মৃত্যুর আগে দেওয়া জবানবন্দিতে যা বলেছিলো নুসরাত
ফেনীর সোনাগাজীর বহুল আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিলের শুনানি শেষে সোমবার (২৪ আগস্ট) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন।
রায়ে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার তৎকালীন বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা এবং আসামি শাহাদাত হোসেন শামীমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে চার আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপর ১০ আসামিকে খালাস দিয়েছেন উচ্চ আদালত।
হাইকোর্টের রায়ের পর নুসরাতের মৃত্যুর আগে দেওয়া শেষ জবানবন্দিটি আবারও আলোচনায় এসেছে। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থেকেও তিনি কীভাবে যৌন হয়রানির প্রতিবাদ এবং মামলা প্রত্যাহারে অস্বীকৃতির কথা জানিয়েছিলেন, সেই বর্ণনা মামলার নথিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত জবানবন্দিতে নুসরাত জানান, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা তাকে নিজের কক্ষে ডেকে নিয়ে শ্লীলতাহানি করেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে এর প্রতিবাদ করেন এবং বিষয়টি নিয়ে মামলা করেন। নুসরাতের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন ৬ এপ্রিল তার ভাইকে মাদ্রাসার মূল ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
জবানবন্দিতে হামলার বিবরণ দিতে গিয়ে নুসরাত জানান, বোরকা ও নেকাব পরা চারজন তাকে ফুসলিয়ে মাদ্রাসার ছাদে নিয়ে যায়। সেখানে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে করা অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করতে এবং মামলা প্রত্যাহারের জন্য তাকে চাপ দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি তাতে রাজি হননি। বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় অবস্থান জানান।
এরপর ওই ব্যক্তিরা তাকে ওড়না দিয়ে বেঁধে ফেলার চেষ্টা করে এবং তার শরীরে কেরোসিন ছুড়ে দেয়। পরে তার হাতে একটি গ্লাস ধরিয়ে দিয়ে শরীরে আগুন ধরিয়ে দিয়ে তারা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন নুসরাত।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২৭ মার্চ অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগে মামলা হওয়ার পর পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। মামলা প্রত্যাহারে অস্বীকৃতি জানানোর পর ৬ এপ্রিল পরীক্ষা চলাকালে মাদ্রাসার ছাদে নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় তাকে ঢাকায় শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল তিনি মারা যান।
নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে এ ঘটনায় মামলা করেন। ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল মামলার ১৬ আসামিকেই মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিলের শুনানির জন্য মামলাটি হাইকোর্টে আসে।
গত ২৮ জুলাই হাইকোর্টে এ মামলার শুনানি শুরু হয়। ২০ আগস্ট শুনানি শেষ হলে আদালত ২৪ আগস্ট রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন। সোমবার সেই রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা মামলাটির উচ্চ আদালতের পর্যায়ের বিচারিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলো।
কুশল/সাএ
