ইন্দোনেশিয়ার আগুনের ধোঁয়ায় বিপাকে মালয়েশিয়া


ইন্দোনেশিয়ার বন ও পিটভূমির আগুনের ধোঁয়ায় বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে মালয়েশিয়ার বোর্নিও দ্বীপের বাতাস। কোথাও কোথাও বায়ুদূষণের মাত্রা সহনসীমার চারগুণ ছাড়িয়ে গেছে। এতে শ্বাসকষ্ট ও হাঁপানির রোগী বাড়ছে। বিরূপ পরিস্থিতির কারণে সারাওয়াকে স্বাধীনতা দিবসের খোলা জায়গার অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। বন্ধ হয়েছে শত শত স্কুলও।

ইন্দোনেশিয়ার কালিমান্তান অঞ্চলের আগুনের ধোঁয়া এসে জমেছে একই দ্বীপের মালয়েশীয় অংশ সারাওয়াকে। আগস্টের বেশিরভাগ সময়েই সেখানে ধোঁয়া ছিল। পরে তা মালয়েশিয়া, ব্রুনেই ও সিঙ্গাপুরেও ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৫ সালের পর অঞ্চলটিতে এটিই সবচেয়ে ভয়াবহ ধোঁয়াশার ঘটনা।

বাতাসের মান পেরিয়েছে বিপদসীমা

মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সারাওয়াকের ছয়টি এলাকায় বায়ুদূষণের মাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছায়। মালয়েশিয়ার এয়ার পলিউট্যান্ট ইনডেক্সে বায়ুদূষণের মাত্রা ১০০-এর বেশি হলে অস্বাস্থ্যকর ধরা হয়। কিন্তু রাজ্যটির রাজধানী কুচিংয়ে তা এখন ৪০৭-এ পৌঁছে গেছে এবং কালিমান্তান সীমান্তের কাছের শহর সেরিয়ানে ৪০৮-এ।

কুচিংয়ের বাসিন্দা ৩৩ বছর বয়সী মিয়া এমিলিয়া হাসান জানান, চারপাশের বাতাস এত ঘন হয়ে গেছে যে ধোঁয়ার গন্ধ এড়ানোর উপায় নেই। একই সঙ্গে সবকিছুই সাদা হয়ে আছে। বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটারের বেশি কিছুই দেখা যাচ্ছে না। এক মাসের বেশি সময় ধরে তারা নীল আকাশ দেখেননি বলে আক্ষেপ করেন তিনি।

হাসানের ১০ মাস বয়সী একটি মেয়ে আছে। সম্প্রতি ফুসফুসের সংক্রমণ নিয়ে সে হাসপাতালে ভর্তি ছিল। বাড়ি ফেরার পরও ধোঁয়ার কারণে শিশুটির সুস্থ হতে সমস্যা হচ্ছে। পুরো মাসজুড়েই শিশুটিকে ওষুধ খেতে হয়েছে। কাশির পাশাপাশি বমিও হচ্ছে। শ্বাস নিতে না পারায় দুইবার তাকে জরুরি বিভাগে নিতে হয়েছে বলে জানান তিনি।

বাড়ছে হাঁপানি ও চোখ ওঠার রোগী

মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ধোঁয়াশার কারণে দেশজুড়ে বিভিন্ন রোগের প্রকোপ বেড়েছে। ২৩ থেকে ২৯ আগস্ট পর্যন্ত এক সপ্তাহে হাঁপানির রোগী বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮১১ জনে। এর আগের সপ্তাহে এ সংখ্যা ছিল মাত্র ২১৯। একই সময়ে চোখ ওঠার রোগী ১৪৬ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২০ জনে।

ধোঁয়াশার কারণে সারাওয়াকে স্বাধীনতা দিবসের খোলা জায়গার অনুষ্ঠানও বাতিল করা হয়েছে। রাজ্যের উপপ্রধানমন্ত্রী ডগলাস উগাহ এমবাস সতর্ক করে বলেছেন, বায়ুদূষণের মাত্রা ৫০০ ছাড়ালে স্থানীয় জরুরি অবস্থা জারি করা হবে। তখন জরুরি সেবাগুলো ছাড়া সব সরকারি-বেসরকারি কার্যালয় বন্ধ রাখা হবে।

স্কুলগুলোতেও এর প্রভাব পড়তে দেখা গেছে। মন্ত্রণালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, মাত্রা ১০০-তে পৌঁছালেই বাইরের কার্যক্রম বন্ধ করতে হয়। ২০০-তে পৌঁছালে স্কুল বন্ধ করতে হয়। এ কারণে ২০ ও ২১ আগস্ট কুচিং ও এর আশপাশের প্রায় ৬০০ স্কুল বন্ধ ছিল। এতে প্রায় দুই লাখ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

ইন্দোনেশিয়ায় বাড়ছে আগুন

ধোঁয়ায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে ইন্দোনেশিয়ায়। দেশটির উপস্বাস্থ্যমন্ত্রী দান্তে সাকসোনো হারবুওনো জানিয়েছেন, জুলাই ও আগস্টে প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ মানুষ শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের চিকিৎসা নিয়েছেন। বোর্নিও ও সুমাত্রা দ্বীপে প্রায় ৫৫ লাখ মানুষ সরাসরি ধোঁয়ার সংস্পর্শে এসেছেন।

ইন্দোনেশিয়া সরকারের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বোর্নিও ও সুমাত্রায় দুই লাখ হেক্টরের বেশি এলাকা আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। শুধু জুলাইয়েই পুড়েছে প্রায় ৯৫ হাজার হেক্টর এলাকা। পশ্চিম কালিমান্তানে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। গত সোমবার সেখানে হটস্পটের সংখ্যা বেড়ে ৭ হাজার ৩৭৭ এবং সক্রিয় আগুনের সংখ্যা ১০৪ হয়েছে। মধ্য কালিমান্তানেও ৫ হাজারের বেশি হটস্পট শনাক্ত করা হয়েছে।

এসব আগুনের বড় অংশই ইচ্ছাকৃতভাবে লাগানো হয় বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা। পাম তেল, কৃষিকাজ এবং পাল্প ও কাগজ উৎপাদনের জন্য জমি পরিষ্কার করতে বন ও কার্বনসমৃদ্ধ পিটভূমিতে আগুন দেওয়া হয়। এ ধরনের আগুন দেওয়া ইন্দোনেশিয়ায় বেআইনি। সম্প্রতি আগুন লাগানোর অভিযোগে ৭২ জনকে গ্রেফতার করেছে দেশটির পুলিশ।

পরিস্থিতি আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা

এদিকে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এবার দীর্ঘস্থায়ী আগুনের মৌসুম আসতে পারে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকেরা। ইউনিভার্সিটি অব মালয়ার গবেষক হেলেনা ভার্কি বলেন, এল নিনোর শক্তি বাড়লে অঞ্চলটিতে আরও গরম ও শুষ্ক পরিস্থিতি তৈরি হবে। তাতে আগুনের আঞ্চলিক প্রভাব আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

টানা বৃষ্টিই কেবল মাটিকে যথেষ্ট ভিজিয়ে এই আগুন পুরোপুরি নেভাতে পারে। বৃষ্টি না আসা পর্যন্ত পরিস্থিতি সামলাতে মানবীয় উদ্যোগ খুব বেশি কার্যকর হবে না বলে মনে করেন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা। সেপ্টেম্বরের শেষ অথবা অক্টোবরের মধ্যে পর্যাপ্ত বৃষ্টি শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সূত্র: আল-জাজিরা
এমআরএইস/কেএএ/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *