ইবনুল আরাবির প্রেমগাথা | প্রথম আলো


রূপ ও গুণের বর্ণনা

প্রেয়সীর রূপ বর্ণনায় ইবনুল আরাবি কোনো সংকোচ করেননি। নিজামের আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষতা বয়ানের পাশাপাশি তিনি নির্দ্বিধায় তাঁর শারীরিক সৌন্দর্যের বর্ণনাও ফুটিয়ে তুলেছেন। তরজুমান আল আশওয়াক্বের নানা ছত্রে তিনি নিজামের মধুময় অধরোষ্ঠ, উন্নত বক্ষ, কুমারীসুলভ লাজুকতা ও আবেগী মনোভাবের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। নিজামের এ সৌন্দর্যকে কবি মহান স্রষ্টার ঐশ্বরিক উপহার হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আর তাই নিজামকে পাওয়ার বাসনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রূপ নেয় স্রষ্টাকে পাওয়ার আকুলতায়। স্রষ্টার পরম সৌন্দর্য যেন প্রতিভাত হয় নিজামের আয়নায়!

নিজামের গুণের বয়ান দিতে গিয়ে তরজুমান আল আশওয়াক্বের ভূমিকায় ইবনুল আরাবি লেখেন—‘তিনি একজন দরবেশ ও তপস্বী। দুই পবিত্র নগরীর (মক্কা ও মদিনা) আধ্যাত্মিক শিক্ষক। তিনি কথা বললে সবাই চুপ হয়ে যায়। যখন সংক্ষেপে বলেন, স্বকীয় শৈলীতে বলেন, আর যখন অধিক বলেন, তখন তা হয় প্রাঞ্জল। জ্ঞানীদের মাঝে তিনি এক জ্যোতিষ্ক, মার্জিতদের মাঝে এক সুদৃশ্য বাগানসদৃশ। তিনি নিখুঁতভাবে তৈরি হারের মূল রত্নটির মতো। তিনি অতুলনীয়, সবচেয়ে দামি।’ ইবনুল আরাবি নিজামকে তাঁর কবিতায় পরিপূর্ণ সৌন্দর্যের এক প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। বোধ, শিক্ষা, আধ্যাত্মিকতা, অন্তর্নিহিত ও বাহ্যিক সৌন্দর্যে যে অতুলনীয়৷ নিজামের সৌন্দর্যে অবগাহনের মাধ্যমে ইবনুল আরাবি স্রষ্টার পরম সৌন্দর্যকে অবলোকন করতে চেয়েছিলেন। তিনি লেখেন—‘কামনায় মরে যাই, আবেগেতে গলি; আমার যে দশা, তাঁরও তো সেই একই!’ তরজুমান আল আশওয়াক্বের কবিতাগুলোতে কবি নিজামকে নানাভাবে বর্ণনা করেছেন। কখনো তিনি রক্ত–মাংসের নারী, কখনো–বা স্বপ্ন, কখনো আবার মরীচিকা! তিনি আছেন, আবার নাই! কিংবা তাঁর না থাকাই যেন তাঁর বেশি করে থাকা! তিনি নির্দয়, আবার সহানুভূতিশীল! প্রতিনিয়ত তিনি কবিকে বাধ্য করেন হৃদয়ের গহিনে তাঁর সতত উপস্থিতিকে উপলব্ধি করতে। নিজাম সপরিবারে মক্কায় বসবাস করলেও তাঁর শিকড় ছিল পারস্যে, বর্তমান ইরাকে। নিজামের সঙ্গে ইবনুল আরাবির প্রণয়ে বিরহভাব ছিল প্রবল। একটি কবিতার অংশবিশেষ এমন—‘তিনি ইরাকের মেয়ে, আমার ইমামের মেয়ে, বিপরীতে আমি ইয়েমেনের ছেলে। কেউ কি কখনো শুনেছ তেলে আর জলে মিলন হতে!’ এ পঙ্‌ক্তিগুলোতে নিজামকে না পাওয়ার বেদনার বয়ান দেওয়ার পাশাপাশি আরব ও অনারবের যে বৈপরীত্য সেটির দিকেও সূক্ষ্মভাবে ইঙ্গিত করলেন কি ইবনুল আরাবি? ইবনুল আরাবির কাছে নিজাম এমন এক আলো যা প্রেমিকের হৃদয়কে আলোকিত করে। তরজুমান আল আশওয়াক্বের কিছু কবিতায় কবি নিজামের মুখ দিয়েও বলিয়েছেন। তেমনই এক কবিতায় নিজাম ইবনুল আরাবিকে উদ্দেশ করে বলছেন—‘তাঁর হৃদয়ে আমার সতত বসতি, এটাই কি তাঁর জন্য যথেষ্ট নয়? বলো, বলো, এটাই কি তাঁর জন্য যথেষ্ট নয়?’ আরেকটি কবিতায় নিজাম বলছেন—‘আমাকে প্রেমিকদের সম্পর্কে বলো, না না, তুমি নিজেই বরং প্রেমিক হয়ে যাও, এমন প্রেমিক, যাঁর তালাশে থাকেন স্বয়ং প্রেমাস্পদ! তোমার উচ্চারণ তখন হবে আগুনের মতো, প্রজ্বলিত আগুন—সমস্ত কোলাহল আর নীরবতার ঊর্ধ্বে!’ নিজামকে উদ্দেশ করে ইবনুল আরাবি লিখেছেন—‘তাঁর দর্শনে অন্ধকার রজনী মোর আলোকিত হয়, তাঁর কেশরাজির অন্তরালে উজ্জ্বল দিন মোর আঁধারে হারায়!’ অন্যত্র তিনি লেখেন—‘তাঁর ঝলমলে উপস্থিতি যেন সূর্য, তার দীঘল চুল যেন রাত; সূর্য আর রাতের মিলন হলো!’ তরজুমান আল আশওয়াক্বের কিছু কবিতা নিজাম ও ইবনুল আরাবির মাঝে সংলাপ আকারে হাজির হয়েছে। তেমনই একটি নমুনা—ইবনুল আরাবি: তিনি (নিজাম) ছিলেন রহস্যে আবৃত, তিনি ছিলেন আমার চোখের আকর্ষণ, তিনি ছিলেন এক নারী, আমার হৃদয়ের বাসনা। নিজাম: আমাকে বলা হয়েছে রহস্যময়! আমার মাঝেই তাঁর চোখ দেখতে শিখেছে। আমি ছিলাম এক নারী।

নিজের রচনাবলির মধ্যে তরজুমান আল আশওয়াক্ব ইবনুল আরাবির কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করত। জীবনের শেষদিকে তিনি দামেস্কে এক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর প্রাত্যহিক সভায় তরজুমান আল আশওয়াক্বের কবিতাগুলো আবৃত্তি করা হতো; আর তা আবৃত্তি করতেন স্বয়ং ইবনুল আরাবি!



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *