ইরান হামলায় বদলাচ্ছে মার্কিন কৌশল, সেনা কমানোর ভাবনায় পেন্টাগন
ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতের পর পারস্য উপসাগর ও পশ্চিম এশিয়ার অঞ্চলগুলো থেকে সামরিক উপস্থিতি বা সেনা কমানোর কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানের কয়েক মাসের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মার্কিন ঘাঁটিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং এগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় এই পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের বরাতে মঙ্গলবার দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকা এ খবর জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিরক্ষা বিভাগের সদরদপ্তর পেন্টাগন পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতির বিষয়টি মূল্যায়ন করে দেখছে।
গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে বিশেষ করে পারস্য উপসাগর থেকে সেনা প্রত্যাহার করার কথা বিবেচনা করছে পেন্টাগন। কারণ, সেখানকার বড় মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো কয়েক মাস ধরে ইরানের হামলায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পেন্টাগন ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছে যে, ইরান যুদ্ধের আগের সময়ের মতো করে তারা হয়তো তাদের এই ঘাঁটিগুলো আর পুনর্নির্মাণ করবে না। বরং কর্মকর্তারা ইরান যুদ্ধকে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি নতুন করে মূল্যায়নের জন্য ‘এক প্রজন্মে একবার আসা সুযোগ’ হিসেবেই দেখছেন।
মার্কিন যুদ্ধ বিভাগের নীতি দপ্তর ওই অঞ্চলে সেনা উপস্থিতি কমানোর বিষয়টি মূল্যায়নের নেতৃত্ব দিচ্ছে।
সাবেক মার্কিন কর্মকর্তারাও দীর্ঘদিন ধরে উপসাগর থেকে মার্কিন সেনা কমানোর কথা বলে আসছেন। সাবেক সিআইএ প্রধান ও সেন্টকমের কমান্ডার ডেভিড পেত্রাউস বলেছেন, “সত্যটা হচ্ছে, ইরানের হামলায় এসব ঘাঁটি ঝুঁকিতে থাকায় সেখানে আমরা এখন আর সেনা মোতায়েন রাখতে আগ্রহী নই।”
সাবেক সেন্টকম প্রধান জেনারেল ফ্র্যাঙ্ক ম্যাকেঞ্জিও গত জুলাইয়ে বলেছিলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ আরও ভালোভাবে সুরক্ষিত রাখতে উপসাগরীয় ঘাঁটিগুলো ইসরায়েল এবং আশপাশের দেশগুলোতে সরিয়ে নেওয়া উচিত।
পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করা ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড সাধারণত জর্ডান থেকে ওমান পর্যন্ত ১,৫০০ মাইল বিস্তৃত এলাকার প্রায় ২০টি ঘাঁটিতে আনুমানিক ৪০,০০০ সেনা মোতায়েন রাখে।
এ বছরের শুরু থেকে মার্কিন বাহিনীকে রক্ষা করতে এবং ইরানের বিরুদ্ধে ১৩,০০০-এরও বেশি হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এই অঞ্চলে যুদ্ধজাহাজ, জঙ্গিবিমান, বিমান প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এবং অন্যান্য দুর্লভ সামরিক সরঞ্জাম ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে।
পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় এবং স্থায়ী ঘাঁটিগুলো পারস্য উপসাগরে অবস্থিত। সেখানে বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর রয়েছে এবং কুয়েতের মতো অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোতেও সেনা ও বিমান বাহিনীর বিভিন্ন সরঞ্জাম বা ঘাঁটি রয়েছে।
দশকের পর দশক ধরে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলো তাদের নিরাপত্তার জন্য মার্কিন বাহিনীর ওপরই নির্ভর করে আসছে। এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমানো হলে এসব রাষ্ট্র ইরানের হামলা থেকে নিজেদের রক্ষায় অক্ষম হয়ে পড়তে পারে।
ঘাটতি পুষিয়ে নিতে এই দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়ানো বা অন্যান্য দেশের সঙ্গে অংশীদারিত্ব তৈরি করতে কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড তাদের অনেক ঘাঁটি থেকে কর্মী সরিয়ে নিয়েছিল, কারণ তারা মনে করেছিল যে, এই ঘাঁটিগুলো ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলার মুখে অনেক বেশি অরক্ষিত।
যুদ্ধের কারণে সাময়িকভাবে যেসব মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বা কার্যক্রম এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যুদ্ধ শেষ হলেও তার সবকিছু আগের জায়গায় ফিরে নাও যেতে পারে। কিছু পরিবর্তন স্থায়ী রূপ নিতে পারে বলে জানিয়েছেন বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি।
ওয়াশিংটন পোস্ট-এর মে মাসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, কুয়েতের একটি সামরিক স্থাপনা পোর্ট শুয়াইবায় মার্চ মাসে এক হামলায় ছয় মার্কিন সেনা নিহত হন এবং এই যুদ্ধে ২০০টিরও বেশি মার্কিন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
ওই অঞ্চলে নিজেদের কর্মীদের রক্ষা করার পাশাপাশি, মার্কিন সামরিক বাহিনী ১,০০০টিরও বেশি অত্যাধুনিক বিমান-প্রতিরক্ষা প্রতিরোধকও ব্যবহার করেছে। এতে পেন্টাগনের প্যাট্রিয়ট এবং টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ ফুরিয়ে যাচ্ছে বলে গত মার্চ মাসে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল পত্রিকাটি।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কূটনীতিক মাইকেল র্যাটনি বলেছেন, “ইরান যুদ্ধ এই অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর দুর্বলতা স্পষ্ট করে তুলেছে।”
সেনা এবং সরঞ্জাম আরও পশ্চিমে জর্ডান, ইসরায়েল বা সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলে সরিয়ে নেওয়া হলে তা চাপ কিছুটা কমাতে সহায়ক হতে পারে বলে তিনি যুক্তি দেন। তবে র্যাটনি এও মনে করেন যে, ঘাঁটি দূরে সরিয়ে সাময়িক সুবিধা হলেও এটি আসল সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।
বাংলাদেশ জার্নাল/এনএম
