শেয়ারবাজারে ধস, ব্যতিক্রম ১৪ প্রতিষ্ঠান
সকালটা যেন শুরু হয়েছিল স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বদলে যেতে থাকে শেয়ারবাজারের চিত্র। একের পর এক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর কমতে থাকে। বিক্রির চাপ বাড়ে, কমে যায় লেনদেনের গতি। দিন শেষে বাজারজুড়ে যেন লাল রঙের আধিপত্য।
এটি সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবস সোমবার (২৪ আগস্ট) দেশের শেয়ারবাজারের চিত্র। এদিন দেশের শেয়ারবাজারে রীতিমত ধস নেমেছে। ব্যাংক, বিমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ওষুধ, বস্ত্র, আইটি, মিউচুয়াল ফান্ডসহ সব খাতের বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমার পাশাপাশি মূল্যসূচকের বড় পতন হয়েছে।
এই ধসের মধ্যে প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) দাম বাড়ার তালিকায় নাম লেখাতে পেরেছে মাত্র ১৪টি প্রতিষ্ঠান। ফলে বাজারটিতে মূল্যসূচকের বড় পতন হয়েছে। সেই সঙ্গে কমেছে লেনদেনের পরিমাণ। অন্য শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) দাম বেড়েছে মাত্র ২১টি প্রতিষ্ঠানের। ফলে এ বাজারেও মূল্যসূচকের বড় পতন হয়েছে।
দিনের লেনদেন শেষে ধস নামলেও দিনের শুরুটা ছিল বেশ ভালো। ডিএসইতে লেনদেন শুরু হয় বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়ার মাধ্যমে। ফলে লেনদেনের শুরুতে সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার দেখা মেলে। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দাম বাড়ায় ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ১০ পয়েন্ট বেড়ে যায়।
তবে অল্প সময়ের মধ্যে বদলে যায় বাজারের চিত্র। লেনদেনের সময় গড়ানোর সঙ্গে পতনের মাত্রও বেড়ে যায়, যা অব্যাহত থাকে লেনদেনের শেষ পর্যন্ত। ফলে ধস দিয়েই শেষ হয় বাজারের লেনদেন।
দিনের লেনদেন শেষে ডিএসই মাত্র ১৪টি প্রতিষ্ঠান দাম বাড়ার তালিকায় নাম লিখিয়েছে। বিপরীতে ৩৫৫টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমেছে। আর ১৮টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।
দাম কমার তালিকা বড় হওয়ায় ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ৭৮ পয়েন্ট পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৬৪৩ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। অন্য দুই সূচকের মধ্যে বাছাই করা ভালো ৩০ কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক আগের দিনের তুলনায় ১৪ পয়েন্ট কমে ২ হাজার ১৩০ পয়েন্টে নেমে গেছে। আর ডিএসই শরিয়াহ সূচক ১৬ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ১২৩ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
মূল্যসূচকের বড় পতন হওয়ার পাশাপাশি ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণও কমেছে। বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ৬০১ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ৭১১ কোটি ১৪ লাখ টাকা। এ হিসাবে আগের কার্যদিবসের তুলনায় লেনদেন কমেছে ১০৯ কোটি ১৭ লাখ টাকা।
এই লেনদেনে সব থেকে বড় ভূমিকা রেখেছে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার। কোম্পানিটির ২৬ কোটি ২৯ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা সায়হাম টেক্সটাইলের শেয়ার লেনদেন হয়েছে ১৮ কোটি ৯২ লাখ টাকার। ১৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেনের মাধ্যমে তৃতীয় স্থানে রয়েছে এমএল ডাইং।
এছাড়া ডিএসইতে লেনদেনের দিক থেকে শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে- ফার কেমিক্যাল, প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল, বেক্সিমকো, রানার অটোমোবাইল, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং, সামিট এলায়েন্স পোর্ট এবং ব্র্যাক ব্যাংক।
লাল বাজারে সবুজের ছোঁয়া
বাজারের এমন বড় পতনের দিনে মাত্র ১৪ প্রতিষ্ঠানই ছিল ‘সবুজ’ ব্যতিক্রম। তবে তাদের দাম বাড়া পুরো বাজারের পতনের চিত্রকে বদলে দেওয়ার মতো ছিল না। বরং বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের দরপতনের ভিড়ে তাদের ঊর্ধ্বমুখী অবস্থান ছিল বিচ্ছিন্ন কিছু ব্যতিক্রম। অন্যদিকে ১৮টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দাম অপরিবর্তিত থাকায় বাজারে সক্রিয় ক্রেতার তুলনায় বিক্রেতাদের আধিপত্যই স্পষ্ট হয়েছে।
এদিন দাম বাড়ার তালিকায় স্থান হওয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে- মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক, একমি পেস্টিসাইড, বেক্সিমকো, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং, আইএফআইএল ইসলামীক মিউচুয়াল ফান্ড-১, সায়হাম টেক্সটাইল, আরএকে সিরামিক, প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল, অলটেক্স, হামি, ম্যারিকো, সিটি জেনারেল ইন্স্যুরেন্স এবং ইবনেসিনা।
চট্টগ্রামেও স্বস্তি নেই
শুধু ঢাকার বাজার নয়, একই চিত্র দেখা গেছে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও। সিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ১৯১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ২১টির শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। বিপরীতে ১৫৯টির দাম কমেছে এবং ১১টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। এতে সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই কমেছে ১৭৩ পয়েন্ট। লেনদেন হয়েছে ১৪ কোটি ৮২ লাখ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।
কোথায় যাচ্ছে বাজার?
শুধু সোমবার নয়, শেয়াবাজারে এই দরপতন চলছে গত সপ্তাহ থেকেই। ফলে এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠছে এই পতন কোথায় গিয়ে থামবে? এই দরপতনের কারণ জানতে চাইলে মিডওয়ে সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আশিকুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, গত কয়েক সপ্তাহে জ্বালানি সংকট বেড়ে যাওয়া, শিল্প ও উৎপাদন খাতে অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং কোম্পানিগুলোর ভবিষ্যৎ আয় নিয়ে উদ্বেগ সব মিলিয়ে বাজারে একটি সংশোধন স্বাভাবিক।
তিনি বলেন, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশে জ্বালানি সংকট আবার বেড়েছে। অর্থমন্ত্রীও বলেছেন, এই সংকট পুরোপুরি উন্নতি হতে আরও সময় লাগবে। সরকার বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরে বিষয়টি ব্যাখ্যা করছে, যা জনগণের দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিবাচক। কিন্তু শেয়ারবাজারে এর একটি নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে। বিশেষ করে প্রকৌশল ও উৎপাদন খাতের কোম্পানিগুলোর ভবিষ্যৎ আয় বা ইপিএস নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। তার ফলেই এই মূল্য সংশোধন হচ্ছে।
আশিকুর রহমান বলেন, বাজারে ভালো ধরনের সেল-অফ হলে বিনিয়োগকারী আবার ফিরতে পারেন। কারণ তখন শেয়ারের মূল্যায়ন তুলনামূলক আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাজার দুই দফায় তলানি বা বটম তৈরি করেছে। ফলে বাজারের একটি সম্ভাব্য বটম এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে বড় ধরনের অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক সংকট তৈরি না হলে আগের সেই নিচের পর্যায়ে বাজার আবার নেমে যাওয়ার আশঙ্কা কম।
এমএএস/ইএ
