যে কারণে অভিবাসীর ঢল নেমেছে সেউতায়


মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে সাঁতরে ও স্থলপথে স্পেনের আফ্রিকাভিত্তিক ছিটমহল ‘সেউতা’য় প্রবেশ করেছেন প্রায় ৬০ হাজার মানুষ। নজিরবিহীন এই অভিবাসী ঢলের পর ইউরোপের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একাধিক ডানপন্থি নেতা দাবি করছেন- স্পেন সরকারের সাম্প্রতিক অভিবাসী ‘নিয়মিতকরণ’ (রেগুলারাইজেশন) কর্মসূচির কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে তথ্যানুসন্ধান ও বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, নিয়মিতকরণ নীতি নয়, বরং ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন ও আদালতের আইনি আদেশই এই সংকটের পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।

ইতালির কট্টর ডানপন্থি প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তায়ানি অভিযোগ করেছেন, স্পেনের বিশেষ এই অভিবাসী নীতি মানবপাচারকে উৎসাহিত করছে। তায়ানি এটিকে ‌‘ইউরোপীয় নাগরিকত্ব দেওয়ার ভুল সিদ্ধান্ত’ বলে আখ্যা দেন। একই সুর দেখা গেছে ফরাসী এমপিদের কণ্ঠেও।

আবেদন প্রক্রিয়া বন্ধ: স্পেন সরকারের এই কর্মসূচির আবেদন গ্রহণ জুনের শেষেই শেষ হয়েছে- অর্থাৎ এই ঘটনা ঘটার অন্তত এক মাস আগে। নতুনদের জন্য এই সুযোগে আবেদনের কোনো সুযোগ নেই।

নাগরিকত্ব নয়, কেবল রেসিডেন্স পারমিট: কর্মসূচির আওতায় কোনো নাগরিকত্ব দেওয়া হচ্ছে না, বরং শর্তপূরণ সাপেক্ষে এক বছরের জন্য নবায়নযোগ্য বসবাসের অনুমতি (রেসিডেন্স পারমিট) দেওয়া হচ্ছে।

মরক্কোর অভিবাসীদের অংশগ্রহণ কম: মোট ১২ লাখ আবেদনকারীর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ (প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ) মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার নাগরিক। মরক্কোর নাগরিকদের আবেদন মোট আবেদনের মাত্র ১৩ শতাংশ।

স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে মানুয়েল আলবারেস ইইউ নেতাদের এই বক্তব্যকে খণ্ডন করে বলেন, এটি ‘প্রকৃত তথ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, বরং দলীয় রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর।’

মরক্কো সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য না দিলেও পর্যবেক্ষক ও নীতি-নির্ধারকেরা সেউটায় হঠাৎ অভিবাসী ঢলের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন।

সুপ্রিম কোর্টের রায় ও আইনি জটিলতা: জুনের শেষে স্পেনের সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় যে, সমুদ্র থেকে অভিবাসীদের আটক করে কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই মরক্কোয় তাৎক্ষণিক ফেরত পাঠানো (‘পুশব্যাক’) বেআইনি। স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকারের মতে, আদালতের এই রায়ের ফলে সীমান্তে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে এক ধরনের শিথিলতা তৈরি হয়।

আলজেরিয়া সফর ও ভূরাজনৈতিক উত্তাপ: গত ২০ জুলাই স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ আলজেরিয়া সফর করেন। পশ্চিম সাহারা অঞ্চল নিয়ে আলজেরিয়ার সঙ্গে মরক্কোর দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বে সানচেজের এই সফর রাবাতকে (মরক্কো সরকার) ক্ষুব্ধ করে থাকতে পারে। ২০২১ সালেও কূটনৈতিক বিরোধের জের ধরে মরক্কো সীমান্তে কঠোরতা শিথিল করেছিল, যার ফলে দুই দিনে ১০ হাজার অভিবাসী সেউটায় ঢুকে পড়েছিলেন।

‘সিংহাসন দিবস’ ও গুজব: গত বৃহস্পতিবার মরক্কোর ‘সিংহাসন দিবস’ উপলক্ষে সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তার ধরন পরিবর্তিত হয়। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘সীমান্ত খুলে দেওয়া হয়েছে’ বলে গুজব ছড়িয়ে পড়লে বিপুলসংখ্যক মানুষ সীমান্তে জড়ো হন।

স্পেনের নিয়মিতকরণ পরিকল্পনার কঠোর সমালোচনা করলেও ইতালির নিজস্ব অভিবাসন নীতিতে স্ববিরোধী চিত্র দেখা গেছে। ফ্রান্স ভিত্তিক সংস্থাসমূহের তথ্যমতে, তীব্র শ্রমিক সংকট কাটাতে ইতালি সরকার নিজেই ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে কোটা কাঠামোর অধীনে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার নতুন রেসিডেন্স পারমিট ইস্যুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বর্তমানে মরক্কোর নিরাপত্তা বাহিনী সীমান্ত এলাকায় জলকামান ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে ইতোমধ্যে প্রবেশকারীদের মধ্যে ২৫ হাজারের বেশি মানুষকে মরক্কোয় ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং প্রতি মিনিটে গড়ে ১৫০ জন করে ফেরত যাচ্ছেন।

সূত্র: ইনফোমাইগ্রেন্টস

এমআরএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি,
স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা
পাঠানোর ঠিকানা –
[email protected]



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *