জবিতে উপাচার্যের জরুরি বৈঠক: বিচার না হওয়া পর্যন্ত সমঝোতায় যাবে না শিবির-ছাত্রশক্তি
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) ছাত্রশিবির, জকসু, ছাত্রশক্তি, ইনকিলাব মঞ্চ ও ছাত্রফ্রন্টের সঙ্গে ছাত্রদলের সাম্প্রতিক সংঘর্ষের ঘটনায় বিচার না হওয়া পর্যন্ত কোনো সমঝোতা বা আপস-মীমাংসায় যেতে রাজি হয়নি ছাত্রশিবির ও ছাত্রশক্তি। অন্যদিকে, একই ঘটনায় ক্যাম্পাসে সহাবস্থান ও সৌহার্দ্যপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখতে সব ছাত্র সংগঠনকে নিয়ে একটি লিখিত কোড অব কন্ডাক্ট প্রণয়নের পক্ষে মত দিয়েছে ছাত্রদল।
শনিবার (১৬ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কনফারেন্স রুমে সক্রিয় ছাত্রসংগঠন ও বিভিন্ন অংশীজনদের নিয়ে আয়োজিত জরুরি বৈঠকে শেষে এসব কথা জানিয়েছে ছাত্রশিবির ও ছাত্রশক্তির নেতারা।
শনিবার বিকালে সাম্প্রতিক সংঘর্ষের ঘটনায় জবি উপাচার্যের আহ্বানে একটি জরুরি বৈঠক শুরু হয়। বৈঠকে জবি শাখা ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তি, ছাত্রফ্রন্টের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও বৈঠকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে ঢাকা-৫ ও ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য, পুরান ঢাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
গত ৪ আগস্ট জবিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসে ইউজিসির চেয়ারম্যানের সামনে ইনকিলাব মঞ্চ, জাতীয় ছাত্রশক্তি, ছাত্রশিবির, ছাত্রফ্রন্ট ও জকসুর নেতাকর্মীরা দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর, অস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা এবং মেডিকেল সেন্টারের উন্নয়নসহ বিভিন্ন দাবিতে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন। এ সময় বাধা দেওযার অভিযোগ ওঠে প্রশাসনের বিরুদ্ধে। পরবর্তীতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এ সময় জকসু, ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তি, ছাত্রফ্রন্ট ও সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে।
ওই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে শনিবার এক জরুরি আলোচনা সভা ডাকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, স্থানীয় সংসসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতারাসহ সহ ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
একপর্যায়ে উভয় পক্ষকে সমঝোতায় রাজি হয়ে কোলাকুলি করার অনুরোধ করা হয়। তবে, এতে আপত্তি জানান ছাত্রশিবির ও ছাত্রশক্তির নেতারা। হামলার বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের সমঝোতায় রাজি হবেন না বলে জানান তারা। ফলে, কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই সমঝোতা বৈঠক সমাপ্ত হয়।
এ বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশক্তির সভাপতি মো. শাহিন মিয়া বলেন, ৪ আগস্ট হামলার বিচার হওয়ার পূর্বে কোন ধরনের সমঝোতায় থাকবে না ছাত্রশক্তি। হামলার সঙ্গে জড়িতদের আগে বিচারের আওতায় আনতে হবে।
জকসুর জিএস ও জবি শিবিরের সভাপতি আব্দুল আলিম আরিফ বলেন, “আমাদের পক্ষ থেকে একটাই দাবি ছিল যে, বিচার নিশ্চিত করা। বিচার নিশ্চিত হওয়ার আগ পর্যন্ত ভিসি স্যার যতবারই আমাদের ডাকবেন, ক্যাম্পাসের বৃহত্তর স্বার্থে আমরা সবাই একসঙ্গে বসব, কথা বলব। তবে, ক্যাম্পাসের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য বিচারটা নিশ্চিত করতে হবে।”
তিনি আরো বলেন, “শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পক্ষে আমরা সব সময় ছিলাম, এখনো আছি এবং ভবিষ্যতেও থাকব। শিক্ষার্থীদের কল্যাণে আমরা সব সময় প্রস্তুত। তবে, বিচারের আগে কোনো ধরনের সমঝোতায় আমরা রাজি নই।”
এ বিষয়ে জকসুর ভিপি মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, “হামলার বিচার নিশ্চিত করা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব। আজকের বৈঠকে আমরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছি, বিচার সম্পন্ন হওয়ার পর এবং একটি কার্যকর কোড অব কন্ডাক্ট প্রণয়নের পরই সমঝোতার বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে। ভবিষ্যতে যেন কোনো শিক্ষার্থী সন্ত্রাসী হামলার শিকার না হন, সেজন্য জকসুর পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে কিছু প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।”
অন্যদিকে, একই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংগঠনের জন্য কোড অব কন্ডাক্ট চায় ছাত্রদল। জরুরি বৈঠক শেষে রফিক ভবনে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানায় জবি ছাত্রদল।
সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শ্যামল মালুম বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিয়াশীল বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে ক্যাম্পাসে সহাবস্থান ও সৌহার্দ্যপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখার বিষয়ে ঐকমত হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, “সব ছাত্র সংগঠনকে নিয়ে একটি লিখিত কোড অব কন্ডাক্ট তৈরি করা হবে এবং সেটির ভিত্তিতে সংগঠনগুলো তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করবে। কোনো সংগঠন অন্য সংগঠনের ওপর আধিপত্য বিস্তার করবে না বা উস্কানি দেবে না। সবাই নিজ নিজ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে এবং ক্যাম্পাসে বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে চলবে। ভবিষ্যতে সংঘাত নয়, পারস্পরিক সমন্বয় ও সহাবস্থানের মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান করা হবে।”
এদিকে, সভায় জকসুর পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনগুলোর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১৫ দফাসম্বলিত প্রস্তাবনার পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীদের জন্য পালনীয় একটি সার্বজনীন কোড অব কন্ডাক্ট প্রণয়নের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন বলেন, “জকসু সভাপতির উপস্থাপিত প্রস্তাবনার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট সবার মতামত নিয়ে একটি সমন্বিত কোড অব কন্ডাক্ট তৈরি করা হবে। ভবিষ্যতে ক্যাম্পাসে ছাত্রসংগঠনগুলোর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে এটি একটি গাইডলাইন হিসেবে কাজ করবে।”
তিনি বলেন, “মত ও সংগঠন যার যার, জবি পরিবার আমার, সবার”—এই চেতনাকে ধারণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব সংগঠনকে সৌহার্দ্য, সহনশীলতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। মত ও পথের ভিন্নতা গণতান্ত্রিক পরিবেশের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য; কিন্তু সেই ভিন্নতার মধ্যেও অন্যের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সম্মান করাই একটি সুন্দর ও সহাবস্থানমূলক ক্যাম্পাস সংস্কৃতির ভিত্তি।”
উপাচার্য আরো বলেন, “রাজনৈতিক মতাদর্শ ও অবস্থান ভিন্ন হতে পারে এবং ভুল বা অসঙ্গতির সমালোচনাও হতে পারে। তবে, কোনো অবস্থাতেই ব্যক্তিগত আক্রমণ, অশালীন ভাষা বা পারিবারিক পরিচয় তুলে অবমাননাকর বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও শালীনতার মধ্য দিয়েই মতপার্থক্যের চর্চা হওয়া উচিত।”
