দক্ষ জনবলের অভাবে কোটি টাকার ‘পিসিআর ল্যাবে’র সুফল পাচ্ছেন না মৎস্যচাষিরা


সাতক্ষীরার এল্লার চরে চিংড়ি চাষ প্রদর্শনী খামারের ল্যাবরেটরির কার্যক্রম প্রায় থমকে গেছে। পর্যাপ্ত জনবল ও দক্ষ টেকনিশিয়ানের অভাবে কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত পিসিআর ল্যাব, হ্যাচারি ও কোয়ারেন্টাইন ল্যাবের মতো আধুনিক প্রযুক্তির সুফল পাচ্ছেন না স্থানীয় মৎস্যচাষিরা।  

চাষিরা জানিয়েছেন, সাতক্ষীরায় চিংড়িচাষিদের দীর্ঘদিনের দাবির মুখে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে রেণুর গুণগত মান ও ভাইরাস পরীক্ষার ল্যাব নির্মাণ করা হলেও তা কোনো কাজে আসছে না। ফলে, প্রতিবছর ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে কোটি কোটি টাকার চিংড়ি মারা যাচ্ছে, চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন স্থানীয় চাষি ও ব্যবসায়ীরা।

সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য বিভাগ জানিয়েছে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থকরী ফসল হিসেবে পরিচিত সাদা সোনা বা বাগদা চিংড়ির প্রধান হাব সাতক্ষীরা। এ জেলায় বর্তমানে প্রায় ৫৫ হাজার ঘেরে বাণিজ্যিকভাবে বাগদা চিংড়ি চাষ করা হয়, যেখানে প্রতি মৌসুমে ৩০০ কোটিরও বেশি চিংড়ি রেণু ছাড়া হয়ে থাকে। গত বছরের ডিসেম্বরে এল্লার চর এলাকায় অবস্থিত চিংড়ি চাষ প্রদর্শনী খামারে প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি অত্যাধুনিক রেণু পরীক্ষা ও পিসিআর ল্যাব স্থাপন করা হয়।

মৎস্য বিভাগের উদ্দেশ্য ছিল— ঘেরে ছাড়ার আগেই যেন চাষিরা পোনার গুণগত মান ও রোগ-জীবাণু পরীক্ষা করে নিতে পারেন। কিন্তু, প্রয়োজনীয় জনবল ও টেকনিশিয়ান নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ফলে, কোটি কোটি টাকার বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ও রাসায়নিক এখন ধুলো জমে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

স্থনীয় ঘের মালিক শফিকুল ইসলাম, মফিজুল ইসলাম, আব্দুর রহমানসহ একাধিক ঘের মালিকরা জানিয়েছেন, উদ্বোধনের পর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও প্রয়োজনীয় টেকনিশিয়ান ও জনবলের অভাবে তালাবদ্ধ হয়ে আছে আধুনিক ল্যাব দুটি। ল্যাব চালু না থাকায় চাষিরা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার সুযোগ পাচ্ছেন না।

তারা জানান, বাধ্য হয়ে খালি চোখে দেখে বাজার থেকে পোনা কিনে ঘেরে ছাড়ছেন তারা। এতে ভাইরাসবাহী বা দুর্বল পোনা ঘেরে চলে যাওয়ায় কিছুটা বড় হওয়ার পরপরই মড়ক দেখা দিচ্ছে এবং মুহূর্তেই ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে একের পর এক ঘের। টানা লোকসানের ধাক্কায় অনেক চাষি ইতোমধ্যে চিংড়ি চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের সঙ্গে ভাইরাসের এ তাণ্ডব যোগ হওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চলের মৎস্য অর্থনীতি এখন চরম হুমকির মুখে।

ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা বলছেন, একের পর এক চালানে পুঁজি হারিয়ে অনেকেই এখন ভিটেমাটি বিক্রি করার উপক্রম। বাধ্য হয়ে অনেকে চিংড়ি ঘের বন্ধ করে সাধারণ সাদা মাছ বা ধান চাষের দিকে ঝুঁকছেন।

সাতক্ষীরা চিংড়ি চাষ প্রদর্শনী খামারের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শফিকুল ইসলাম বলেছেন, “চিংড়ি শিল্পকে আধুনিক ও টেকসই করতে ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় চিংড়ি চাষ প্রদর্শনী খামার। সাতক্ষীরার হাজার হাজার পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চিংড়ি চাষের ওপর নির্ভরশীল। ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের অভাবে অকেজো হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন ঘের মালিকরা।”

মৎস্য বিভাগের অন্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দক্ষ জনবল চেয়ে ঊর্ধ্ব তন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

সাতক্ষীরা জেলা চিংড়ি পোনা ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি ডা. আবুল কালাম বাবলা বলেছেন, “বাংলাদেশ প্রতিবছর চিংড়ি রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। এই সম্ভাবনাময় শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে রেণুর ভাইরাস পরীক্ষা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।”

তিনি আরো বলেন, “দ্রুত টেকনিশিয়ান ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দিয়ে ল্যাব দুটি চালু না করলে একদিকে চাষিরা সর্বস্বান্ত হবেন, অন্যদিকে কোটি কোটি টাকার সরকারি যন্ত্রপাতিও অকেজো হয়ে পড়বে।”

সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য অফিসার জি এম সেলিম বলেছেন, “গবেষণা, উন্নত পোনা উৎপাদন, পানির গুণগত মান পর্যবেক্ষণ এবং খামারিদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। কিন্তু, প্রয়োজনীয় জনবল ও দক্ষ টেকনিশিয়ানের অভাবে সেই স্বপ্ন এখন থমকে গেছে।”

দ্রুত দক্ষ জনবল নিয়োগ করে পিসিআর ল্যাব পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা হবে, এমনটাই প্রত্যাশা সাতক্ষীরার মৎস্যচাষিদের।





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *