পুকুর লিজের টাকা না দেওয়ায় ‘মব’ সৃষ্টি করে শিক্ষককে ফাঁসানোর অভিযোগ


ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলে স্কুলশিক্ষকের ওপর হামলা ও মারধরের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। হামলার শিকার শিক্ষকের পরিবারের অভিযোগ, স্কুলের পুকুর লিজের টাকা স্থানীয় প্রভাবশালী সাবেক ইউপি সদস্যকে না দেওয়ার কারনে ওই শিক্ষকের সঙ্গে মতবিরোধ চলছিল। এর জেরে হামলা চালানো হয়েছে।

এদিকে শিক্ষক শাহ আলমের বিরুদ্ধে ওঠা যৌন নিপীড়নের ঘটনায় ছাত্রীর হাতে লেখা দাবি করা ‘স্বাক্ষরবিহীন’ চিঠি ও অভিযোগপত্র প্রসঙ্গে বাদীপক্ষের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করা হলেও তারা মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে এই লেখাটি ছাত্রীর নয় বলেও দাবি করেছেন তার চাচা সৌরভ সরকার।

অন্যদিকে শিক্ষক শাহ আলমকে গ্রেফতার দেখিয়ে পুলিশ পাহারায় সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে নিশ্চিত করেছে কালীগঞ্জ থানা পুলিশ।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বড় বায়শা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শাহ আলমকে তার অফিস কক্ষে ঢুকে বেধড়ক মারধর করেন স্থানীয় ১০-১২ জন। স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলে ওই শিক্ষকের ওপর হামলা করা হয়। হামলায় স্থানীয় সৌরভ সরকার, বাবু, হাশিদুলসহ বেশ কয়েকজন নেতৃত্ব দেন বলে জানা গেছে।

শিক্ষককে মারধরের পর তাকে অফিস কক্ষে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। খবর পেয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, থানার ওসি, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই শিক্ষককে উদ্ধার করেন। পরে তাকে থানা হেফাজতে নেয় পুলিশ। সন্ধ্যার দিকে ওই শিক্ষক গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, যৌন হয়রানির ঘটনা বড় বায়শা স্কুলের হলেও স্কুলের আশপাশের কেউ এ ঘটনার বিষয়ে জানতেন না। পাশ্ববর্তী রামচন্দ্রপুর গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য ইলিয়া মোল্লা মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) স্কুলের প্রধান শিক্ষক পিয়ার মোহাম্মদকে ডেকে সহকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি অবহিত করেন। এর কিছুক্ষণ পরেই স্কুলের অফিসে স্থানীয় লোকজন মব সৃষ্টি করে সহকারী শিক্ষকের ওপর হামলা চালান।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রোকনুজ্জামান বলেন, ‘ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি, উত্তেজিত স্থানীয় লোকজন শিক্ষককে অবরুদ্ধ করে রেখেছের। ওই সময় স্থানীয়রা শিক্ষকের শাস্তি দাবি করেন। সেসময় আমি ওই ছাত্রীর চাচাসহ উপস্থিত অন্যান্যদের কাছে লিখিত অভিযোগপত্র চাই। পরে তারা ঘটনাস্থল থেকে একটু দূরে গিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে সাদা কাগজে হাতে লেখা অভিযোগ দেন। যেখানে ওই ছাত্রীর সই বা তার পক্ষে কারও সই ছিল না।’

তিনি বলেন, ‘ওই চিঠিটি শিক্ষার্থীর নিজ হাতে লেখা কি-না আমি নিশ্চিত নই। ওই ছাত্রীও আমার সামনে এসে অভিযোগ করেনি বা নিজ হাতে অভিযোগপত্র দেয়নি। ছাত্রীর চাচা আমার কাছে অভিযোগপত্র দেন।’

হামলার শিকার শিক্ষকের স্ত্রী তানিয়া সুলতানা বলেন, ‘স্কুলের পুকুরের লিজের টাকা চেয়েছিল রামচন্দ্রপুর গ্রামের সাবেক মেম্বার ইলিয়াস। আমার স্বামী স্কুলের টাকা অন্য কাউকে না দেওয়ার পরামর্শ দেয়ায় তার সঙ্গে দুই সপ্তাহ ধরে ঝামেলা চলছিল। আমরা জানতে পেরেছি, স্থানীয় সৌরভ সরকার সাবেক মেম্বার ইলিয়াস মিলে একটি চক্র আছে প্রভাবশালী। তারা মিলে স্কুলে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেও আমার স্বামীর জন্য পারছিল না। যে কারণে সৌরভের নেতৃত্বে ও ইলিয়াস মোল্লার ইন্ধনে মব করে স্থানীয় সমাজপতিরা আমার স্বামীর ওপর হামলা চালায়।’

তিনি বলেন, হামলার এক পর্যায়ে আমার স্বামীর শারীরিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় তারা দ্রুত ঘটনাটিকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ বলে চালিয়ে দেয়।

এসব বিষয়ে জানতে ভিকটিম শিশুর মায়ের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলার চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। বাড়িতে গেলেও তিনি গণমাধ্যমে কথা বলতে রাজি হননি। তিনি তার দেবর সৌরভ সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলার জন্য গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন।

এ বিষয়ে সৌরভ সরকার বলেন, আমার ভাতিজির সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে। আমরা এর বিচার চাই। স্থানীয়রা ওই শিক্ষককে মারধর করেছেন।

হাতে লেখা চিঠি কে লিখেছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার ভাতিজির কথা হয়তো অন্য কেউ লিখে দিয়েছে। তবে কে লিখেছে আমি জানি না।’

শিক্ষকের সঙ্গে পূর্ববিরোধের বিষয়ে জানতে চাইলে কোলা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য ইলিয়াস মোল্লা বলেন, ‘আমি শিক্ষক শাহ আলমকে চিনিই না। তার সঙ্গে আমার কখনো কথাও হয়নি। আর স্কুলের পুশকোনি (পুকুর) লিজের টাকা আমি কেন নিতে চাইব? আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তোলা হচ্ছে।’

এ বিষয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষক পিয়ার মোহাম্মদ বলেন, ‘ইলিয়াস মেম্বার আমার চাচাশ্বশুর। তবে স্কুলের পুকুর লিজের টাকা নিয়ে আমি দায়িত্ব নেওয়ার আগে কারও সঙ্গে কিছু হয়েছে কি-না আমার জানা নেই। আমি যখন এই স্কুলে ছিলাম না, তখন সহকারী শিক্ষক শাহ আলম ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতেন। সেই সময় পুকুর লিজের টাকা নিয়ে কী হয়েছে তা আমি জানি না।’

এম শাহাজান/এসআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *