জন্মদিনে ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নেভানোর প্রথা এল কোথা থেকে
কেকের ফিরে আসা
মধ্যযুগের শেষের দিকে এসে কেক আবার উৎসবের খাবারে পরিণত হতে শুরু করে। তবে সেটা শুধু বড়লোকদের বাড়িতে। এরপর ১৬০০ শতকের দিকে মানুষ জন্মদিন বা বিয়ের মতো ব্যক্তিগত জীবনের মাইলফলকগুলো উদ্যাপন করতে শুরু করে।
এখান থেকেই জার্মানির মঞ্চ প্রস্তুত হলো। ১৬৯১ সালে জোহান ক্রিস্টোফ ওয়াগেনসাইল নামে এক জার্মান পণ্ডিত নুরেমবার্গ শহরের শিশুদের জন্মদিনের কেক নিয়ে প্রথমবারের মতো লেখালেখি করেন। তখনো মোমবাতির দেখা মেলেনি ঠিকই, তবে জন্মদিনের কেকের একেবারে প্রথম লিখিত প্রমাণ এটিই!
তাহলে মোমবাতি নেভানোর চল শুরু হলো কবে
মোমবাতি, কেক আর জন্মদিন—এই তিনের জাদুকরি মিলন ঘটেছিল ১৮ শতকের জার্মানিতে। সেখানে শিশুদের জন্য কিন্ডারফেস্ট নামে একটি উৎসব হতো। পপ কালচার ইতিহাসবিদ মারি নিকোলা বলেন, ‘১৬৯১ থেকে ১৭৪০ সালের মাঝামাঝি কোনো একসময়ে মানুষের লজিক ও প্রতীকী চিন্তার দারুণ এক সংমিশ্রণ ঘটে। কেক তো আগে থেকেই উৎসবের অংশ ছিল, মোমবাতি মানে ছিল পবিত্র জীবন, আর শিশু মানেই হলো দারুণ এক সম্ভাবনা। এই তিন জিনিসকে এক করে দেওয়া হলো।’
বিখ্যাত লেখক জোহান উলফগ্যাং ফন গ্যেটে ১৭৪০-এর দশকে একটি জন্মদিনের কেকের বর্ণনা দিয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘কেকের চারপাশটা আলো দিয়ে এমনভাবে ঘেরা ছিল, যেন সেটা একটা বেদি বা প্রার্থনার জায়গা!’
কিন্ডারফেস্টের এই উৎসব মূলত শুরু হয়েছিল জার্মানির পায়েটিজম আন্দোলন থেকে। এই প্রোটেস্ট্যান্ট আন্দোলনের মূল কথা ছিল, ঘরই হলো মানুষের নৈতিকতা শেখার আসল জায়গা। মোমবাতিগুলো ছিল শিশুর ভেতরের সুন্দর বিকাশের প্রতীক। শিশুর যত বছর বয়স, কেকে ঠিক ততগুলো মোমবাতি বসানো হতো। তার সঙ্গে যোগ করা হতো বাড়তি একটি মোমবাতি, যার মানে হলো ‘আগামী দিনের বেড়ে ওঠা’।
১৮৮১ সাল নাগাদ এই প্রথা সুইজারল্যান্ডে পৌঁছে যায়। সুইস ফোকলোর জার্নালে সে দেশের মধ্যবিত্তদের এই কেক ও মোমবাতি প্রথার কথা রেকর্ড করা হয়। আর সেখানেই প্রথম লেখা হয়, কেক খাওয়ার আগে মোমবাতি ফুঁ দিয়ে নেভানো হতো!
ইচ্ছা পূরণের ব্যাপারটা কোথা থেকে এল
পৃথিবীর বহু প্রাচীন ধর্মে এবং বিশ্বাসে মানুষের মুখের বাতাস বা শ্বাসকে তার আত্মা বা জীবনীশক্তির প্রতীক ধরা হতো। মোমবাতি নেভানোর সময় মনে মনে কোনো ইচ্ছা বা প্রার্থনা করাটা আসলে সেই পুরোনো বিশ্বাসের আধুনিক রূপ। তুমি যখন চোখ বন্ধ করে ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নেভাও, তুমি আসলে শুধু এক টুকরা মোমের আগুন নেভাচ্ছ না; তুমি একটা ছোট্ট, ব্যক্তিগত প্রার্থনা করছ। শুধু চার্চের বদলে সেটা হচ্ছে তোমার ড্রয়িংরুমে, আর সঙ্গে ফ্রি পাচ্ছো দারুণ স্বাদের খাবার!
কীভাবে এটা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল
জার্মানির এই কিন্ডারফেস্ট প্রথাকে আটলান্টিক মহাসাগর পার করে আমেরিকায় নিয়ে এসেছিল জার্মান অভিবাসীরা। ১৮০০ শতকের দিকে ফিলাডেলফিয়া বা মিলওয়াকির মতো শহরের জার্মান ভাষার পত্রিকাগুলোয় কিন্ডারফেস্টের খবর ছাপা হতো।
১৯০০ থেকে ১৯২০ সালের মধ্যে আমেরিকা এবং ব্রিটেনে কেকের ওপর মোমবাতি জ্বালানোটা মধ্যবিত্তদের একটা সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়ে যায়। ১৯২০-এর দশকে বড় বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলো জন্মদিনের বয়স অনুযায়ী বক্সে ভরে মোমবাতি বিক্রি করা শুরু করে।
কিন্তু পুরো দুনিয়াকে এই নিয়মটা পাকাপাকিভাবে কে শেখাল জানো? ১৯৩১ সালে ডিজনির বানানো একটি শর্ট ফিল্ম! সেই ফিল্মে ঠিক আজকের মতো করে একটি জন্মদিনের পার্টি দেখানো হয়েছিল—প্রথমে কেক, তারপর মোমবাতি, তারপর গান, এবং শেষে উইশ করে ফুঁ দেওয়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকার এই পপ কালচার, মিডিয়া ও সিনেমা পুরো বিশ্বকে এই একই স্ক্রিপ্ট মুখস্থ করিয়ে দিল।
