জনবল সংকটে প্রযুক্তিনির্ভর কর ব্যবস্থার পথে এনবিআর


করদাতার সব তথ্য এক ছাতার নিচে আনতে চায় এনবিআর

জার্নাল ডেস্ক

চলতি অর্থবছরে গত বছরের তুলনায় প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। তবে এই বড় লক্ষ্য পূরণে সংস্থাটিকে একদিকে যেমন জনবল সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে পুরোপুরি সমন্বিত নয় এমন ডিজিটাল ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও সামলাতে হচ্ছে।

সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে উপস্থাপিত এনবিআরের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গত অর্থবছরে সংস্থাটি ৪ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছিল। এবার সেই লক্ষ্য বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আয়কর বিভাগের অনুমোদিত ১২ হাজার ৭৬৪টি পদের মধ্যে ৪ হাজার ৫৫২টি বর্তমানে শূন্য রয়েছে, যা মোট পদের প্রায় ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ।

অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এনবিআরের সক্ষমতা, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর পদক্ষেপ এবং সংস্থাটির সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে বিস্তারিত উপস্থাপনা দেওয়া হয়। বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, কমিটির সদস্য এবং এনবিআরের চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, “দেশের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াতে হবে। তা না হলে সরকারের ব্যয় নির্বাহে বাইরের উৎসের ওপর নির্ভরতা থাকবে। এনবিআরকে তাদের নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণে কাজ করতে হবে।”

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের দায়িত্ব এনবিআরের ওপর। অর্থাৎ সরকারের মোট রাজস্বের প্রায় ৮৬ দশমিক ৯ শতাংশই সংস্থাটিকে সংগ্রহ করতে হবে।

এনবিআরের তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম ছিল। ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ১২ দশমিক ৬৬ শতাংশ, পরের বছর ১০ দশমিক ৫৭ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১১ শতাংশ, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা নেমে আসে ২ দশমিক ৫০ শতাংশে। পরে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা ১২ দশমিক ৩ শতাংশে ওঠে।

করজাল বাড়াতে এবার প্রচলিত মাঠপর্যায়ের জরিপের পরিবর্তে প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতির দিকে যাচ্ছে এনবিআর। সংস্থার এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, “গতানুগতিক জরিপে কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি।”

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা ব্যবহার করে জমি ও ভবনের পরিবর্তনের তথ্য সংগ্রহ করা হবে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে থাকা হোল্ডিং, ভবনের আকার, মালিকানা ও ব্যবসায়িক লেনদেনের তথ্য এনবিআরের তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এপিআইভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে একজন ব্যক্তির পুরো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের চিত্র এক জায়গায় দেখার ব্যবস্থা করার লক্ষ্য রয়েছে।

এনবিআর শুধু নতুন টিআইএন দেওয়া নয়, বরং টিআইএনধারীকে নিয়মিত রিটার্ন দাখিলকারী ও সক্রিয় করদাতায় পরিণত করতে চায়। এজন্য ব্যাংক হিসাব, বড় অঙ্কের লেনদেন, জমি-বাড়ি-ফ্ল্যাট কেনাবেচা, গাড়ির মালিকানা, কোম্পানির পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডারের তথ্য ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ব্যবসার লাইসেন্স, আমদানি-রপ্তানি, ক্রেডিট কার্ড ব্যয়, বিদেশ ভ্রমণ, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ, সরকারি কেনাকাটা, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ, শিক্ষা ও চিকিৎসায় বড় ব্যয়, ডিজিটাল ব্যবসা, পেশাগত আয় এবং বাড়িভাড়ার তথ্যও বিশ্লেষণে ব্যবহার করা হবে।

আয় ও সম্পদের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য শনাক্ত করতে ‘ন্যাশনাল ইনকাম ট্যাক্স ডেটা ম্যাচিং সিস্টেম’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিবেদনে উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে, কেউ যদি বছরে ১২ লাখ টাকা আয় ঘোষণা করেও ব্যাংক হিসাবে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা জমা করেন, ৫০ লাখ টাকার গাড়ি ও ১ কোটি টাকার জমি কেনেন এবং বছরে পাঁচবার বিদেশ ভ্রমণ করেন, তাহলে সেই অসামঞ্জস্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত হবে।

এনবিআর প্রতিটি করদাতার জন্য সমন্বিত প্রোফাইল তৈরির পরিকল্পনাও করেছে। সেখানে ঘোষিত আয়, কর পরিশোধ, ব্যাংক লেনদেন, স্থাবর সম্পত্তি, গাড়ি, কোম্পানির মালিকানা, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ, আমদানি-রপ্তানি ও বিদেশ ভ্রমণের তথ্য থাকবে। আয়, ব্যয় ও সম্পদের মধ্যে বড় পার্থক্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে উচ্চ ঝুঁকির তালিকায় রাখা হবে।

বর্তমানে ই-টিআইএন, ই-রিটার্ন, ই-টিডিএস, ভ্যাট অনলাইন, অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড, কাস্টমস বন্ড ব্যবস্থাপনা এবং বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডোর মতো একাধিক ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু থাকলেও এগুলো আলাদা প্ল্যাটফর্মে পরিচালিত হচ্ছে। তাই ‘ওয়ান এনবিআর আর্কিটেকচার’-এর আওতায় আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমসের সব তথ্য একীভূত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র, কোম্পানি নিবন্ধন, ভূমি, আমদানি-রপ্তানি, বিআরটিএসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তথ্য বিনিময়ের কাজও চলছে।

করদাতার ভোগান্তি কমাতে বিশেষ করে বেতনভোগীদের জন্য ‘প্রি-ফিলড ট্যাক্স রিটার্ন’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। বেতন, ব্যাংকের সুদ, উৎসে কাটা কর, বিনিয়োগ ও কর রেয়াতের তথ্য সিস্টেমে থাকলে করদাতাকে নতুন করে সব তথ্য পূরণ করতে হবে না। এনবিআর কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এতে কর্মকর্তা ও করদাতার সরাসরি যোগাযোগ কমবে এবং মানুষের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে রাজস্ব হারানোর সুযোগও কমে আসবে।

নতুন করদাতা খোঁজার পাশাপাশি পুরোনো বকেয়া আদায়েও জোর দেওয়া হচ্ছে। কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি বকেয়া রাজস্ব রয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় ৭৭ হাজার ১৬০ কোটি টাকার কর অব্যাহতির কার্যকারিতাও নিয়মিত পর্যালোচনা করার পরিকল্পনা রয়েছে।

ভ্যাট ব্যবস্থায় ই-ইনভয়েসিং, তামাক পণ্যে ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস ব্যবস্থা, কারখানায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরা, সিগারেটে কিউআর বা এআর কোড এবং কাস্টমসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিংভিত্তিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। মধ্যমেয়াদে এটিকে ১০ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। এ জন্য করহার বাড়ানোর চেয়ে করের আওতা সম্প্রসারণ, তথ্য মিলিয়ে কর ফাঁকি শনাক্ত, বকেয়া আদায়, কর সুবিধা পর্যালোচনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে এনবিআর।

ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রসঙ্গে কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, “অনলাইনে কর দেওয়া ও রিটার্ন জমার সুযোগ যত বাড়বে, করদাতাদের এনবিআর কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তত কমবে। এতে সেবা সহজ হওয়ার পাশাপাশি দুর্নীতির সুযোগও কমবে।” তিনি আরও বলেন, “এই পরিবর্তন একদিনে সম্ভব নয়। ধাপে ধাপে আরও কার্যক্রম অনলাইনে নেওয়া হলে করদাতাদের ভোগান্তি ও সরাসরি যোগাযোগ আরও কমানো সম্ভব হবে।”

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএম





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *