমার ভেতরেই আছে, আমি এটাকে কীভাবে মুছে ফেলব?”

হিমাংশির পার্টনার যদি তার ধর্ম পরিবর্তন করেন, তাহলে কী ঘটত—তা ব্যাখ্যা করে এই অভিনেত্রী বলেন, “আমরা যদি পরিস্থিতিটা উল্টো করে দেখি, তাহলেও তার পক্ষে এটা করা সম্ভব হতো না। এটা সম্ভব নয়। কারণ ছোটবেলা থেকেই আমরা এসব অনুসরণ করে আসছি। যেটাই হোক না কেন, এসব আমাদের ভেতরে গেঁথে আছে।”

কিন্নর কৈলাস দর্শনে গিয়ে ভীষণ কেঁদেছিলেন হিমাংশি


কোন ধর্ম সঠিক আর কোন ধর্ম ভুল, বিষয়টি তা নয়। বরং নিজের পরিচয়ের অংশ হয়ে যাওয়া বিশ্বাসকে হঠাৎ করে ছেড়ে দেওয়া কতটা কঠিন, তা হিমাংশির কাছে মূল ব্যাপার। তিনি বলেন, “এরপর আমার মনে প্রশ্ন এলো—আমাকে কি দাহ করা হবে, না কি কবর দেওয়া হবে? প্রশ্নটা আমার অবচেতন মন থেকে এসেছিল। প্রত্যেক মানুষের নিজের পছন্দ থাকতে পারে। আমি বিশ্বাস করি, প্রত্যেক মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতাও থাকা উচিত।”

এসব প্রশ্নের মধ্য দিয়ে হিমাংশি উপলব্ধি করেন, তাকে নিজের সম্পর্কে আরো গভীরভাবে জানতে হবে। সেই উপলব্ধি থেকে বিভিন্ন ধর্মীয় স্থান ও তীর্থযাত্রার দিকে ঝুঁকে পড়েন এই অভিনেত্রী। কিন্নর কৈলাশে যাওয়ার কথা স্মরণ করে তিনি জানান, এটি ছিল তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন যাত্রাগুলোর একটি। সেই সময়ে তার পার্টনার এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছিলেন বলেও জানান তিনি। 

হিমাংশি বিশ্বাস করেন, প্রত্যেক মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা থাকা উচিত


কিন্নর কৈলাসে পৌঁছানোর পর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি হিমাংশি খুরানা। তিনি বলেন, “সেখানে পৌঁছানোর পর কেঁদে ফেলেছিলাম। আমি খুব কেঁদেছিলাম।” সেই যাত্রা শুধু আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতাই ছিল না, বরং নিজের পরিচয়কে নতুন করে বোঝার পথও খুলে দিয়েছিল। হিমাংশি খুরানা বলেন, “আমার চিন্তাগুলো আমাকে বলছিল—আমি কে, তা জানতে হবে। তখন যদি এসব প্রশ্ন না আসত, তাহলে এটা উপলব্ধিই করতে পারতাম না। আমার অবচেতন মন ভীষণ সজাগ হয়ে উঠেছিল।”

*এনডিটিভি অবলম্বনে





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *