রংপুরে শিক্ষক পরিবার হত্যাকাণ্ডে মামলা, আটক ২


রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েলসহ তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে।

রোববার (২৩ আগস্ট) বিকেলে কোতোয়ালি থানায় নিহতের বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলাটি করেন।

কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল কাদের মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, প্রাথমিকভাবে অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত আসামিদের নাম মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

এদিকে এ ঘটনায় রোববার দুজনকে আটক করেছে মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। আটকরা হলেন- নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকার কানুদাসের ছেলে মুগ্ধ দাস (২৩) ও বিনয়চন্দ্র দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাস (১৯)।

রোববার দুপুরে মহানগর পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ প্রেস ব্রিফিংয়ে তাদের আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। সেখানে তিনি হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক কারণ ও ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেন।

পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির পাশের একটি ভবনের ছাদ দিয়ে তার বাড়ির ছাদে প্রবেশ করে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। সেখানে তারা ইয়াবা সেবন করছিল। এ সময় গণপতি চক্রবর্তী ছাদে উঠলে তাদের দেখে ফেলেন এবং বকাঝকা করেন।

পুলিশের দাবি, গণপতি চক্রবর্তী তাদের মাদক সেবনের বিষয়টি অন্যদের জানিয়ে দিতে পারেন—এমন আশঙ্কা থেকে তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় তারা। এক পর্যায়ে সঙ্গে থাকা গামছা দিয়ে তার গলায় পেঁচিয়ে ধরলে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। এ সময় শব্দ পেয়ে তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা ছাদে এলে তাকেও একইভাবে হত্যা করা হয়।

পুলিশ কমিশনার বলেন, ধস্তাধস্তির শব্দ পেয়ে তাদের মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী এগিয়ে এলে তাকেও হত্যা করা হয়। পরে ঘরে থাকা ১২ বছরের ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মকেও তারা হত্যা করে। পুলিশের ভাষ্য, প্রিয়ম তাদের চিনত এবং ভবিষ্যতে ঘটনা জানিয়ে দিতে পারে- এমন আশঙ্কা থেকেই তাকে হত্যা করা হয়।

হত্যাকাণ্ডের পর দুজন গণপতি চক্রবর্তীর বাসার ওয়াশরুমে গোসল করে এবং সেখানে বসে আবারও ইয়াবা সেবন করে বলে প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়। পরে তারা বাসার আসবাবপত্র তল্লাশি করে গহনা বের করে। সিদ্ধার্থ একটি স্বর্ণের দোকানে কাজ করায় আগুন দিয়ে গলিয়ে কোনটি আসল সোনা, তা শনাক্ত করে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশের দাবি, শুক্রবার জুমার নামাজের সময় লোকজন মসজিদে গেলে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ পাশের বাড়ির ছাদ ঘুরে সেখান থেকে বেরিয়ে যায়। এসময় তারা ডাউনিংয়ে বসে বয়ামে রাখা খেজুর খায়। এছাড়া মাদকের ভাব কমাতে ফ্রিজ থেকে শসা বের করে খায়।

যেভাবে উদ্ধার হয় চার মরদেহ

শনিবার (২২ আগস্ট) দিনগত রাতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েলসহ চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। গণপতির মরদেহ তার নিজস্ব দোতলা বাড়ির ছাদে পাওয়া যায়। তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা (৫০) ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থীর (২৫) মরদেহ ছিল ছাদে ওঠার সিঁড়িতে। আর ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মের (১২) মরদেহ পাওয়া যায় খাটের নিচে।

স্থানীয়রা জানান, কয়েকদিন ধরে স্কুলশিক্ষকের বাসাটি তালাবদ্ধ ছিল। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকে পরিবারের কাউকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। শনিবার রাত ৯টার দিকে বাড়ির ভেতর থেকে দুর্গন্ধ বের হলে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। পরে স্বজন ও পুলিশকে খবর দেওয়া হলে পুলিশ গিয়ে তালা ভেঙে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে। এ সময় বাসার ভেতরে আসবাবপত্র ও বিভিন্ন জিনিসপত্র এলোমেলো অবস্থায় পাওয়া যায়।

নিহত প্রীতিলতার বোন পূজা চক্রবর্তী জানান, বৃহস্পতিবার রাতে সর্বশেষ মুঠোফোনে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা হয়েছিল। শনিবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে সব ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরে রাত ৯টার দিকে স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে গিয়ে প্রধান গেট বাইরে থেকে তালাবদ্ধ দেখতে পান। পরে ৯৯৯-এ কল করলে কোতোয়ালি থানায় যোগাযোগ করতে বলা হয়। এ সময় বাড়িটির বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন ছিল বলে জানান তিনি।

খবর পেয়ে কোতোয়ালি থানা পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আলামত সংগ্রহ ও হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে কাজ শুরু করে। পরে রোববার দুজনকে আটকের কথা জানায় পুলিশ।

জানা গেছে, গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। গতবছরের ডিসেম্বরে তিনি শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর যান। এরপর তিনি রংপুর সমবায় মার্কেটে একটি হোমিওপ্যাথি চেম্বারে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দিতেন।

গণপতি চক্রবর্তীর মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী কারমাইকেল কলেজের মাস্টার্স ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি মাস্টার্স সম্পন্ন করে চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণিতে পড়তো।

জিতু কবীর/কেএইচকে/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *