মার্কিন হামলার পর ইরানের পাল্টা আঘাত,
এক মাস পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত থাকার পর আবারও সরাসরি হামলা-পাল্টা হামলায় জড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান।
বিদেশি গণমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, মঙ্গলবার ইরানে মার্কিন বিমান হামলায় একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে হতাহতের খবরের পর জর্ডান, বাহরাইন ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে তেহরান।
এতে পশ্চিম এশিয়ায় নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামও বেড়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড বলেছে, হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজ ও ওই অঞ্চলে থাকা মার্কিন সেনাদের ওপর ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের সাম্প্রতিক হামলা চেষ্টার জবাবে তারা অভিযান চালিয়েছে।
সেন্টকমের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানে আইআরজিসির বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার, সামুদ্রিক সক্ষমতা, মাইন সংক্রান্ত স্থাপনা এবং যোগাযোগব্যবস্থার ওপর হামলা চালানো হয়। মঙ্গলবার শুরু হওয়া ওই হামলার একটি পর্যায় বুধবার শেষ হয়।
তবে ইরানের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, হামলা শুধু সামরিক স্থাপনাতেই সীমিত ছিল না। দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
আহভাজের কাছে এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জিরোফত বিমানবন্দরের কাছেও হামলার খবর এসেছে। চাবাহার, বান্দার আব্বাস, আসালুয়েহ ও কেশম দ্বীপেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে ইরানি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় সিরিক এলাকায় একটি বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান চলার সময় মার্কিন হামলায় হতাহতের খবর সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে।
ইরানি রেড ক্রিসেন্টের হিসাবে, ওই ঘটনায় অন্তত চারজন নিহত এবং ৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একটি চার বছর বয়সী শিশুও রয়েছে বলে ইরানি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
তবে বিদেশি গণমাধ্যম রয়টার্সের প্রতিবেদনে ইরানের মেহর সংবাদ সংস্থার উদ্ধৃতি দিয়ে নিহতের সংখ্যা পাঁচজন বলা হয়েছে। একই ঘটনায় ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ এক প্রাদেশিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে আহতের সংখ্যা ৬৮ বলে জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ওই বিয়ের অনুষ্ঠানে হতাহতের খবরের তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে সেন্টকমের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স বিবিসিকে বলেছেন, “মার্কিন সামরিক বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় না।”
মার্কিন হামলার পর ইরানের আইআরজিসি পাল্টা হামলা শুরু করার কথা জানায়। ইরানি আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিমের প্রতিবেদনে বলা হয়, জর্ডানের আকাবায় মার্কিন মেরিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে।
জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী বলেছে, দেশটির আকাশসীমায় ঢোকা ১৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করা হয়। এর মধ্যে ১০টি প্রতিহত করা হয়েছে এবং তিনটি প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে পড়ে। এ হামলায় কোনো হতাহত হয়নি বলে জানিয়েছে জর্ডান।
ইরানি সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে, বাহরাইনে একটি মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে বড় ধরনের ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান।
কুয়েতও জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা একটি ড্রোন হামলা মোকাবিলা করছে।
আইআরজিসি দাবি করেছে, উত্তর ইরাকের এরবিলে মার্কিন স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে তারা।
ওই হামলায় কয়েকজন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার দাবিও করেছে আইআরজিসি। তবে ইরাক বা যুক্তরাষ্ট্র এই দাবি নিশ্চিত করেনি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলার কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগকারী এই জলপথ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ।
বিদেশি গণমাধ্যম রয়টার্স বলছে, যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রতি পাঁচ ব্যারেলের একটি এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হত। সংঘাতের কারণে প্রণালিতে নৌ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা চলছে।
মঙ্গলবার বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪ ডলারের বেশি বেড়ে পাঁচ সপ্তাহের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠে।
আইআরজিসি বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলা হরমুজ প্রণালিতে চলাচল আরও কঠিন করে তুলবে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফের বরাত দিয়ে দেশটির সংবাদমাধ্যম বলেছে, “ইরান যদি পারস্য উপসাগর থেকে তেল রপ্তানি করতে না পারে, তাহলে অন্য কারও পক্ষেও সেখান থেকে তেল রপ্তানি সম্ভব হবে না।”
এর আগে সোমবার হরমুজ প্রণালি থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করা দুটি ট্যাংকারে হামলার খবর আসে। এরপরই বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও বেড়ে যায়।
মার্কিন হামলার পর ইরান পাল্টা আঘাত করলে আরও বড় হামলার হুমকি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, “ইরান পাল্টা হামলা চালালে দেশটির ওপর আরও কঠিন ও বড় মাত্রার হামলা হবে।” তিনি ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের হামলা করার প্রস্তুতি রয়েছে বলেও হুঁশিয়ারি দেন।
অন্যদিকে ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাব দেওয়া হবে।
সাম্প্রতিক সংঘাতের আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রায় এক মাস তুলনামূলকভাবে সামরিক উত্তেজনা কম ছিল। এর আগে সপ্তাহান্তে দুই দেশের মধ্যে আবারও গোলাগুলি শুরু হয়। জুলাইয়ের পর সেটিই ছিল প্রথম বড় ধরনের পাল্টাপাল্টি হামলা।
জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল যুদ্ধবিরতি বাড়ানো। তবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও সেখানে জাহাজ চলাচল নিয়ে দুই দেশের ভিন্ন অবস্থানের কারণে সেই সমঝোতা দ্রুত ভেঙে যায়।
ট্রাম্পও নতুন করে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “ইরানের সঙ্গে করা আগের চুক্তি কাগজে লেখার মতও মূল্যবান নয়।”
অন্যদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র যদি আগের সমঝোতায় ফেরার অঙ্গীকার করে, তাহলে ইরানও সেরকম পদক্ষেপ নেবে।”
অর্থাৎ সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনার কথাও তেহরানের পক্ষ থেকে পুরোপুরি নাকচ করা হয়নি।
বাংলাদেশ জার্নাল/এনএম
