‘জুলাইয়ের মঞ্চেই একজন শিল্পীর মর্যাদা পদদলিত হলো কীভাবে?’


জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে অনুষ্ঠিত হয় ‘বর্ষা বিপ্লবের গান’ শীর্ষক জুলাই কনসার্ট। গত ৫ আগস্ট অনুষ্ঠিত এই কনসার্টে দর্শক সারি থেকে আর্ক ব্যান্ডের ভোকালিস্ট হাসানকে লক্ষ্য করে পানির বোতল ছোড়া হয়। এ ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভ জানিয়েছেন সংগীতশিল্পী পারশা মাহজাবিন।  

গত ৭ আগস্ট, পারশা মাহজাবিন তার ভেরেফায়েড ফেসবুক পেজে একটি ভিডিওবার্তা দিয়েছেন। ৮ মিনিট ১১ সেকেন্ড দৈর্ঘ্যের ভিডিওতে শিল্পীর নিরাপত্তা, জুলাইয়ের নৈতিকতা, রাজনীতি, রাষ্ট্রব্যবস্থাসহ নানা বিষয়ে কড়া সমালোচনাও করেছেন পারশা।  

ভিডিওবার্তায় পারশা মাহজাবিন বলেন, “একজন শিল্পীর মুখে ছুড়ে মারা একটি বোতল, আজকে আমাকে শুধু শিল্পীর নিরাপত্তা নয়, জুলাইয়ের নৈতিকতার পরিণতি নিয়েও কথা বলতে বাধ্য করছে। হাসান ভাইয়ের দিকে কে বোতল ছুড়ে মেরেছে—প্রশ্নটি এখন এখানে নেই, বরং যে জুলাই মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিল, সেই জুলাইয়ের মঞ্চেই একজন শিল্পীর মর্যাদা পদদলিত হলো কীভাবে?” 

সংগীতশিল্পী হাসানকে পানির বোতল ছুড়ে মারার ঘটনায় লজ্জিত পারশা মাহজাবিন। তিনি বলেন, “গত ৫ আগস্ট ‘বর্ষা বিপ্লবের গান’ কনসার্টে আমিও পারফর্ম করেছি। সেখানে আর্ট ব্যান্ডের ভোকালিস্ট হাসান ভাইয়াকে লক্ষ্য করে দর্শক সারি থেকে পানির বোতল ছুড়ে মারা হয়েছে। আমি এই ঘটনায় গভীরভাবে ব্যথিত, ক্ষুব্ধ এবং লজ্জিত। হাসান ভাইয়ের দিকে ছুড়ে মারা বোতলটি শুধু একজন ব্যক্তি হাসানের গায়ে লাগেনি, পুরো শিল্পী সমাজের মর্যাদায় আঘাত করেছে।” 

জুলাই কোনো দল, গোষ্ঠী কিংবা ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। জুলাইয়ের নামে কাউকে দেশপ্রেমের সনদ দেওয়া কিংবা কারোর নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার এখতিয়ার কারো নেই বলে মত পারশা মাহজাবিনের। 

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন ভাঙা এবং জুলাই আন্দোলনের অবক্ষয় নিয়ে একগুচ্ছ প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে পারশা মাহজাবিন বলেন, “আচ্ছা, জুলাইয়ের অর্জন কি সেদিনই ধূলিসাৎ হয়নি যেদিন শেখ হাসিনার অন্তর্বাস দাবি করে একটি নারীর প্রাইভেটগার্মেন্টস নিয়ে উল্লাস করেছিলেন? জুলাইয়ের ধ্বংস কি সেদিন থেকে শুরু হয়নি, যেদিন থেকে সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্নগুলো ভাঙা শুরু হয়েছে? একটি বিষয় খুব স্পষ্ট করে মনে রাখা প্রয়োজন, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে একবারই, তা ১৯৭১ সালে।”  

কয়েকজন সমন্বয়ক, নেতা কিংবা রাজনৈতিক কর্মীর কারণে জুলাই সফল হয়নি। বরং অসংখ্য সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমেছিল বলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়েছিল। শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক, শিল্পী সাধারণ নাগরিকের সাহসই কিন্তু আসল শক্তি ছিল বলেও জানান পারশা মাহজাবিন। 

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের স্পষ্ট পার্থক্য ব্যাখ্যা করে পারশা মাহজাবিন বলেন, “স্বাধীনতা একটি রাষ্ট্রের জন্ম দেয়, আর গণঅভ্যুত্থান একটি বিদ্যমান রাষ্ট্রকে স্বসংস্কার, সংশোধন এবং জবাবদিহিতার পথে ফিরিয়ে আনার দাবি জানায়। দুটির ঐতিহাসিক মর্যাদা আছে। কিন্তু দুটোকে এক করা হলে ১৯৭১ ও ২০২৪ দুটি ইতিহাসের প্রতিই অবিচার করা হয়। আমরা আইনের শাসন চাই, মবের শাসন নয়। আমরা এমন বাংলাদেশ চাই না, যেখানে আমি যাকে পছন্দ করি তাকে দেশপ্রেমিক আর যাকে পছন্দ করি না, তাকে দেশদ্রোহী বলব। 

রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রতি অন্ধ বন্দনার সমালোচনা করে পারশা মাহজাবিন বলেন, “আমরা সবাই অন্য মানুষটিকে নিজের মতো করে তৈরি করতে চাই। কিন্তু গণতন্ত্রের মূল সৌন্দর্য হলো তোমাকে আমার মতো হতে হবে না। ভিন্ন মতের হয়েও আমরা সমান নাগরিক অধিকার নিয়ে এই দেশে বসবাস করতে পারব। একসময়ে বঙ্গবন্ধুর অন্ধ বন্দনা এই দেশে বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল, সাধারণ মানুষের কাছে মহান মুক্তিযুদ্ধকে এক প্রকার বিষিয়ে তোলা হয়েছিল।” 

স্কুলের একটি ঘটনা উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন পারশা মাহজাবিন। তার ভাষায়, “আমি নিজেই এটার ভুক্তভোগী। একবার স্কুলের প্রোগ্রামে আমাকে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি গাইতে দেওয়া হয়নি। কারণ জেমসের এই গানে শহীদ জিয়ার নাম আছে। তখন ১০ মিনিটের মধ্যে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গান তুলতে হয়েছিল। স্কুলের অ্যাডমিন থেকেই এই ইনস্ট্রাকশন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন দেখছি সেই মানুষটাকেই অন্ধভাবে ঘৃণা করাটাই দেশপ্রেমের পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি ব্যক্তিপূজায় বিশ্বাসী নই, একই সঙ্গে ইতিহাস মুছে ফেলার রাজনীতিতেও বিশ্বাস করি না।” 

নতুন বাংলাদেশ মানে নতুন শত্রুর তালিকা তৈরি করা কিংবা পুরোনো সহিংসতার ওপর নতুন স্লোগান চাপিয়ে দেওয়া নয়। ভিন্ন মতের প্রতি সহনশীলতা ও ভয়মুক্ত পরিবেশ না থাকলে কেবল জুলাইয়ের নামে মঞ্চ বানিয়ে আন্দোলনকে সম্মান জানানো সম্ভব নয় বলেও জানান পারশা মাহজাবিন।





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *