লোডশেডিংয়ে মাছ মারা যাওয়া নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, তদন্ত কমিটি গঠন
যশোরের শার্শায় মৎস্যঘেরে সাড়ে ১৫ কোটি টাকার মাছ মারা যাওয়ার ঘটনায় লোডশেডিংকে দায়ী করছেন ঘেরমালিকরা। তবে বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, মাছ মারা যাওয়ার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই এবং লোডশেডিংয়ের কারণে মাছ মারা যাওয়ার অভিযোগ ‘মিথ্যা ও ভিত্তিহীন’। পাল্টাপাল্টি এই দাবির মধ্যে প্রকৃত কারণ ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন।
সোমবার (২৪ আগস্ট) সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসকের মিডিয়া সেলে দেওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান খান এ তথ্য জানান। তিনি জানান, কমিটিকে আগামী দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
এর আগে, গত শুক্রবার (২১ আগস্ট) দিনগত রাত ১টার দিকে শার্শা উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের রায়পুর-সোনামুখো বিলে এ এফ মৎস্য খামারে মাছের মড়ক শুরু হয়। শনিবার সকালে ঘেরের পানিতে বিপুলসংখ্যক মৃত মাছ ভেসে ওঠে।
ঘেরমালিকদের ভাষ্য, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ঘেরে প্যাডেল হুইল এয়ারেটর বা অক্সিজেন সরবরাহের যন্ত্র চালানো সম্ভব হয়নি। এর সঙ্গে বৈরী আবহাওয়ার কারণে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা দ্রুত কমে যায়। এতে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিপুলসংখ্যক মাছ মারা যায়।
সোনামুখো বিলের ক্ষতিগ্রস্ত এ এফ মৎস্য খামারটি যৌথভাবে গড়ে তুলেছেন আলফাজুল হক ও ফারুক হোসেন।
ঘেরমালিকদের দাবি, এতে প্রায় সাড়ে ১৫ কোটি টাকার মাছের ক্ষতি হয়েছে। তাদের হিসাবে, ২০০ বিঘা আয়তনের ঘেরে প্রায় ৬০ লাখ পাবদা মাছ চাষ করা হয়েছিল। প্রতি ১৫টি পাবদা মাছের ওজন প্রায় এক কেজি ধরে মোট উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার মণ। প্রতি মণ মাছের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১৫ হাজার টাকা হিসাবে পাবদা মাছের মূল্য প্রায় ১৫ কোটি টাকা। অন্যান্য প্রজাতির মাছসহ মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১৫ কোটি টাকা বলে দাবি তাদের।
খামারমালিক আলফাজুল হক বলেন, ঘেরের মাছের বড় একটি অংশ বিক্রির উপযোগী হয়ে উঠেছিল। মাছ মারা যাওয়ার আগের দিন কয়েক ঘণ্টা বৃষ্টির পর মেঘাচ্ছন্ন আকাশে তীব্র গরম হয়ে ওঠে। এরপর ঘন ঘন লোডশেডিং হয়। এতে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবস্থা না থাকাও ভুল ছিল বলে স্বীকার করেন তিনি। আলফাজুল হক বলেন, মাছের খাদ্য বাবদ বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার মালামাল বাকিতে নেওয়া হয়েছে। মাছ মারা যাওয়ায় সেই ঋণ কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
তবে লোডশেডিংয়ের কারণে মাছ মারা গেছে—এমনটা মানতে নারাজ যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান খান।
তিনি বলেন, ‘ঘেরে মাছ মারা যাওয়ার ঘটনার সঙ্গে বিদ্যুৎ বিভাগের কোনো সংযোগ নেই। বিদ্যুৎ বন্ধ থাকার কারণে মাছ মারা যাওয়ার ঘটনা মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। ঘটনার দিন ৪০ মিনিট বিদ্যুৎ বন্ধ ছিল। একই বিতরণ লাইনে আরও ১২টি মৎস্যঘের রয়েছে; সেখানে কোনো ধরনের সমস্যা হয়নি।’
এদিকে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে শার্শা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছে জেলা প্রশাসন। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন—নাভারণ সার্কেলের এএসপি, উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা, ওজোপাডিকো-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী ও উপজেলা আইসিটি কর্মকর্তা।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, ‘ক্ষয়ক্ষতি ও মাছ মারা যাওয়ার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে উচ্চপর্যায়ে পাঁচ সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। দ্রুত রিপোর্ট দিলেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
যশোরের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুল মামুন বলেন, ‘বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা বলছে, ৪০ মিনিট লোডশেডিং ছিল। ঘেরের পানির ঘনত্ব কম থাকলে ৪০ মিনিটে মড়ক লাগতে পারে; তবে এমনভাবে মাছ মারা যাওয়ার কথা নয়।’
মিলন রহমান/কেএইচকে
