দখল-রাজনীতির কবলে ঢাকা, নগর ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজন জবাবদিহি: বিআইপি
নগর ব্যবস্থাপনায় রাজনৈতিক প্রভাব, ফুটপাত দখল, অবৈধ ব্যবসা ও চাঁদাবাজির মতো বিষয়গুলো ঢাকার বাসযোগ্যতা সংকটকে আরও তীব্র করছে। এ অবস্থায় দখলদারদের শনাক্ত ও জবাবদিহির আওতায় না এনে শুধু খাল খনন কার্যক্রম পরিচালনা করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) উপদেষ্টা পরিষদের আহ্বায়ক ও সাবেক সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান এসব কথা বলেন।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর প্ল্যানার্স টাওয়ারে সংবাদ সম্মেলনে আদিল মুহাম্মদ খান এসব কথা বলেন। ‘ঢাকা শহরের বাসযোগ্যতা: চ্যালেঞ্জ ও পরিকল্পিত সমাধানের পথরেখা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন করে বিআইপি।
ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকার বাসযোগ্যতা উন্নয়নে সরকার গত ছয় মাসে কী ধরনের কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিয়েছে, সেটি মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। শুধু উদ্যোগ গ্রহণ করলেই হবে না, সেগুলোর বাস্তবায়ন এবং ফলাফলও নাগরিকদের সামনে স্পষ্ট করতে হবে।
খাল পুনরুদ্ধার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, খাল খনন ও পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে খালগুলো কারা দখল করেছে এবং কীভাবে দখল হয়েছে, তা আগে চিহ্নিত করা জরুরি। দখলদারদের শনাক্ত ও জবাবদিহির আওতায় না এনে শুধু খনন কার্যক্রম পরিচালনা করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
সংবাদ সম্মেলনে বিআইপির সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, বৈশ্বিক বাসযোগ্যতা সূচকে ১৭৩ শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পরিবহন, বায়ু ও শব্দদূষণ, জলাবদ্ধতা, সবুজ ও উন্মুক্ত স্থান, জনস্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির মতো বিষয়গুলো সরাসরি নগর পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত।
তিনি বলেন, ঢাকায় একসময় ৫৬টি খাল থাকলেও বর্তমানে ২৬টি খালের কোনো অস্তিত্ব নেই। নগরের ৪৮টি এলাকাকে জলাবদ্ধতার ঝুঁকিপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল-জলাধার দখল ও দুর্বল নিষ্কাশনব্যবস্থাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
ড. আরিফুল ইসলাম আরও বলেন, ঢাকার ৯৯ দশমিক ২৯ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে মাত্র ৭ দশমিক ৯৯ শতাংশ সবুজ এলাকা রয়েছে, যা বাসযোগ্য শহরের জন্য অপর্যাপ্ত। যানজটের কারণে প্রতিবছর বিপুল কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে এবং এর অর্থনৈতিক ক্ষতিও ব্যাপক। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার ৭৬৫ টন বর্জ্য সংগ্রহ ও নিষ্পত্তির বাইরে থেকে যাচ্ছে।
বিআইপির সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. মু. মাসেলেহ উদ্দীন হাসান বলেন, ঢাকা বর্তমানে বাসযোগ্যতার নিম্নতম পর্যায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হলেও যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়া, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও সমন্বয়হীনতার কারণে বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি গাজীপুর-ঢাকা বিআরটি দ্রুত চালুর পাশাপাশি ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থায় আরও বিআরটি রুট সংযোজনের পরামর্শ দেন। বড় ও ব্যয়বহুল প্রকল্পের পাশাপাশি ছোট কিন্তু জরুরি নগর সমস্যাগুলোর সমাধানেও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
স্থানীয় পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ পরিকল্পনাবিদ এ কে এম রিয়াজ উদ্দিন বলেন, শুধু ঢাকার বাসযোগ্যতা নয়, দেশের অন্যান্য শহরের সমস্যাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। ঢাকার বাসযোগ্যতা কমলেও মানুষ ঢাকামুখী হচ্ছে, কারণ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে কর্মসংস্থান, সেবা ও সুযোগের ঘাটতি রয়েছে।
তিনি বলেন, ঢাকার সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য পুরো বাংলাদেশকে একটি সমন্বিত স্থানিক পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি স্থানিক পরিকল্পনা আইন বাস্তবায়ন করতে হবে। বৃহত্তর ঢাকার জন্য সমন্বিত নগর নেতৃত্বের প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বিআইপির বোর্ড সদস্য (ন্যাশনাল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল লিয়াজোঁ) পরিকল্পনাবিদ তালহা তাসনিম বলেন, পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে একই ধরনের তথ্য বারবার সংগ্রহ করতে হয়। একটি সমন্বিত জাতীয় ডাটাবেজ থাকলে পরিকল্পনা প্রণয়ন আরও কার্যকর, দ্রুত ও কম ব্যয়বহুল হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ও বাড়বে।
এমএমএ/কেএসআর
