লার্ভার হার কমলেও সিলেটে ডেঙ্গুর ঝুঁকি কাটেনি
বিশ্ব মশা দিবস উপলক্ষে ২০ আগস্ট (বৃহস্পতিবার) সিলেট নগরীর এডিস মশা পরিস্থিতিতে মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। একদিকে গত বছরের তুলনায় নগরীতে এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি কিছুটা কমেছে, অন্যদিকে একই সময়ে সিলেট বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। ফলে লার্ভার হার কমার সংবাদটি স্বস্তিদায়ক হলেও এডিসবাহিত এই রোগের ঝুঁকি এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
সিলেট সিটি করপোরেশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে নগরীতে বর্তমানে ১০টি টিম নিয়মিত মশকনিধন কার্যক্রমে কাজ করছে। শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন দুই বেলা নির্ধারিত সময়ে মশার ওষুধ ছিটানো হচ্ছে, তবে বৃষ্টির দিনে এই কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়।
তাদের তথ্যমতে, নগরীর ১ থেকে ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের প্রায় ১৭ হাজার বাড়িতে মশকনিধনের ওষুধ স্প্রে করা হয়েছে। পাশাপাশি নিয়মিত লার্ভা সার্ভে চালানো হচ্ছে। গত বছর ৬ শতাংশ বাড়িতে লার্ভা পাওয়া গেলেও এবার তা কমে ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে বলে জানানো হয়।
লার্ভা পাওয়া গেলে বাড়ির মালিকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, বরং সচেতনতার ওপরই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে সিটি করপোরেশন। বাসাবাড়ির আশপাশে পানি জমে থাকা এড়িয়ে এডিস মশার প্রজননস্থল তৈরি না হতে দেওয়ার বিষয়ে বাসিন্দাদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে বলেও জানানো হয়।
বর্তমানে মশকনিধনে ব্যবহৃত কীটনাশক ও ওষুধের মজুত দিয়ে ১৫ দিন থেকে এক মাস পর্যন্ত কার্যক্রম চালানো সম্ভব বলে জানিয়েছেন সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম। নতুন অর্থবছর শুরু হওয়ায় প্রয়োজনীয় কীটনাশক ও ওষুধের জন্য আবেদন করা হয়েছে এবং দ্রুতই নতুন সরবরাহ পাওয়া যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘‘আমরা চেষ্টা করছি কার্যক্রম আরও জোরদার করতে। নগরবাসীর সহযোগিতা পেলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসবে। প্রথম পর্যায়ে চলা মশক নিধন অভিযান হওয়ায় আমরা এখন লার্ভা পাওয়া বাড়ির মালিকদের সচেতন করছি, শাস্তির আওতায় আনছি না।’’
তিনি বলেন, ‘‘গত বছরের তুলায় এ বছর লার্ভা পাওয়ার হারও কিছুটা কমেছে আর সিলেট সিটি এলাকায় এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়নি, তাই আমরা মনে করছি, আমাদের কাজে সফলতা আসছে।’’ তারপরও যদি কারো ডেঙ্গু শনাক্ত হয় নিয়মনুযায়ী যা যা করা প্রয়োজন করবেন বলে জানান এ কর্মকর্তা।
লার্ভার হার কমলেও স্বস্তি মিলছে না ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত সিলেট বিভাগে ১৬৪ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। জেলাভিত্তিক হিসাবে এর মধ্যে সিলেট জেলায় ৩১ জন, সুনামগঞ্জে ৩৩ জন, হবিগঞ্জে ৭৫ জন এবং মৌলভীবাজারে ২০ জন। এ ছাড়া বিভাগের বাইরে থেকে এসে সিলেটে চিকিৎসা নেওয়া আরও পাঁচজন রোগীও রয়েছেন এই তালিকায়।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে তিনজনের শরীরে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে একজন চিকিৎসাধীন আছেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, একজন নর্থ ইস্ট মেডিকেল হাসপাতালে এবং একজন হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে।
বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ১৩ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চারজন, হবিগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে তিনজন, লাখাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুজন; নর্থ ইস্ট মেডিকেল হাসপাতাল, জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে একজন করে ভর্তি আছেন।
চলতি বছর সিলেট বিভাগে ডেঙ্গুতে এখন পর্যন্ত একজনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত ব্যক্তি সিলেট জেলার বাসিন্দা এবং সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
সুবিদবাজার এলাকার বাসিন্দা ওয়াসিম আহমদ বলেন, মশার উপদ্রব পুরোপুরি কমেনি। বিশেষ করে বৃষ্টির পর বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে থাকায় মশার সংখ্যা বাড়ে। সিটি করপোরেশন নিয়মিত ওষুধ ছিটালে এবং নালা-নর্দমা পরিষ্কার রাখলে পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে তিনি মনে করেন।
আখালিয়া এলাকার বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘‘বাড়ির ভেতরে আমরা যতটা সম্ভব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখি। কিন্তু আশপাশে পানি জমে থাকলে মশার উৎপাত থেকে রক্ষা পাওয়া কঠিন। ডেঙ্গুর ঝুঁকি থাকায় সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি নগরবাসীকেও সচেতন হতে হবে।’’
নিয়মিত মশকনিধন কার্যক্রম আরও জোরদার করা দরকার বলে মত দেন তিনি।
এ ব্যাপারে সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মো. মাহবুবুল আলম বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে আমরা সার্বক্ষণিকভাবে খোঁজখবর রাখছেন এবং প্রতিদিনের হালনাগাদ তথ্য পর্যালোচনা করছেন। আক্রান্তের সংখ্যা যাতে আর না বাড়ে, সেজন্য জেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, ‘‘নগরবাসীকে অনুরোধ করব, বাড়ির আশপাশে যেন কোনোভাবে পানি জমে না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে। উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।’’
