পদ্মবিলে দর্শনার্থীর ভিড়, ফুল ছেঁড়ায় হারাচ্ছে সৌন্দর্য; সংরক্ষণের দাবি


একসময় দূর-দূরান্তের ভ্রমণপিপাসু মানুষের পদচারণায় মুখর থাকত কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার দক্ষিণগ্রামের পদ্মবিল। বর্ষা এলেই প্রায় ২৫ একরজুড়ে ফুটে উঠত লাল, সাদা, নীল ও হলুদ পদ্মের অপরূপ সমারোহ। নীল আকাশের নিচে বিস্তীর্ণ বিলজুড়ে ফুটে থাকা পদ্মের সৌন্দর্য তৈরি করত এক স্বর্গীয় আবহ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবির মাধ্যমে অল্প সময়েই পুরো দেশ,বিদেশে পরিচিতি পায় দক্ষিণগ্রামের এই পদ্মবিল।বিলের দুর্লভ হলুদ পদ্মের মূল, কাণ্ড, শাখা ও ফুল গবেষণার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগসহ যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়।এরপর বিলটির সার্বিক সংরক্ষণে ইউনেস্কোর সহযোগিতার উদ্যোগের কথাও জানা যায়।

তবে সময়ের সঙ্গে সেই সৌন্দর্যে ভাটা পড়েছে। অযত্ন-অবহেলা, দর্শনার্থীদের অসচেতনতা এবং নির্বিচারে পদ্মফুল ছিঁড়ে নেওয়ার কারণে ধীরে ধীরে সৌন্দর্য হারাচ্ছে সম্ভাবনাময় এই বিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিলটি সংরক্ষণে প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি না থাকায় প্রতিদিনই দর্শনার্থীদের একটি অংশ নৌকায় ঘুরতে গিয়ে পদ্মফুল ছিঁড়ে নিয়ে যাচ্ছে। ফলে বিলের দুর্লভ হলুদ পদ্মসহ বিভিন্ন প্রজাতির পদ্ম হুমকির মুখে পড়েছে।

সম্প্রতিতে সরেজমিনে দেখা যায়, বুড়িচং উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের দক্ষিণগ্রামে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের পূর্ব পাশে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে পদ্মবিলটির অবস্থান। বিলের চারপাশে বর্ষার পানিতে ফুটে আছে নানা রঙের পদ্ম ও শাপলা। বিলের মধ্যে দেখা মেলে ডাহুক, সারস ও বালিহাঁসসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির। পদ্মের সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা আসছেন। বর্তমানে বিল ঘিরে প্রায় ৮ থেকে ১০টি নৌকা চলাচল করছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এসব নৌকায় করে দর্শনার্থীরা বিল ঘুরে দেখেন।

তবে দর্শনার্থীদের একটি অংশ বিলের সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি পদ্মফুল ছিঁড়ে নিয়ে যাচ্ছেন। কেউ কেউ নৌকায় বসেই ফুল তুলে নিচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন বিলের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে পদ্মের বংশবিস্তারও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের বর্ষায় প্রথম ব্যাপকভাবে মানুষের নজরে আসে দক্ষিণগ্রামের পদ্মবিল। ২০১৯ সালে বিলের নানা রঙের পদ্মের ছবি স্থানীয় ভ্রমণপিপাসুরা মোবাইল ফোনে ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিলে দ্রুতই এর পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে কুমিল্লার গণ্ডি ছাড়িয়ে সারা দেশে। এরপর হাজারো দর্শনার্থী ছুটে আসতে শুরু করেন বিলের সৌন্দর্য দেখতে।

দর্শনার্থীদের ব্যাপক আগ্রহের কারণে স্থানীয় প্রশাসনও উদ্যোগী হয়। গঠন করা হয় পদ্মবিল সংরক্ষণ কমিটি। পদ্মের বৈচিত্র্য ও সংরক্ষণের গুরুত্ব বিবেচনায় বিশেষজ্ঞরাও বিলটি পরিদর্শন করেন।

২০২০ সালে বেঙ্গল প্লানেট রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক সিকদার এ কে সামসুদ্দিন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. রাখা হরি সরকার পদ্মবিল পরিদর্শন করেন। পরে বিলের দুর্লভ হলুদ পদ্মের মূল, কাণ্ড, শাখা ও ফুল গবেষণার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগসহ যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়।

এরপর ২০২১ সালে বিলটির সার্বিক সংরক্ষণে ইউনেস্কোর সহযোগিতার উদ্যোগের কথা জানা যায়। তখন বিলের প্রবেশপথসহ বিভিন্ন স্থানে সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড স্থাপন, হলুদ পদ্মের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে লাল পতাকা টানানো এবং পাহারাদারের ব্যবস্থা করা হয়। একই সঙ্গে দর্শনার্থীদের চাপও বেড়ে যায়। একপর্যায়ে বিলটিতে প্রায় এক ডজন খণ্ডকালীন মাঝি নৌকা নিয়ে দর্শনার্থীদের ঘুরিয়ে জীবিকা নির্বাহ শুরু করেন।

তবে ২০২৩ সালের পর থেকে পরিস্থিতি বদলে যায়। সংরক্ষণ ও অধিগ্রহণের আশ্বাস কার্যকর না হওয়ায় বিলের জমির মালিকরা আগের মতোই চাষাবাদ, মাছ ধরা, কচুরিপানা পরিষ্কার এবং শুষ্ক মৌসুমে ঘাস কাটাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। একপর্যায়ে বিলের বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করা সাইনবোর্ড, লাল পতাকা ও নির্দেশনাগুলোও আর দেখা যায়নি। ফলে অনেকটা অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে পদ্মবিলটি।

প্রায় ২৫ একর আয়তনের পুরো বিলটিই ব্যক্তিমালিকানাধীন। জমির মালিকরা বর্ষা মৌসুমে ধানের পাশাপাশি মাছ চাষও করেন। শীতের পর মৌসুমি বৃষ্টি শুরু হলে বিলে পদ্মফুল ফুটতে শুরু করে। বর্ষায় পানির পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিলজুড়ে লাল, সাদা, নীল ও হলুদ পদ্মের বিস্তৃতি ঘটে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, পদ্মবিলকে ঘিরে পর্যটনের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা গেলে এটি বুড়িচং তথা কুমিল্লার অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। কিন্তু বর্তমানে নিয়মিত তদারকির অভাবে দর্শনার্থীদের একটি অংশ ফুল ছিঁড়ে নেওয়ায় বিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দ্রুত নষ্ট হচ্ছে।

তাদের অভিযোগ, পদ্মবিলে ঘুরতে আসা অনেক দর্শনার্থী নিয়ম-শৃঙ্খলা মানছেন না। নৌকার মাঝিদের সহযোগিতায় অর্থের বিনিময়ে অনেকেই হলুদ পদ্মসহ বিভিন্ন ধরনের পদ্ম ছিঁড়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এ ছাড়া নৌকার ভাড়াও অনেক সময় অতিরিক্ত নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ঘুরতে আসা কুমিল্লা জজকোর্টের এপিপি এডভোকেট আরিফুর রহমান শ্রাবণ বলেছেন,দর্শনার্থীদের একটি অংশ ফুল ছিঁড়ে নেওয়ায় বিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দ্রুত নষ্ট হচ্ছে।দ্রুত প্রশাসনিক উদ্যোগ নিয়ে পদ্মবিলের জন্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা পুনরায় চালু করা প্রয়োজন। বিলের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড স্থাপন, নিয়মিত পাহারার ব্যবস্থা এবং পদ্মফুল ছেঁড়া বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে অচিরেই হারিয়ে যেতে পারে বুড়িচংয়ের এই অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।

তাদের দাবি, শুধু দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দিলেই হবে না; বিলের জীববৈচিত্র্য ও পদ্মের প্রাকৃতিক বিস্তার রক্ষায় একটি দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ পরিকল্পনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নৌকা চলাচল ও দর্শনার্থীদের কার্যক্রমও নিয়মের মধ্যে আনা দরকার।স্থানীয়দের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে বিশ্ব পরিচিত লাভ করা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে



সাজু/নিএ





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *