রাজনীতিতে মেধা ও দক্ষতার মূল্যায়নের প্রস্তাব
একটি দেশ কখন সত্যিকার অর্থে দুর্বল হয়ে পড়ে? যখন তার অর্থনীতি সংকটে পড়ে, রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ে, প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে যায়, নাকি যখন তার মানুষ রাষ্ট্র ও একে অন্যের ওপর থেকে আস্থা হারাতে শুরু করে?
সম্ভবত শেষের প্রশ্নটিই সবচেয়ে গভীর। কারণ অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করা যায়, সরকার পরিবর্তন করা যায়, আইন সংশোধন করা যায়, নতুন প্রতিষ্ঠানও তৈরি করা যায়। কিন্তু মানুষের মনে যখন এই ধারণা জন্ম নেয় যে নিয়ম মেনে চলেও লাভ নেই, যোগ্যতার চেয়ে পরিচয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ, ক্ষমতাবানের জন্য আইন এক রকম আর সাধারণ মানুষের জন্য আরেক রকম, তখন সংকট আর শুধু সরকারের মধ্যে থাকে না, তা সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ আজ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন শুধু কে ক্ষমতায় থাকবে সেই প্রশ্ন করলেই চলবে না। আরও গভীরে গিয়ে প্রশ্ন করতে হবে, আমরা কেমন রাষ্ট্র চাই এবং সেই রাষ্ট্র পরিচালনার বর্তমান কাঠামোটি কি আমাদের সেই রাষ্ট্র দিতে সক্ষম?
আমরা বহুবার সরকার পরিবর্তন দেখেছি, রাজনৈতিক সমীকরণ বদলেছে, নতুন প্রতিশ্রুতি এসেছে, মানুষ নতুন আশায় বুক বেঁধেছে। কিন্তু কিছুদিন পর পুরোনো হতাশা ফিরে এসেছে। তখন প্রশ্ন ওঠে, সমস্যা কি শুধু মানুষের, নাকি ব্যবস্থার মধ্যেও এমন কিছু আছে, যা পরিবর্তন না করলে একই সংকট বারবার ফিরে আসবে?
বাংলাদেশে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা রয়েছে। জনগণ ভোট দিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচন করেন, সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সরকার গঠিত হয় এবং প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা রাষ্ট্রের নির্বাহী কার্য পরিচালনা করে। সংবিধান অনুযায়ী মন্ত্রিসভা সংসদের কাছে যৌথভাবে দায়ী এবং মন্ত্রিসভায় সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি সীমিত সংখ্যায় সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদেরও অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
এই ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার একটি স্বীকৃত পদ্ধতি। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। একজন ব্যক্তি যখন প্রথমে একটি নির্দিষ্ট নির্বাচনি এলাকার ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং পরে সরকারপ্রধানের আস্থায় মন্ত্রী হন, তখন তার ওপর একই সঙ্গে দুটি ভিন্ন ধরনের দায়িত্ব এসে পড়ে।
একদিকে তিনি তার নির্বাচনি এলাকার জনগণের প্রতিনিধি, অন্যদিকে তিনি পুরো দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারক।
সংসদ সদস্য হিসেবে তার দায়িত্ব নিজের এলাকার মানুষের কথা সংসদে তুলে ধরা, আইন প্রণয়নে অংশ নেওয়া এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। কিন্তু মন্ত্রী হিসেবে তার দায়িত্ব সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিসরের। তিনি তখন আর শুধু একটি এলাকার প্রতিনিধি নন, পুরো দেশের মানুষের জন্য নীতি তৈরি ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, কৃষি, শিল্প, অবকাঠামো, কর্মসংস্থান কিংবা প্রযুক্তি কোনো একটি নির্বাচনি এলাকার বিষয় নয়, এগুলো জাতীয় দায়িত্ব।
এখানেই সমস্যাটি শুরু হয়। একজন মন্ত্রী যখন একই সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট এলাকার নির্বাচিত প্রতিনিধি, তখন নিজের নির্বাচনি এলাকার রাজনৈতিক প্রত্যাশা, দলের স্বার্থ এবং সরকারপ্রধানের আস্থা ধরে রাখার চাপ তার জাতীয় দায়িত্বের সঙ্গে সংঘর্ষে আসতে পারে।
বাস্তবে আমরা দেখেছি, ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী ও প্রভাবশালী নেতারা নিজেদের নির্বাচনি এলাকার উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেন, আর বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির প্রভাবাধীন এলাকা অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত গুরুত্ব থেকে বঞ্চিত হয়। এর ফলে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও উন্নয়ন জাতীয় অধিকার না হয়ে রাজনৈতিক আনুকূল্যের বিষয় হয়ে ওঠে। তখন নাগরিকও যোগ্যতা বা নীতির ভিত্তিতে ভোট দেওয়ার বদলে হিসাব করেন, কে ক্ষমতায় যাবে এবং ক্ষমতায় গেলে আমার কী পাওয়া যাবে।
এভাবে গণতন্ত্রের সঙ্গে ব্যক্তিগত সুবিধার একটি অস্বাস্থ্যকর সম্পর্ক তৈরি হয়। একজন নাগরিক রাষ্ট্রের কাছ থেকে তার অধিকার দাবি করার বদলে ক্ষমতাবান ব্যক্তির কাছ থেকে সুবিধা পাওয়ার পথ খোঁজেন। আর রাজনীতিবিদও জাতীয় নীতির চেয়ে নিজের রাজনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করার প্রয়োজনকে বেশি গুরুত্ব দিতে পারেন। এই সংস্কৃতি শুধু দুর্নীতিকে উৎসাহিত করে না, রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থাকেও ধীরে ধীরে ক্ষয় করে।
তাহলে প্রশ্ন হলো, সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রী, এই দুটি দায়িত্ব কি সবসময় একই ব্যক্তির হাতে থাকতে হবে? আমাদের হয়তো এই প্রশ্নটি সাহসের সঙ্গে করা দরকার।
এর অর্থ নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের গুরুত্ব কমানো নয়। বরং তাদের প্রকৃত ভূমিকা আরও স্পষ্ট করা। জনগণ ভোট দিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচন করবেন। জনগণ যদি মনে করেন, একজন ব্যক্তি সংসদে গিয়ে তাদের অধিকার রক্ষা করবেন, দেশের স্বার্থকে ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখবেন এবং রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্বশীল থাকবেন, তাহলে তাকেই তারা সংসদে পাঠাবেন। এটাই হওয়া উচিত গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি।
কিন্তু বাস্তবতার প্রশ্ন হলো, আমরা কি আজ সেই জায়গায় আছি? যখন ভোটের সঙ্গে স্থানীয় সুবিধা, রাজনৈতিক প্রভাব, দলীয় আনুগত্য এবং ক্ষমতার সঙ্গে ব্যক্তিগত লাভের প্রত্যাশা জড়িয়ে যায়, তখন জনগণের সামনে যোগ্যতার ভিত্তিতে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে আমরা এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আটকে যাই, যেখানে কে দেশের জন্য সবচেয়ে যোগ্য, তার চেয়ে কে ক্ষমতায় যাবে এবং ক্ষমতায় গেলে কী পাওয়া যাবে, সেটিই বড় হয়ে ওঠে।
এই জায়গাটিই পরিবর্তন করতে হবে। সংসদ সদস্যরা জনগণের প্রতিনিধি হিসেবেই থাকবেন। তারা আইন প্রণয়ন করবেন, সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করবেন এবং জনগণের অধিকার রক্ষা করবেন। কিন্তু মন্ত্রী হওয়ার ক্ষেত্রে শুধু নির্বাচনে জয়ী হওয়াকে যথেষ্ট যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা না করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, সততা ও নেতৃত্বের সক্ষমতাকে প্রধান মানদণ্ড করা যেতে পারে।
একজন ভালো সংসদ সদস্য ভালো মন্ত্রী নাও হতে পারেন। আবার একজন অসাধারণ মন্ত্রী হওয়ার মতো দক্ষ ব্যক্তি নির্বাচনে জয়ী নাও হতে পারেন। এই বাস্তবতাকে স্বীকার করাই একটি পরিণত রাষ্ট্রব্যবস্থার লক্ষণ।
আমরা একজন চিকিৎসক নিয়োগের সময় তার রাজনৈতিক পরিচয় দেখি না, তার দক্ষতা দেখি। একজন প্রকৌশলীকে দায়িত্ব দেওয়ার সময় তিনি কত ভোট পেয়েছেন তা বিবেচনা করি না, তার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিবেচনা করি। একজন পাইলটকে বিমানের দায়িত্ব দেওয়ার আগে তার রাজনৈতিক আনুগত্য যাচাই করি না, তার প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা যাচাই করি। তাহলে রাষ্ট্র পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে দক্ষতার বিষয়টি কেন আলাদা হবে?
অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এমন একজনের হাতে দেওয়া কি বেশি যুক্তিযুক্ত নয়, যিনি অর্থনীতি, রাজস্বনীতি, ব্যাংকিং, বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখেন? স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য এমন একজনের প্রয়োজন নেই কি, যিনি স্বাস্থ্যব্যবস্থা পরিচালনা ও জনস্বাস্থ্য সম্পর্কে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রাখেন? শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কি এমন একজনের হাতে দেওয়া উচিত নয়, যিনি শিক্ষা, গবেষণা, মানবসম্পদ ও ভবিষ্যৎ কর্মবাজার সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান রাখেন?
এখানে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসতে পারে, “সংসদের বাইরে থেকে মন্ত্রী আনলে তাহলে জনগণের ভোটের ভূমিকা কোথায়?”
উত্তরটি খুব পরিষ্কার: জনগণের ভোটের ভূমিকা থাকবে আরও গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়। জনগণ যোগ্য সংসদ সদস্য নির্বাচন করবেন, আর সেই নির্বাচিত সংসদ সদস্যরাই রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যোগ্য ব্যক্তিদের মধ্য থেকে মন্ত্রী নির্বাচন করবেন। অর্থাৎ জনগণের প্রতিনিধি থাকবেন জনগণের ভোটে, আর রাষ্ট্র পরিচালনার বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হবে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে।
এতে জনগণের ভোটের গুরুত্ব কমবে না, বরং সংসদ সদস্যের দায়িত্ব আরও বাড়বে। তিনি শুধু নিজের এলাকার প্রতিনিধি নন, তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যোগ্য মানুষ বেছে নেওয়ারও দায়িত্বশীল প্রতিনিধি। একজন সংসদ সদস্যের যোগ্যতা তখন শুধু বক্তৃতা দেওয়া বা নিজের এলাকায় উন্নয়ন প্রকল্প আনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তাকে রাষ্ট্রের জন্য সঠিক মানুষ বেছে নেওয়ার সক্ষমতাও প্রমাণ করতে হবে।
তাহলে পরের প্রশ্ন, যোগ্য মন্ত্রী বাছাই করবে কে? আমার প্রস্তাব, সেই দায়িত্বের কেন্দ্রীয় ভূমিকা থাকবে সংসদ সদস্যদের হাতে, কারণ তারাই জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি। তবে প্রক্রিয়াটি হতে হবে স্বচ্ছ ও যোগ্যতাভিত্তিক। সম্ভাব্য মন্ত্রীর শিক্ষাগত ও পেশাগত যোগ্যতা, সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা, সম্পদের বিবরণ, স্বার্থের সংঘাত, পূর্ববর্তী কর্মকাণ্ড, সততা এবং জাতীয় স্বার্থে কাজ করার সক্ষমতা যাচাই করতে হবে। সংসদে সেই যোগ্যতা নিয়ে আলোচনা হতে পারে এবং নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মতামত ও সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে মন্ত্রী নির্বাচন করা যেতে পারে।
তাহলে মন্ত্রী হওয়া আর কোনো ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পুরস্কার থাকবে না; এটি হবে একটি জাতীয় দায়িত্ব। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী সরকারপ্রধান হিসেবে মন্ত্রিসভার নীতি ও সমন্বয়ের নেতৃত্ব দেবেন, কিন্তু মন্ত্রী নির্বাচন যেন কেবল ব্যক্তিগত আনুগত্যের ওপর নির্ভরশীল না হয়। মন্ত্রীরা সংসদের কাছে জবাবদিহি করবেন, তাদের মন্ত্রণালয়ের নীতি, বাজেট, প্রকল্প ও কার্যক্রম সম্পর্কে নিয়মিত ব্যাখ্যা দিতে হবে। গুরুতর অনিয়ম, অযোগ্যতা বা স্বার্থের সংঘাত প্রমাণিত হলে পদে থাকার নিশ্চয়তা থাকা উচিত নয়।
সংসদের বাইরে থেকে মন্ত্রী আসতে পারেন, কিন্তু সংসদের জবাবদিহির বাইরে থাকতে পারবেন না। এটি কোনো বিশেষজ্ঞ সরকার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব নয়, গণতন্ত্রের জায়গায় টেকনোক্র্যাট বসানোর প্রস্তাবও নয়। জনগণের ভোট, সংসদ এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হিসেবেই থাকবে। পরিবর্তনটি হবে শুধু এতটুকু, নির্বাচিত হওয়া এবং একটি নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয় পরিচালনার যোগ্যতা, এই দুটি বিষয়কে আর এক করে দেখা হবে না।
এর ফলে সংসদ সদস্যের ভূমিকাও বদলাতে পারে। তিনি আর মন্ত্রণালয়ের দরজায় দাঁড়িয়ে নিজের এলাকার জন্য প্রকল্প আনার প্রতিযোগিতায় থাকবেন না। তার প্রধান দায়িত্ব হবে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করা, ভালো আইন তৈরি করা, সরকারের ভুল ধরিয়ে দেওয়া এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা। আর মন্ত্রীর প্রধান দায়িত্ব হবে তার মন্ত্রণালয়কে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা এবং পুরো দেশের মানুষের জন্য ন্যায়সংগত নীতি বাস্তবায়ন করা।
তখন একজন নাগরিক হয়তো আর শুধু প্রশ্ন করবেন না, “কে আমার এলাকায় কী এনে দেবে?” তিনি প্রশ্ন করবেন, “কে ভালো আইন করবে? কে দুর্নীতি কমাবে? কে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা উন্নত করবে? কে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে? কে আমার সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য ভালো রাষ্ট্র তৈরি করবে?” এটাই হতে পারে রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি বড় পরিবর্তন।
কারণ রাজনীতির উদ্দেশ্য ক্ষমতা অর্জন নয়, দেশ ও দশের কল্যাণ। রাজনীতি মানুষের জন্য, ক্ষমতা মানুষের সেবা করার জন্য এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ জনগণের সম্পদ। সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে যে সংস্কার প্রয়োজন, তা করতে রাজনৈতিক সাহসও থাকতে হবে।
আজ আমরা অনেক সময় ভোট দিই কে ক্ষমতায় গেলে আমাদের কী সুবিধা হবে, সেই হিসাব করে। কিন্তু একটি পরিণত গণতন্ত্রে ভোট হওয়া উচিত কে সবচেয়ে যোগ্যভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারে, সেই বিবেচনায়। রাষ্ট্রীয় সম্পদ কোনো মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, কোনো নির্বাচনি এলাকার রাজনৈতিক পুরস্কারও নয়। এটি পুরো দেশের মানুষের সম্পদ।
অবশ্যই শুধু মন্ত্রী নিয়োগের পদ্ধতি বদলালেই দুর্নীতি শেষ হবে না। প্রয়োজন স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, কার্যকর সংসদীয় কমিটি, স্বচ্ছ সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা, শক্তিশালী দুর্নীতি দমন ব্যবস্থা, রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা, সম্পদের হিসাব এবং আইনের সমান প্রয়োগ। কিন্তু রাষ্ট্রের কাঠামো এমনভাবে সাজানো দরকার, যেন রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে যোগ্যতা ও জাতীয় স্বার্থ রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে।
কারণ ভালো মানুষ দিয়ে পুরোনো কাঠামো চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে, ভালো মানুষকে ভালো কাঠামোর মধ্যে দায়িত্ব দেওয়াই প্রকৃত রাষ্ট্র সংস্কার।
আমরা অনেক সময় ভাবি, দেশ বদলাতে হলে একজন ভালো নেতা দরকার। হয়তো সময় এসেছে আরও বড় একটি প্রশ্ন করার: এমন একটি রাষ্ট্র কি তৈরি করা যায়, যেখানে দেশ ভালো থাকার জন্য একজন অসাধারণ নেতার অপেক্ষা করতে হবে না?
এমন রাষ্ট্র, যেখানে প্রতিষ্ঠান ব্যক্তি থেকে শক্তিশালী। যেখানে মন্ত্রী পদ রাজনৈতিক পুরস্কার নয়, জাতীয় দায়িত্ব। যেখানে সংসদ সদস্য জনগণের প্রতিনিধি, কিন্তু রাষ্ট্রীয় সম্পদ বণ্টনের ব্যক্তিগত দরজারক্ষী নন। যেখানে মন্ত্রী হওয়ার প্রধান প্রশ্ন, “তিনি কার লোক?” নয়, “তিনি কতটা যোগ্য?” যেখানে বিরোধী দলের নাগরিকও একই রাষ্ট্রের সমান নাগরিক। যেখানে ক্ষমতায় থাকা মানুষ জানেন, ক্ষমতা স্থায়ী নয়, কিন্তু প্রতিষ্ঠান স্থায়ী।
বাংলাদেশের সামনে তাই শুধু সরকার পরিবর্তনের প্রশ্ন নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতিকে আরও কার্যকর, দক্ষ ও ন্যায়ভিত্তিক করার প্রশ্নও আছে। আমরা যদি সত্যিই মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে চাই, তাহলে শুধু ভালো নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতি দিলে হবে না, এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি করতে হবে যেখানে যোগ্যতা, সততা ও জাতীয় স্বার্থের মূল্য থাকবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কে ক্ষমতায় যাবে, তা নয়। ক্ষমতায় যে-ই যাক, রাষ্ট্র কি এমনভাবে তৈরি করা যাবে, যাতে সে রাষ্ট্রকে নিজের মতো করে নিতে না পারে?
যদি সেই ব্যবস্থা আমরা তৈরি করতে পারি, তাহলে সরকার বদলাবে, নেতৃত্ব বদলাবে, রাজনৈতিক দল বদলাবে, কিন্তু রাষ্ট্র তার নাগরিকের প্রতি দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হবে না।
সেদিন মানুষ শুধু নতুন সরকারকে বিশ্বাস করবে না। মানুষ রাষ্ট্রকে বিশ্বাস করতে শুরু করবে। আর একটি জাতির পুনর্জাগরণ শুরু হয় ঠিক সেখান থেকেই, যখন তার মানুষ আবার বিশ্বাস করতে শেখে যে রাষ্ট্রটি কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর নয়, রাষ্ট্রটি তাদের সবার।
রহমান মৃধা
গবেষক ও লেখক
সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
এমআরএম
