গুমের পুনরাবৃত্তি চিরতরে বন্ধ করাই আমাদের দায়িত্ব: ইশরাক


মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন বলেছেন, “গুমের পুনরাবৃত্তি চিরতরে বন্ধ করা, সত্য উদ্ঘাটন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের প্রতিকার ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।”

রবিবার (৩০ আগস্ট) বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস-২০২৬-এর অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, “১৯৭১ সালে এই জাতি একবার মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী রাতের অন্ধকারে মানুষকে তুলে নিয়ে যেত। বুদ্ধিজীবীদের অপহরণ করে হত্যা করা হয়েছিল। বাঙালির স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। বিচারহীন আটক, নির্যাতন ও নির্মম দমন চালানো হয়েছিল। সেদিনও রাষ্ট্রীয় শক্তি মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে পদদলিত করেছিল। সেদিনও মায়েরা সন্তানের খোঁজে ঘুরেছেন। অনেক পরিবার আর কখনো তাদের প্রিয়জনকে ফিরে পায়নি।”

তিনি বলেন, “মহান মুক্তিযুদ্ধের সেই চেতনা পরবর্তী প্রজন্মকে দাঁড়াতে শিখিয়েছে। ফ্যাসিবাদী আওয়ামী শাসনের বিরুদ্ধে যে দীর্ঘ সংগ্রাম চলেছে, তা এই চেতনা থেকেই শক্তি নিয়েছে। কারণ অত্যাচারের ধরন একই ছিল।”

ইশরাক হোসেন বলেন, “দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে সেই ফ্যাসিবাদী শাসনে ২ হাজারেরও বেশি মানুষকে অবৈধভাবে তুলে নেওয়া হয়েছিল। রাজনৈতিক নেতা, কর্মী, সাংবাদিক, ছাত্র—যারাই প্রতিবাদ করেছিলেন, তাদের অনেককে রাতের আঁধারে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শত শত মানুষ আর কখনো বাড়ি ফেরেননি। তাদের ভাগ্য আজও অজানা।”

তিনি বলেন, “তাদের পরিবারগুলো আজ এই কক্ষে উপস্থিত। তাদের অপেক্ষা, তাদের নীরব কান্না কোনো বিমূর্ত ঘটনা নয়। এটা একটি জাতির ক্ষত। মৃত্যুর সংবাদ মানুষকে অন্তত শোক করার সুযোগ করে দেয়। কিন্তু গুম একজন মানুষকে তার প্রিয়জনের জন্য শোক করার অধিকারটুকুও কেড়ে নেয়। এই অনিশ্চয়তা, এই অন্তহীন অপেক্ষা নিজেই এক ধরনের নির্মম নির্যাতন।”

প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আমরা শুধু গুম হওয়া মানুষদের স্মরণ করতে আসিনি। আমরা এসেছি তাদের পরিবারের সত্য জানার অধিকার, ন্যায়বিচারের অধিকার এবং রাষ্ট্রের কাছে জবাব পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করতে।”

তিনি বলেন, “গুম শুধু একটি অপরাধ নয়। গুম হলো রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর রূপ। মানুষকে আইনের আওতার বাইরে নিয়ে যাওয়া, তার অস্তিত্ব অস্বীকার করা এবং পরিবারগুলোকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে রাখা—এটা ১৯৭১ এর হানাদার বাহিনীর পদ্ধতিরই পুনরাবৃত্তি। তখনও মানুষকে তুলে নিয়ে নির্যাতন করা হতো। পরেও গোপন কক্ষে, আয়নাঘরে মানুষকে বছরের পর বছর আটকে রাখা হয়েছিল। তখনও প্রতিবাদী কণ্ঠকে স্তব্ধ করা হয়েছিল। সত্য বলার সাহসকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বলেন, “মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় শুধু ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। যেসব মানুষ গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদার জন্য জীবন দিয়েছেন, যাদের গুম করা হয়েছে, যাদের পরিবার আজও অপেক্ষা করছে, তাদের ত্যাগও মুক্তিযুদ্ধের চেতনারই অংশ।”

তিনি বলেন, “সেই চেতনাকে ধারণ করে আমরা নিখোঁজ, নির্যাতিত ও বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছি। রাষ্ট্র তাদের স্বীকৃতি দেবে, চিকিৎসা দেবে, আইনি সহায়তা দেবে এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবে, ইনশাআল্লাহ।”

ইশরাক হোসেন বলেন, “বাংলাদেশ ইতিমধ্যে জাতিসংঘের গুমবিরোধী সনদে যোগ দিয়েছে। গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য আইন প্রণয়নের কাজ জাতীয় সংসদে এগোচ্ছে। আমরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, সত্য উদ্ঘাটিত হবে, দায়ীরা বিচারের মুখোমুখি হবেন এবং এমন অন্ধকার আর ফিরে আসতে পারবে না।”

নিখোঁজ পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আপনাদের কষ্ট আমরা অনুভব করি। আপনারা যে সাহস নিয়ে বছরের পর বছর প্রিয়জনের খোঁজ করেছেন, সেই সাহসই এই জাতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে।”

প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আজ আমাদের সামনে চারটি দায়িত্ব অত্যন্ত স্পষ্ট—সত্য উদ্ঘাটন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের প্রতিকার ও পুনর্বাসন এবং এই অপরাধের পুনরাবৃত্তি চিরতরে বন্ধ করা।”

তিনি বলেন, “যে অন্যায়, নিপীড়ন ও অধিকারহীনতার বিরুদ্ধে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছিলেন, সেই অন্যায়ের পুনরাবৃত্তি এই স্বাধীন বাংলাদেশে আর হতে দেওয়া হবে না।”

তিনি বলেন, “যারা ফিরে এসেছেন তাদের প্রতি আমাদের সম্মান। যারা এখনো ফেরেননি, তাদের আমরা ভুলব না। যাদের জীবন কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তাদের ন্যায়বিচারের দাবি আমরা ছাড়ব না। আর তাদের পরিবারকে আমরা বলতে চাই, বাংলাদেশের মাটিতে আর কখনো গুমকে রাষ্ট্র পরিচালনার হাতিয়ার হতে দেওয়া হবে না।”

ইশরাক হোসেন বলেন, “অতীতের অপরাধের তদন্ত ও বিচার করা মানে কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে অসম্মান করা নয়। আমাদের সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থায় অসংখ্য দেশপ্রেমিক, সৎ ও পেশাদার সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। তবে যারা অপরাধ করেছে, যারা বেআইনি নির্দেশ দিয়েছে এবং যারা জেনেশুনে সেই নির্দেশ বাস্তবায়ন করেছে, দায় কেবল তাদের।”

তিনি বলেন, “রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষার পথ অপরাধ গোপন করা নয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষার পথ হলো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা, পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। জবাবদিহিতা কোনো বাহিনীকে দুর্বল করে না। জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠানকে আরো শক্তিশালী ও সম্মানিত করে।”

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বলেন, “মানবিক মর্যাদা, গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের বাংলাদেশই হোক আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত উত্তরাধিকার।”

তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। গুমের শিকার সব মানুষের প্রতিও গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, “মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হোক, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হোক এবং বাংলাদেশ আরো মানবিক, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে যাক।”

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সভাপতিত্ব করেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান।





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *