হাতি সম্পর্কে যেসব তথ্য হয়তো আগে জানতেন না


পৃথিবীর বুকে হেঁটে বেড়ানো প্রাণীদের মধ্যে হাতির চেয়ে বিশাল আর কেউ নেই। বিশালদেহী এই প্রাণীটি আকারেই পাশাপাশি বুদ্ধিমত্তা, স্মৃতিশক্তি ও সামাজিক আচরণে অনন্য। এদের শুঁড়ে রয়েছে দেড় লক্ষাধিক পেশী, ভূমির কম্পন অনুভব করে তারা যোগাযোগ করতে পারে বহু দূর থেকে।

জন্মের কয়েক মিনিটের মধ্যেই একটি বাচ্চা হাতি নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে যায়। এছাড়া হাতির রয়েছে আরও জানা-অজানা অনেক বিস্ময়কর তথ্য। তবে দুঃখের বিষয় প্রাণীটি আজ চরম হুমকির মুখে। গত এক শতাব্দীতে হাতির দাঁতের লোভে বিলুপ্ত হয়ে গেছে প্রায় ৯০ শতাংশ আফ্রিকান হাতি। ১২ আগস্ট বিশ্ব হাতি দিবস উপলক্ষে এই স্থলচর দানবের জানা-অজানা কিছু বিস্ময়কর গল্প নিয়ে আজকের আয়োজন।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্থলজ প্রাণী

আফ্রিকান সাভানা (বুশ) হাতি বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্থলজ প্রাণী। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ হাতি, বা বুল এলিফ্যান্ট, উচ্চতায় ৩ মিটার পর্যন্ত হয়। এদের ওজন গড়ে ৬ হাজার কেজি পর্যন্ত হতে পারে। পুরুষ হাতিরা ৩৫-৪০ বছর বয়সে পূর্ণ আকার লাভ করে, যা তাদের বন্য জীবনকালের অর্ধেকেরও বেশি। কারণ বন্য হাতিরা ৬০-৭০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। বাচ্চা হাতিরাও বিশাল আকৃতির হয়। জন্মের সময় একটি বাচ্চা হাতির ওজন হতে পারে ১২০ কেজি।

হাতির তিন প্রজাতি

হাতির তিনটি প্রজাতি রয়েছে: আফ্রিকান সাভানা (বুশ), আফ্রিকান ফরেস্ট এবং এশিয়ান। আফ্রিকান হাতির কান তাদের এশিয়ান আত্মীয়দের চেয়ে অনেক বড় এবং আফ্রিকা মহাদেশের আকৃতির মতো বলে বর্ণনা করা হয়। অন্যদিকে এশিয়ান হাতির কান ভারতীয় উপমহাদেশের আকৃতির মতো। শুঁড়েও পার্থক্য রয়েছে। আফ্রিকান হাতির শুঁড়ের ডগায় দুটি আঙুল থাকে। তবে এশিয়ান হাতির থাকে একটি।

হাতির শুঁড়ের অসাধারণ ক্ষমতা

হাতির শুঁড়ে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার পেশী থাকে। যেকোনো স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে তাদের শুঁড়ই সম্ভবত সবচেয়ে সংবেদনশীল অঙ্গ। হাতিরা পানি পান করার জন্য শুঁড় দিয়ে টেনে নেয়। এতে ৮ লিটার পর্যন্ত পানি ধরে রাখা যায়। সাঁতার কাটার সময় তারা শুঁড়কে স্নরকেল হিসেবেও ব্যবহার করে।

বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বড় হয় হাতির দাঁত

হাতির দাঁত (টাস্ক) আসলে বর্ধিত ছেদন দাঁত (ইনসিসর), যা হাতির বয়স প্রায় ২ বছর হলে প্রথম দেখা যায়। এই দাঁত সারাজীবন ধরে বাড়তে থাকে। খাওয়ার সময় সাহায্যের জন্য, গাছের বাকল খোসা ছাড়াতে বা শিকড় খুঁড়তে। এছাড়া লড়াইয়ের সময় আত্মরক্ষার জন্য এই দাঁত ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এই সুন্দর দাঁতগুলোই প্রায়ই হাতিদের বিপদে ফেলে। এগুলো তৈরি হয় হাতির দাঁত (আইভরি) দিয়ে; যা অত্যন্ত লোভনীয় বস্তু।

হাতির মোটা চামড়া

হাতির চামড়া বেশিরভাগ জায়গায় ২.৫ সেন্টিমিটার পুরু। তাদের চামড়ার ভাঁজ ও কুঁচকানো অংশ সমতল চামড়ার চেয়ে ১০ গুণ বেশি পানি ধরে রাখতে পারে, যা তাদের ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। তারা নিয়মিত ধুলো ও কাদার স্নান করে নিজেদের চামড়া পরিষ্কার রাখে এবং রোদে পোড়া থেকে রক্ষা করে।

দিনে ১৫০ কেজি পর্যন্ত খাবার

হাতিরা ঋতু ও তাদের বাসস্থান অনুযায়ী ঘাস, পাতা, ঝোপঝাড়, ফল ও শিকড় খায়। বিশেষভাবে শুষ্ক সময়ে হাতিরা গাছ ও ঝোপের কাষ্ঠল অংশ যেমন-ডালপালা ও বাকল বেশি খায়। তাদের প্রতিদিন ১৫০ কেজি পর্যন্ত খাবার খেতে হয়, যা প্রায় ৩৭৫ টিন বেকড বিনসের সমান। যদিও এর অর্ধেকই হয়তো হজম না হয়ে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। হাতিরা এত বেশি খায় যে তারা দিনের তিন-চতুর্থাংশ সময় শুধু খাওয়ার পেছনেই ব্যয় করতে পারে।

কম্পনের মাধ্যমে যোগাযোগ করে

হাতিরা বিভিন্নভাবে যোগাযোগ করে। যেমন-তূর্য-ধ্বনির মতো শব্দ (কিছু শব্দ মানুষের শোনার জন্য খুব নিচু), শরীরী ভাষা, স্পর্শ ও গন্ধের মাধ্যমে। তারা ভূকম্পীয় সংকেতের মাধ্যমেও যোগাযোগ করতে পারে। এই শব্দ মাটিতে কম্পন সৃষ্টি করে, যা তারা সম্ভবত তাদের হাড়ের মাধ্যমে অনুভব করে।

জন্মের ২০ মিনিটের মধ্যেই দাঁড়ানো

আশ্চর্যজনকভাবে, বাচ্চা হাতিরা জন্মের ২০ মিনিটের মধ্যেই দাঁড়াতে সক্ষম হয় এবং ১ ঘণ্টার মধ্যে হাঁটতে পারে। দুই দিন পরে তারা পালের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে। এই অসাধারণ বেঁচে থাকার কৌশলের কারণে হাতির পাল খাদ্য ও পানির সন্ধানে টিকে থাকার জন্য ক্রমাগত স্থানান্তরিত হতে পারে।

হাতি কখনোই কিছু ভোলে না

হাতির টেম্পোরাল লোব (মস্তিষ্কের যে অংশ স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত) মানুষের তুলনায় বড় ও ঘনত্বপূর্ণ। তাই বলা হয় হাতি কখনোই কিছু ভোলে না।

হাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে

হাতরি দাঁতের ব্যবসার কারণে গত এক শতাব্দীতে প্রায় ৯০ শতাংশ আফ্রিকান হাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। বর্তমানে বন্য অবস্থায় আনুমানিক ৪ লাখ ১৫ হাজার হাতি বেঁচে আছে। এশিয়ান হাতিরাও হুমকির মুখে আছে। গত তিন প্রজন্মে অন্তত ৫০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বন্য অবস্থায় মাত্র প্রায় ৪৮ হাজার-৫২ হাজার হাতি অবশিষ্ট আছে। বাসস্থান পরিবর্তিত হওয়া, খণ্ডিত হওয়া এবং মানুষের বসতি ও কৃষিকাজের কারণে এশিয়ান হাতির জনসংখ্যার জন্য পানি, খাদ্য ও প্রজননস্থলে পৌঁছানোর ঐতিহ্যবাহী স্থানান্তর পথ অনুসরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এছাড়া তারা প্রায়ই মানুষের সঙ্গে বিপজ্জনক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে।

সূত্র: ডাব্লিউডাব্লিউএফ ডট অর্গ ডট ইউকে

কেএসকে

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *