আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন দুদকের প্রথম মামলা, পদ্মা ব্যাংকের এমডিসহ ১০ জন আসামি
দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম মামলার অনুমোদন দিয়েছে এ কে এম আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন, যেখানে ঋণ আত্মসাতের অভিযোগে আসামি করা হয়েছে পদ্মা ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ১০ জনকে।
রোববার দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম সাংবাদিকদের নতুন কমিশনের প্রথম মামলা অনুমোদনের বিষয়ে জানান।
তিনি বলেন, ‘‘জাল কাগজপত্র বানিয়ে এম এইচ এন্টারপ্রাইজের মালিক মমিনুর রহমানের নামে ১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা ঋণ মঞ্জুর ও আত্মসাতের অভিযোগে অনুসন্ধান করে দুদক। মমিনুরের অভিযোগের ভিত্তিতেই অনুসন্ধান শুরু হয়েছিল। তবে অনুসন্ধানে দুদক তারও সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে বলে জানান আকতারুল।’’
তিনি বলেন, ‘‘মমিনুরের ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা না থাকার পরও ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে তার নামে ঋণ দেওয়া হয়েছিল বলে অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে। এ কারণে অভিযোগকারী মমিনুরসহ সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তা ও অন্যদের বিরুদ্ধে মামলা করার অনুমোদন দিয়েছে কমিশন।’’
মামলার অনুমোদনপত্রে বলা হয়েছে, অনুসন্ধান দলের প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করে ১০ জনের বিরুদ্ধে একটি নিয়মিত মামলা করার অনুমোদন দিয়েছে কমিশন।
আসামিদের মধ্যে মমিনুর রহমান এম এইচ এন্টারপ্রাইজের মালিক। আরেক আসামি মো. অজিত উল্লাহ।
পদ্মা ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল মোতালেব পাটওয়ারীকেও আসামি করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
অন্য আসামিদের সবাই পদ্মা ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা। তারা হলেন গুলশান সাউথ এভিনিউ শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক ও সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট জর্জ কর্নেলিয়াস গমেজ, সাবেক ক্রেডিট ইনচার্জ রাসেল মিয়া এবং সাবেক ম্যানেজার অপারেশন এম আতিফ খালেদ।
প্রধান কার্যালয়ের সাবেক ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট আমেনা বেগমও আসামির তালিকায় রয়েছেন।
এ ছাড়া বসুন্ধরা শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শামছুল হাসান ভূঞা, সাবেক ম্যানেজার অপারেশন মাহবুব আহমদ এবং সাবেক ক্রেডিট ইনচার্জ মো. কাওসার হোসেনকে বিবাদী করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ কী
দুদকের অনুসন্ধান নথিতে অভিযোগের বিষয় হিসেবে বলা হয়েছে, “জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে অভিযোগকারীর নামে নিজেরাই ১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা ঋণ মঞ্জুর করে আত্মসাতের অভিযোগ।”
২০২৪ সালে অভিযোগটির অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল দুদকের মানিলন্ডারিং বিভাগের উপপরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমানকে। অনুসন্ধান শেষে প্রতিবেদন কমিশনের কাছে জমা দেওয়া হয়। তার ভিত্তিতেই এ মামলার অনুমোদন দিল কমিশন।
১০ জনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯, ১০৯, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারায় মামলা করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এসব ধারা বিশ্বাসভঙ্গ, অপরাধে সহায়তা, প্রতারণা, জাল দলিল তৈরি এবং জাল দলিল ব্যবহারের অভিযোগসংক্রান্ত।
এর সঙ্গে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ধারা যুক্ত করা হয়েছে।
নতুন কমিশনের প্রথম মামলা
আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামানকে ১৭ আগস্ট দুদকের চেয়ারম্যান পদে বসায় সরকার। একই সঙ্গে কমিশনার করা হয় জাহাঙ্গীর আলম খান ও সাজ্জাদ হোসেন ভূইয়াকে। এর মধ্য দিয়ে ১৬৬ দিন পর দুদকের নেতৃত্বের শূন্যতা কাটে।
নতুন চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার ১৮ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে যোগদানের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেন। পরের দিন তারা দুদক কার্যালয়ে গিয়ে কাজ শুরু করেন।
আগের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন এবং দুই কমিশনার ৩ মার্চ পদত্যাগ করার পর থেকে কমিশনের শীর্ষ তিন পদ খালি ছিল।
কাজের প্রথম দিন সাংবাদিকদের সামনে এসে আসাদুজ্জামান বলেছিলেন, নতুন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করতে চায় এবং তারা কোনো চাপের মধ্যে নেই। এর চার দিনের মাথায় রোববার ১ কোটি ৯৫ লাখ টাকার ঋণ আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করার এই অনুমোদন এল।
ফারমার্স থেকে পদ্মা ব্যাংক
পদ্মা ব্যাংকের আগের নাম ছিল ফারমার্স ব্যাংক। ২০১৩ সালে যাত্রা শুরু করা ব্যাংকটি কয়েক বছরের মধ্যেই ঋণ অনিয়ম ও আর্থিক সংকটে পড়ে।
পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তনের পর ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনে নাম পরিবর্তন করে পদ্মা ব্যাংক করা হয়।
ব্যাংকটিকে আর্থিক সংকট থেকে বের করে আনতে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক এবং ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের মাধ্যমে ৭১৫ কোটি টাকা মূলধন দেওয়া হয়েছিল। ওই অর্থ তখন ব্যাংকটির মোট মূলধনের প্রায় ৬৬ শতাংশ ছিল।
ফারমার্স ব্যাংকের সময় থেকেই প্রতিষ্ঠানটির ঋণ বিতরণ নিয়ে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। নতুন নাম নেওয়ার পরও পদ্মা ব্যাংকের বিভিন্ন ঋণ ও আর্থিক লেনদেন নিয়ে দুদকের অনুসন্ধান হয়েছে।
বাংলাদেশ জার্নাল/এনএম
