ছাত্রদলে নতুন নেতৃত্ব শিগগির, শীর্ষ পদে আলোচনায় যারা 


বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন নেতৃত্ব ঘোষণার প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ও ছাত্রদলের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, সবকিছু ঠিক থাকলে আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহেই নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে। তবে, ৩ আগস্টের জাতীয় ছাত্র সমাবেশ স্থগিত হওয়ার পর নতুন কমিটি নিয়ে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। কেউ বলছেন, ১৭ আগস্টের মধ্যেই কমিটি হতে পারে, আবার কেউ মনে করছেন ঘোষণার সময় যদি আরো পিছিয়ে যায় তাহলে সেপ্টেম্বরেও কমিটি হবে না।

বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতা জানিয়েছেন, নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং ক্লিন ইমেজকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। 

অন্যদিকে, শীর্ষ পদপ্রত্যাশীরা শেষ মুহূর্তের তৎপরতা, জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন।

২০২৪ সালের ১ মার্চ মো. রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সভাপতি এবং নাছির উদ্দীন নাছিরকে সাধারণ সম্পাদক করে সাত সদস্যের আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। পরে একই বছরের ১৫ জুন ৩৯ জন সহ-সভাপতি ও ১১১ জন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকসহ মোট ২৬০ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়। বর্তমান কমিটির অধীনে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ, বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা, মহানগর ও মেডিকেল কলেজসহ শতাধিক সাংগঠনিক ইউনিট পুনর্গঠন করা হয়। ২০২৬ সালের ১ মার্চ কমিটির নির্ধারিত দুই বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ায় নতুন নেতৃত্ব গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে বিএনপির হাইকমান্ড।

সূত্র জানায়, পদপ্রত্যাশী নেতারা এখন জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছেন। অতীতের সাংগঠনিক ভূমিকা, দলের জন্য ত্যাগ, ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জেল-জুলুম ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার পাশাপাশি বর্তমান সরকারের জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত থেকে নিজেদের সক্রিয়তা প্রমাণের চেষ্টা করছেন। অনেকে নিজ নিজ ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের কল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা ও তা গণমাধ্যমে প্রচারের দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন। তবে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং দলের নীতিনির্ধারণী মহলের বিবেচনার ওপর নির্ভর করবে।

সভাপতি পদে ২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে আনোয়ার পারভেজ ও শ্যামল মালুমের নাম আলোচনায় আছে। ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে বর্তমান কমিটির যুগ্ম সম্পাদক রিয়াদ রহমান, এইচ এম আবু জাফর, এজাজুল কবির রুয়েল এবং মঞ্জুরুল আলম রিয়াদ আলোচনায় আছেন। ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষ থেকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান, আমানুল্লাহ আমান এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেনের নাম আলোচনায় আছে।

অন্যদিকে, সাধারণ সম্পাদক পদে ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষ থেকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তরিকুল ইসলাম তারিক, সহ-সভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার অনিকের নাম আলোচনায় আছে। ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষ থেকে সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাজু আহামেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন, গাজী সাদ্দাম হোসেন, ইব্রাহিম খলিল এবং তারেক হাসান মামুন সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন। ২০১২-১৩ সেশন থেকে ঢাবি ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক নূর আলম ভূঁইয়া ইমনও আলোচনায় আছেন। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, “যেকোনো সময় ছাত্রদলের নতুন কমিটি আসতে পারে। এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বর্তমান কমিটির নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়েছে। বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী, যিনি ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক; তিনি দক্ষতা, ত্যাগ, দলের প্রতি আনুগত্য এবং শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বকে মূল্যায়ন করে নতুন কমিটি দেবেন।”

কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক রিয়াদ রহমান বলেছেন, “৫ আগস্টের আগে ছাত্রলীগের দখলদারিত্ব, সিট বাণিজ্য ও প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তারের কারণে ছাত্ররাজনীতির মূলধারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সাধারণ শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও শোষণই গণঅভ্যুত্থানে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণের অন্যতম কারণ ছিল এবং এর ধারাবাহিকতায় ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটে।”

তিনি বলেন, “ছাত্ররাজনীতি বন্ধ কোনো সমাধান নয়। ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের আন্দোলন—সব ক্ষেত্রেই ছাত্রসমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ভবিষ্যতের নেতৃত্ব হতে হবে নৈতিক, শিক্ষার্থীবান্ধব ও গ্রহণযোগ্য। ছাত্রনেতাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া, শিক্ষার্থীদের অধিকার, নিরাপত্তা, শিক্ষা, কল্যাণ এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা থাকতে হবে।” 

“ক্যান্টিনে পর্দা টাঙানোর মতো প্রতীকী উদ্যোগ নয়, বরং সারা দেশের শিক্ষার্থীদের বাস্তব সমস্যা সমাধানই ছাত্রসংগঠনের প্রধান দায়িত্ব। নেতৃত্ব এমন ব্যক্তির হাতে যেতে হবে, যিনি সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে পারবেন, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রাখবেন, নিজের সংগঠনের ভুলের সমালোচনা করার সাহস রাখবেন এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিবন্ধকতামুক্ত পরিবেশ তৈরিতে কাজ করবেন।”

ছাত্রদলের শীর্ষ পদপ্রত্যাশী ও বর্তমান সহ-সভাপতি এইচ এম আবু জাফর জানিয়েছেন, নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে তারা সাংগঠনিক অভিভাবক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি শতভাগ আস্থাশীল। 

তার বিশ্বাস, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে সক্রিয়, শিক্ষার্থীবান্ধব রাজনীতি করা এবং দলের প্রতি প্রতিশ্রুতিশীল নেতাদের মধ্য থেকেই নতুন নেতৃত্ব বেছে নেওয়া হবে।

কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাজু আহমেদ বলেন, “নতুন নেতৃত্ব ও নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সারা দেশের ছাত্রদল অপেক্ষা করছে। আশা করছি, সাংগঠনিক অভিভাবক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিগগিরই নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি উপহার দেবেন।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব শুধু সংগঠনের ভবিষ্যৎ নয়, বিএনপির সামগ্রিক সাংগঠনিক কৌশল ও রাজনৈতিক বার্তারও গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হবে।





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *